সিএনএনের বিশ্লেষণ: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা ছাড়ার পর সম্ভাব্য আইনি জবাবদিহি ও তদন্ত থেকে নিজেকে এবং ঘনিষ্ঠদের সুরক্ষিত করার চেষ্টা করছেন—এমন অভিযোগ ও বিতর্ক এখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তার প্রশাসনের সাম্প্রতিক একটি “অ্যান্টি-ওয়েপনাইজেশন ফান্ড” সংক্রান্ত চুক্তি এই প্রবণতাকে আরও স্পষ্ট করেছে বলে সমালোচকদের দাবি।
ক্ষমতার সীমা দুর্বল করার অভিযোগ
বিশ্লেষক ও সাবেক সরকারি আইনজীবীদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপগুলো প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর বিদ্যমান নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ব্যবস্থাকে দুর্বল করছে। এর ফলে ভবিষ্যতে কংগ্রেসের তদন্ত, পরবর্তী প্রশাসনের অনুসন্ধান এবং ফেডারেল পর্যায়ের বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়াটারগেট পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট ক্ষমতার ওপর যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কাঠামো তৈরি হয়েছিল, ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু সিদ্ধান্ত তা ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে কংগ্রেসের অর্থ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতায় প্রভাব ফেলছে এবং নির্বাহী বিভাগের ভেতরে স্বাধীন তদারকি দুর্বল করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
“অ্যান্টি-ওয়েপনাইজেশন ফান্ড” নিয়ে বিতর্ক
ট্রাম্পের আইআরএস-বিরোধী একটি আইনি বিরোধ থেকে এই তহবিল কাঠামোর ধারণা আসে। প্রায় ১.৮ বিলিয়ন ডলারের এই ফান্ডকে সমালোচকরা দেখছেন একটি বিস্তৃত সুরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে, যা ভবিষ্যতে বিভিন্ন ধরনের তদন্ত থেকে ট্রাম্প ও তার ঘনিষ্ঠদের রক্ষা করতে পারে।
সমালোচকদের দাবি, এই চুক্তির ভাষা শুধু কর তদন্ত নয়, বরং অন্যান্য সরকারি অনুসন্ধানকেও প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি করতে পারে। এমনকি কংগ্রেসীয় তদন্তে সহযোগিতা না করার একটি “প্রণোদনা” তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে মার্কিন বিচার বিভাগ (United States Department of Justice) দাবি করেছে, এই ব্যবস্থা “লফেয়ার” বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আইনি হয়রানির অভিযোগ মোকাবিলার জন্য এবং অন্যায্যভাবে টার্গেট হওয়া ব্যক্তিদের সুরক্ষার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে।
কর তদন্ত ও দায়মুক্তি বিতর্ক
চুক্তির একটি অংশে ট্রাম্প, তার পরিবার এবং ব্যবসার জন্য কর-সংক্রান্ত দায়মুক্তির বিষয়ও উঠে এসেছে। সমালোচকদের মতে, এই ধরনের বিস্তৃত ভাষা ভবিষ্যতে যেকোনো সরকারি সংস্থার তদন্তের ক্ষেত্রেও বাধা তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে বিচার বিভাগ বলছে, এটি মূলত দেওয়ানি বিষয়, ফৌজদারি মামলা এতে অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে সমালোচকদের মতে, “লফেয়ার” বা “ওয়েপনাইজেশন” শব্দগুলোর অস্পষ্টতা ভবিষ্যতে আইনি ব্যাখ্যার সুযোগ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
অনুগতদের পুরস্কার, বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
অভিযোগ রয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন তার বিরুদ্ধে তদন্তে সহযোগিতাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে এবং তার ঘনিষ্ঠ সমর্থকদের বিরুদ্ধে থাকা কিছু মামলা প্রত্যাহার করেছে।
এছাড়া ৬ জানুয়ারির ক্যাপিটল হিল হামলা-সংক্রান্ত তদন্তে যুক্ত কিছু প্রসিকিউটর ও কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার অভিযোগও উঠেছে। অন্যদিকে ট্রাম্পবিরোধী তদন্তে জড়িত কিছু সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
নির্বাহী তদারকি কাঠামো দুর্বল হওয়ার অভিযোগ
দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই একাধিক ইন্সপেক্টর জেনারেলকে অপসারণ করা হয়, যারা সরকারি সংস্থার দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার তদন্তে নিয়োজিত ছিলেন। সমালোচকদের মতে, এতে অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে।
এছাড়া কিছু আইনি সিদ্ধান্তে বলা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট প্রশাসনিক নথি সংরক্ষণ সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা থেকেও কিছুটা ছাড় পাচ্ছেন, যা অতীতের রীতিনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সুপ্রিম কোর্টের ভূমিকা ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিমকোর্ট
সাম্প্রতিক রক্ষণশীল অবস্থান প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করেছে। বিশেষ করে “ইউনিটারি এক্সিকিউটিভ” তত্ত্বের দিকে ঝোঁক বাড়ায় প্রেসিডেন্টের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে নতুন তহবিল ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে নির্বাহী ক্ষমতা বাড়ানোর একটি ধারাবাহিক অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
সার্বিক মূল্যায়ন
সাবেক বিচার বিভাগীয় আইনজীবী ও সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থায় ভারসাম্য রক্ষার যে কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছিল, তা এখন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। তাদের মতে, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে না পারলে নির্বাহী ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ ভবিষ্যতে গুরুতর সাংবিধানিক বিতর্ক তৈরি করতে পারে।



