tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকপশ্চিম তীরের বসতি নিয়ে যুক্তরাজ্য-ইসরাইলের সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা

পশ্চিম তীরের বসতি নিয়ে যুক্তরাজ্য-ইসরাইলের সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাজ্য ও ইসরাইলের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বসতি স্থাপন বন্ধে যুক্তরাজ্য নিষেধাজ্ঞাসহ একাধিক পদক্ষেপ নেওয়ার পর পালটা ব্যবস্থা ঘোষণা করেছে ইসরাইল। এর ফলে কয়েক দশকের মধ্যে দুই দেশের সম্পর্ক সবচেয়ে কঠিন সময়ের মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বুধবার বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পশ্চিম তীরের ইসরাইলি বসতিগুলো থেকে পণ্য আমদানি এবং সেখানকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু সেবার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ব্রিটিশ সরকার। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতাকে ‘জাতিগত নিধন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে লন্ডন।

ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড পার্লামেন্টে বলেন, পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলার মধ্য দিয়ে জাতিগত নিধনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এবং ইসরাইল সরকার এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে পশ্চিম তীরের ইসরাইলি বসতিগুলো অবৈধ।

যুক্তরাজ্যের পাশাপাশি ফ্রান্স ও কানাডাও পশ্চিম তীরের এসব বসতির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ছাড়া ডেনমার্ক, স্পেন, ফিনল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, আইসল্যান্ড, নরওয়ে, পোল্যান্ড, পর্তুগাল ও সুইডেন—আরও নয়টি দেশ একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে।

ইসরাইল যখন অধিকৃত পশ্চিম তীরে আরও প্রায় ১ হাজার ২০০টি নতুন আবাসিক ইউনিট নির্মাণের পরিকল্পনা করছে, তখনই এই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলো। একই সময়ে চলতি বছরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঘটনাও বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইহুদি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডের অবস্থান নিয়েও ইসরাইলের সমর্থকদের সমালোচনা রয়েছে। এমনকি তাকে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগের মুখেও পড়তে হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের সিদ্ধান্তে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষোভ

ব্রিটিশ সরকারের সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ এই নিষেধাজ্ঞাকে ‘গুরুতর ভুল’ বলে মন্তব্য করেন।

ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি বিবিসিকে বলেছেন, নিষেধাজ্ঞার কারণে যুক্তরাজ্যের কিছু প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধের মুখে পড়তে পারে।

পালটা চার পদক্ষেপ ইসরাইলের

যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার জবাবে ইসরাইলও একাধিক কঠোর পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে। মঙ্গলবার ব্রিটিশ সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সার চার দফা পালটা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।

এর মধ্যে রয়েছে জেরুজালেমে ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধ করে দেওয়া এবং দক্ষিণ ইসরাইলের কিরিয়াত গাতে অবস্থিত ‘ইন্টারন্যাশনাল গাজা সাপোর্ট সেন্টার’ থেকে ব্রিটিশ প্রতিনিধিদের প্রত্যাহার। পাশাপাশি রামাল্লায় ব্রিটিশ সাপোর্ট টিমের অধীনে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কার্যক্রমও বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া ইহুদিবিদ্বেষী ও ইসরাইলবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে—এমন ১২ জন ব্রিটিশ এমপি এবং কয়েকজন ব্রিটিশ নাগরিকের ইসরাইলে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথা জানিয়েছে দেশটি।

গিডিয়ন সার বর্তমান ব্রিটিশ সরকারকে ইসরাইলের প্রতি বৈরী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তার অভিযোগ, ইসরাইলের বিরুদ্ধে কাজ করছে যুক্তরাজ্য এবং আগামী মাসে অনুষ্ঠিতব্য দেশটির সাধারণ নির্বাচনের আগে ব্রিটিশ সরকার ইসরাইলের নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় ‘নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ’ করছে।

সম্পর্কের টানাপোড়েনের নতুন মাত্রা

বিবিসির কূটনৈতিক প্রতিবেদক পল অ্যাডামসের মতে, পশ্চিম তীরের ইসরাইলি বসতিগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধের ব্রিটিশ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসরাইলের দ্রুত ও তীব্র প্রতিক্রিয়া বর্তমান পরিস্থিতির গুরুত্ব স্পষ্ট করেছে। ইসরাইলের ক্ষোভের কেন্দ্রে যুক্তরাজ্য থাকলেও একসঙ্গে ১২টি দেশের একই ধরনের অবস্থান নেওয়া তাদের অসন্তোষ আরও বাড়িয়েছে।

লন্ডনের কর্মকর্তারা আগেই ধারণা করেছিলেন, ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে নীতিগত পরিবর্তনের কারণে তেল আবিবের বিরূপ প্রতিক্রিয়া আসতে পারে। তবে ইসরাইলের পালটা পদক্ষেপের দ্রুততা ও তীব্রতা ব্রিটিশ কর্মকর্তাদেরও বিস্মিত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পূর্ব জেরুজালেমের ব্রিটিশ কনস্যুলেট বন্ধের সিদ্ধান্ত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কনস্যুলেটটি পশ্চিম তীরের বিভিন্ন সেবা এবং রামাল্লায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখত। একইভাবে গাজা-সংক্রান্ত কেন্দ্র থেকে ব্রিটিশ প্রতিনিধিদের সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তও দুই দেশের সম্পর্কের অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এর আগে ব্রিটেন আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের ২০২৪ সালের রায়ের সঙ্গে একমত পোষণ করেছে। ওই রায়ে ইসরাইলের সামরিক উপস্থিতিসহ সামগ্রিক দখলদারত্বকে বেআইনি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। এ অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক সম্পর্কেও একই নীতির প্রতিফলন থাকা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড।