tanaka
প্রচ্ছদলাইফষ্টাইলবিনোদননিখোঁজের পরদিন দুই টুকরো মরদেহ: অভিনেত্রী রাইমা শিমু হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে যা ঘটেছিল

নিখোঁজের পরদিন দুই টুকরো মরদেহ: অভিনেত্রী রাইমা শিমু হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে যা ঘটেছিল

বাংলাদেশের অভিনেত্রী রাইমা ইসলাম শিমুর হত্যাকাণ্ড ২০২২ সালে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ১৬ জানুয়ারি সকালে শুটিংয়ে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন তিনি। পরদিন ঢাকার কেরানীগঞ্জের হযরতপুর সেতুর কাছে একটি বস্তার ভেতর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহটি দুই টুকরো করা হয়েছিল।

নিখোঁজের পর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় অভিযোগ করা হয়। মরদেহ উদ্ধারের পর বিষয়টি হত্যাকাণ্ড হিসেবে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তদন্তের একপর্যায়ে রাইমার স্বামী শাখাওয়াত আলী নোবেল ও তার বন্ধু এসএমওয়াই আবদুল্লাহ ফরহাদের নাম সামনে আসে।

যেভাবে অভিনয়ে আসেন রাইমা

রাইমা ইসলাম শিমুর অভিনয়জীবনের শুরু মঞ্চনাটকের মাধ্যমে। পরে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত পরিচালক কাজী হায়াতের নজরে আসেন তিনি। তার অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে কাজী হায়াত তাকে ‘বর্তমান’ সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ দেন।

বিয়ের পরও চালিয়ে যান কাজ

অভিনয়জীবনে কাজ করার সময় ঢাকার ব্যবসায়ী শাখাওয়াত আলী নোবেলের সঙ্গে রাইমার পরিচয় হয়। পরে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ২০০৪ সালে তারা বিয়ে করেন।

বিয়ের পর সিনেমায় অভিনয় থেকে কিছুটা দূরে সরে গেলেও টেলিভিশনে কাজ চালিয়ে যান রাইমা। কয়েকটি অনুষ্ঠান প্রযোজনার পাশাপাশি নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানও গড়ে তোলেন। এছাড়া একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের বিপণন বিভাগেও কাজ করেছিলেন তিনি।

রাইমা ও শাখাওয়াতের দুই সন্তান ছিল। পরিবার নিয়ে তারা ঢাকার গ্রিন রোড এলাকায় বসবাস করতেন।

১৬ জানুয়ারি সকালে কী ঘটেছিল?

২০২২ সালের ১৬ জানুয়ারি, রোববার সকালে শাখাওয়াতের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৭টার দিকে শুটিংয়ে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হন রাইমা। তবে তিনি শুটিংস্থলে পৌঁছাননি।

রাইমার বোন ফাতিমা নিশা একাধিকবার তার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কোনো সাড়া না পেয়ে তিনি শাখাওয়াতকে ফোন করে রাইমার অবস্থান জানতে চান। শাখাওয়াত জানান, রাইমা শুটিংয়ে যাওয়ার জন্য সকালে বাসা থেকে বের হয়েছেন, কিন্তু এরপর তার সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।

সেদিন রাতে রাইমা বাসায় ফিরে না আসায় পরিবারের উদ্বেগ বাড়ে। পরদিন ১৭ জানুয়ারি সকালে ফাতিমা থানায় গিয়ে নিখোঁজের অভিযোগ করেন। পরে শাখাওয়াতও কলাবাগান থানায় অভিযোগ করেন।

তখনও পরিবারের ধারণা ছিল, রাইমা হয়তো কোথাও নিখোঁজ হয়েছেন। কিন্তু একই দিন কেরানীগঞ্জ থেকে আসে ভয়াবহ খবর।

বস্তার ভেতর পাওয়া যায় মরদেহ

কেরানীগঞ্জের হযরতপুর সেতুর কাছে ঝোপের মধ্যে একটি সন্দেহজনক বস্তা দেখতে পান স্থানীয়রা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বস্তাটি খুললে ভেতরে এক নারীর মরদেহ পাওয়া যায়।

