tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকমায়ের শত আকুতিতেও গলেনি সন্তানের হৃদয়

মায়ের শত আকুতিতেও গলেনি সন্তানের হৃদয়

মহারাষ্ট্রের ছত্রপতি সম্ভাজিনগর জেলায় মাত্র একটি আইফোনকে কেন্দ্র করে তর্কের জেরে মর্মান্তিকভাবে শেষ হয়েছে একটি পরিবারের জীবন। ১৮ বছর বয়সী কুনাল চন্দগুড়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে আত্মহত্যার হুমকি দেওয়ার পর তাকে বোঝাতে গিয়ে খাদে পড়ে মারা যান তার বাবা-মাও। শুক্রবার দুপুরের এই ঘটনায় চন্দগুড়ে পরিবারের তিন সদস্যেরই মৃত্যু হয়েছে।

কুনালের সঙ্গে তার মা সঙ্গীতার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। প্রকাশিত পুরোনো পারিবারিক ভিডিওতে দেখা যায়, মা-ছেলে একসঙ্গে বসে চা খাচ্ছেন। আরেকটি ভিডিওতে মায়ের পা ধুয়ে আশীর্বাদ নিতে দেখা যায় কুনালকে। মা-ছেলের সেই হাসিমুখের মুহূর্তগুলো এখন কেবল স্মৃতি। এসব ভিডিও দেখে অনেকের চোখেই পানি এসেছে।

মুরলীধর চন্দগুড়ে ও সঙ্গীতা চন্দগুড়ে দম্পতির একমাত্র সন্তান ছিলেন কুনাল। অর্থের প্রাচুর্য না থাকলেও পরিবারটিতে সুখের অভাব ছিল না। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মুরলীধর পেশায় গাড়িচালক ছিলেন। স্ত্রী ও সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে তিনি দিনরাত পরিশ্রম করতেন।

জানা গেছে, কুনাল কিস্তিতে একটি আইফোন ১৫ কিনেছিলেন। পরে কিস্তির টাকা দিতে বাবার কাছে অর্থ চাইলে দুজনের মধ্যে তর্ক শুরু হয়। বাবার সামর্থ্যের সীমা বোঝানোর চেষ্টা করলেও অভিমানী কুনাল তা মেনে নিতে পারেননি।

শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে বাবার সঙ্গে তুমুল তর্কের পর রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান কুনাল। পরে তিনি ওয়ালুজ এমআইডিসি থানার তিসগাঁও এলাকার একটি পাহাড়ে উঠে যান। খবর পেয়ে তার বাবা-মা সেখানে ছুটে যান। স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়ে তারা প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে কুনালকে পাহাড় থেকে নেমে আসার জন্য বোঝানোর চেষ্টা করেন। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরাও ঘটনাস্থলে পৌঁছান।

কিন্তু কারও কথাতেই সাড়া দিচ্ছিলেন না কুনাল। একপর্যায়ে তার মা সঙ্গীতা ছেলেকে ফিরে আসার জন্য কাকুতি-মিনতি করতে থাকেন। প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, পাহাড়ের একেবারে প্রান্তে দাঁড়িয়ে কুনাল। কয়েক ফুট দূরে মাটিতে বসে কাঁদছেন তার মা। ছেলেকে বিপদ থেকে সরে আসার জন্য বারবার অনুরোধ করছেন তিনি।

একপর্যায়ে সঙ্গীতা ছেলের সামনে উপুড় হয়ে মিনতি করেন। পরে উঠে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে কুনালের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু কুনাল আরও এক পা পাহাড়ের প্রান্তের দিকে এগিয়ে গেলে ভয় পেয়ে সঙ্গীতা পিছিয়ে আসেন। এমনকি ছেলেকে বাঁচাতে নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার হুমকিও দেন তিনি। আশপাশের লোকজন তখন তাকে টেনে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেন।

সঙ্গীতা বারবার ছেলেকে আশ্বস্ত করছিলেন, তার যেকোনো সমস্যা তারা সমাধান করবেন। কিন্তু কুনাল কোনো কথাই শুনছিলেন না। ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘মা, আমার কথা কেউ শোনে না। আমার বেঁচে থাকার কোনো ইচ্ছে নেই। আমার জীবনের কোনো সমাধান নেই।’

এদিকে কুনালকে নিরাপদে নামিয়ে আনতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পাহাড়ের নিচে নিরাপত্তাজাল স্থাপন করেন। কিন্তু কুনাল এক জায়গায় স্থির না থেকে বারবার অবস্থান পরিবর্তন করছিলেন। ফলে তাকে রক্ষা করতে ফায়ার সার্ভিসকেও জালের অবস্থান পরিবর্তন করতে হচ্ছিল।

দুপুর ১টার দিকে কুনালের বাবা মুরলীধর ছেলের কাছে পৌঁছে তাকে পাহাড়ের প্রান্ত থেকে জোর করে পেছনে সরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। এ সময় বাবা ও ছেলে দুজনেই ভারসাম্য হারিয়ে প্রায় ২৫০ ফুট নিচের গিরিখাদে পড়ে যান। স্বামী ও সন্তানকে পড়ে যেতে দেখে মুহূর্তের মধ্যে সঙ্গীতাও পাহাড় থেকে নিচে ঝাঁপ দেন।

ফলে একমাত্র সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে একই সঙ্গে প্রাণ হারান বাবা-মা। মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায় একটি পুরো পরিবার।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রায় চার মাস আগে পরিবারটি ঝালতা গ্রামের একদন্ত নগর এলাকায় এসে বসবাস শুরু করেছিল। একমাত্র সন্তান ও একটি পোষা কুকুর নিয়ে তাদের ছোট সংসার ছিল। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কুকুরটিরও ছিল গভীর বন্ধন।

এক প্রতিবেশীর ভাষ্য, পরিবারটি আর ফিরে আসবে—এই আশায় পোষা কুকুরটি এখনো বাড়িতে অপেক্ষা করছে। জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকছে, যেন প্রিয় মানুষগুলো ফিরে আসবে।