মরদেহটি দুই টুকরো করা ছিল। শরীরেও একাধিক আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে পুলিশ জানায়। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ মিটফোর্ড হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে রাইমার ভাই শহিদুল ইসলাম মরদেহটি শনাক্ত করেন।

এরপর নিখোঁজের অভিযোগটি হত্যাকাণ্ডের মামলায় রূপ নেয়।

তদন্তে প্রথমে আসে জায়েদ খানের নাম

তদন্তের শুরুতে রাইমার পরিচিতজন ও সহকর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ সময় অভিনেতা জায়েদ খানের নামও আলোচনায় আসে।

চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সদস্যপদ নিয়ে কয়েক বছর আগে রাইমা ও জায়েদ খানের মধ্যে বিরোধ হয়েছিল বলে জানা যায়। সেই বিরোধের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পুলিশ জায়েদ খানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে।

জায়েদ জানান, প্রায় দুই বছর আগে রাইমার সঙ্গে তার শেষ কথা হয়েছিল। এরপর তাদের মধ্যে আর যোগাযোগ ছিল না। পরে তদন্তে এই সূত্র আর এগোয়নি।

পরিবারের গাড়ি থেকেই মেলে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র

তদন্তের একপর্যায়ে রাইমার পরিবার ও বাসার লোকজনের ওপর নজর বাড়ায় পুলিশ। রাইমা ও তার স্বামী যে পরিবারের গাড়িটি ব্যবহার করতেন, সেটিও পরীক্ষা করা হয়।

তদন্তকারীরা গাড়ির ভেতরে তীব্র ব্লিচের গন্ধ পান। এতে তাদের সন্দেহ হয়, গাড়ির ভেতরে কোনো কিছু পরিষ্কার করে আলামত মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়ে থাকতে পারে।

পরে গাড়ির ভেতর থেকে নাইলনের দড়ির একটি বান্ডিল উদ্ধার করা হয়। রাইমার মরদেহ যে বস্তায় পাওয়া গিয়েছিল, সেটিও নাইলনের দড়ি দিয়ে সেলাই করে বন্ধ করা ছিল।

দুটি বিষয়ই তদন্তকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাদের ধারণা হয়, মরদেহ বাসা থেকে কেরানীগঞ্জে নিয়ে যাওয়ার কাজে পরিবারের গাড়িটি ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।

স্বামীসহ ছয়জন আটক

তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশ ছয়জনকে আটক করে। তাদের মধ্যে ছিলেন রাইমার স্বামী শাখাওয়াত আলী নোবেল এবং তার বন্ধু এসএমওয়াই আবদুল্লাহ ফরহাদ।

তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদের শুরুতে ১৬ জানুয়ারি সকালে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে শাখাওয়াত একাধিক ভিন্ন বক্তব্য দেন।

পরে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি স্ত্রীকে হত্যার কথা স্বীকার করেন বলে পুলিশ জানায়। তদন্তকারীদের দাবি, রাইমা সেদিন আসলে শুটিংয়ে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হননি।

পুলিশের ভাষ্যে হত্যাকাণ্ড

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৬ জানুয়ারি সকাল ৭টার দিকে রাইমা ও শাখাওয়াতের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে শাখাওয়াত রাইমাকে মারধর করেন এবং পরে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন বলে পুলিশ দাবি করে।

এরপর তিনি তার বন্ধু ফরহাদকে বাসায় ডাকেন বলে তদন্তে উঠে আসে। সে সময় বাসায় পরিবারের একজন গৃহকর্মীও ছিলেন। তদন্তকারীদের দাবি, তাকে নাশতা কিনতে বাইরে পাঠানো হয়।

গৃহকর্মী বাইরে যাওয়ার পর শাখাওয়াত ও ফরহাদ মিলে রাইমার মরদেহ গোপন করার পরিকল্পনা করেন বলে পুলিশের অভিযোগ। তারা মরদেহ দুই টুকরো করে একটি বস্তায় রাখেন। পরে নাইলনের দড়ি দিয়ে বস্তাটি শক্ত করে বেঁধে গাড়ির ডিকিতে রাখা হয় বলে তদন্তে দাবি করা হয়।

রাতে কেরানীগঞ্জে নেওয়া হয় মরদেহ

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিন বিকেলে শাখাওয়াত ও ফরহাদ মরদেহ ফেলে দেওয়ার উদ্দেশ্যে গাড়ি নিয়ে বের হন। তবে দিনের আলো থাকায় লোকজন দেখে ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কায় তারা পরিকল্পনা বাতিল করে বাসায় ফিরে আসেন। বস্তাটি তখনও গাড়ির ভেতরে ছিল।

রাত প্রায় ৯টার দিকে তারা আবার গাড়ি নিয়ে বের হন। এবার তারা কেরানীগঞ্জের দিকে যান। হযরতপুর সেতুর কাছে নির্জন একটি জায়গা খুঁজে গাড়ি থামিয়ে সেতু থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে ঝোপের মধ্যে বস্তাটি ফেলে রেখে ঢাকায় ফিরে আসেন বলে পুলিশের দাবি।

পরদিন সকালে শাখাওয়াত থানায় গিয়ে স্ত্রী নিখোঁজ হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন। এরই মধ্যে স্থানীয়রা ঝোপের মধ্যে বস্তাটি দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন।

দাম্পত্যজীবন নিয়েও উঠে আসে নানা তথ্য

তদন্তের সময় রাইমা ও শাখাওয়াতের দাম্পত্যজীবন নিয়েও নানা তথ্য সামনে আসে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শাখাওয়াত রাইমাকে নিয়ে সন্দেহ করতেন এবং তার বিরুদ্ধে পরকীয়ার অভিযোগও করতেন।

রাইমাকে মারধরের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে ছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।

করোনাভাইরাস মহামারির সময় তাদের পারিবারিক আর্থিক সংকটও বেড়ে যায়। শুটিং বন্ধ থাকায় রাইমার কাজ কমে যায়। অন্যদিকে শাখাওয়াতের ব্যবসাতেও আর্থিক ক্ষতি হয় বলে জানা যায়।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর রাইমা পরিবারের অন্যতম প্রধান উপার্জনকারী হয়ে ওঠেন। আর্থিক চাপের পাশাপাশি তাদের দাম্পত্য কলহও বাড়তে থাকে বলে তদন্তে উঠে আসে।

মৃত্যুর কয়েক মাস আগে রাইমা স্বামীর বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতার অভিযোগ করেছিলেন বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তিনি বোন ফাতিমা নিশার সঙ্গে দাম্পত্যজীবনের নানা সমস্যা নিয়ে কথা বলতেন।

মেয়ের কাছ থেকেও পাওয়া যায় তথ্য

হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ রাইমা ও শাখাওয়াতের মেয়েকেও জিজ্ঞাসাবাদ করে। তদন্তকারীদের কাছে সে জানায়, তার বাবা প্রায়ই তার মাকে মারধর করতেন।

পুলিশের কাছে হত্যার কথা স্বীকার করার পর শাখাওয়াত পুলিশ হেফাজত থেকে মেয়েকে ফোন করেছিলেন বলেও জানা যায়। মেয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই ফোনে শাখাওয়াত মাকে হত্যার জন্য ক্ষমা চান।

নিখোঁজের গল্পেই ছিল বড় ফাঁক

রাইমা শিমু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথমে ধারণা করা হয়েছিল, তিনি হয়তো শুটিংয়ে যাওয়ার পথে কোথাও নিখোঁজ হয়েছেন। পরিবারও সেই তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেছিল।

কিন্তু তদন্ত যত এগোয়, ততই সামনে আসে ভিন্ন চিত্র। পরিবারের গাড়িতে ব্লিচের গন্ধ, নাইলনের দড়ি এবং গাড়ির গতিবিধি তদন্তকারীদের সন্দেহ বাড়িয়ে দেয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে রাইমার স্বামী ও তার বন্ধুকে ঘিরে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ সামনে আসে।

মঞ্চ, সিনেমা ও টেলিভিশনে দীর্ঘদিন কাজ করা রাইমা শিমুর জীবন থেমে যায় ২০২২ সালের জানুয়ারিতে। নিখোঁজ হওয়ার পরদিন দুই টুকরো মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা তার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায় হয়ে থেকে যায়।