একটি অভিযানের পর রাতারাতি ‘জঙ্গি’ পরিচয়ে আলোচনায় আসা তিন কলেজছাত্রীর জীবনের প্রায় এক দশক কেটেছে আদালত, জামিন ও সামাজিক কলঙ্কের ভার বহন করে। দীর্ঘ সাড়ে নয় বছরের আইনি লড়াই শেষে অবশেষে স্বস্তির রায় পেয়েছেন তারা। অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ না পাওয়ায় কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের নওয়াব ফয়জুন্নেছা হলের তিন শিক্ষার্থীকে খালাস দিয়েছেন আদালত।
গত ২৪ মে কুমিল্লার জেলা ও দায়রা জজ আদালত এ রায় দেন। শনিবার (৩০ মে) বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন মামলায় শিক্ষার্থীদের পক্ষে থাকা আইনজীবী অ্যাডভোকেট বদিউল আলম সুজন।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদের অভিযোগ আনা হলেও তদন্তে তাদের কাছ থেকে কোনো অবৈধ বা নিষিদ্ধ বস্তু উদ্ধার হয়নি। কক্ষ তল্লাশির সময় কেবল কোরআন, হাদিস ও ডা. জাকির নায়েকের কিছু বই জব্দ করা হয়েছিল। অথচ ‘জঙ্গি’ তকমার কারণে অভিযুক্তদের একজন শিক্ষার্থী মাস্টার্সে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার পরও চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
অ্যাডভোকেট বদিউল আলম সুজন আরও বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো চাইলে রাষ্ট্রের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে তারা আইনগত সহায়তা দিতে প্রস্তুত বলেও জানান তিনি। একই সঙ্গে এ মামলার পেছনে কারা ভূমিকা রেখেছিল, তা তদন্ত করে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৭ জুলাই রাতে কুমিল্লা শহরের নওয়াব ফয়জুন্নেছা হলে যৌথ অভিযান চালায় পুলিশ, র্যাব, সিআইডি ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। অভিযানের সময় হলের ২০২ নম্বর কক্ষে থাকা তিন শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং তাদের কক্ষ তল্লাশি চালানো হয়।
তল্লাশিকালে কয়েকটি ধর্মীয় ও ইসলামী বিষয়ক বই জব্দ করা হয়। এর মধ্যে ছিল ডা. জাকির নায়েকের লেকচার সমগ্র, ‘আদর্শ পরিবার পরিবেশ’, ‘পরকালের প্রস্তুতি’ এবং ‘ইসলামী আন্দোলনের পথ ও পাথেয়’ শীর্ষক গ্রন্থ।
পরে রাতভর জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তিন শিক্ষার্থীকে জঙ্গিবাদের অভিযোগে কোতোয়ালি থানায় নেওয়া হয়। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করে গ্রেপ্তার দেখানো হয় এবং আদালতের মাধ্যমে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।
ঘটনাটি সে সময় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। জাতীয় ও স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়। কিছুদিন কারাভোগের পর তারা উচ্চ আদালত থেকে জামিন লাভ করেন।
এরপর মামলাটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, জেলা ও দায়রা জজ আদালত এবং উচ্চ আদালতসহ বিভিন্ন বিচারিক ধাপ অতিক্রম করে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার শেষে আদালত অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ না পাওয়ায় গত ২৪ মে তিন শিক্ষার্থীকে খালাস দেন।
রায়ের পর শিক্ষার্থীরা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা সন্তোষ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, প্রায় এক দশক ধরে চলা একটি কঠিন ও বেদনাদায়ক অধ্যায়ের অবসান হয়েছে। আদালতের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তারা মন্তব্য করেন, এই রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
মামলার শুরু থেকে শিক্ষার্থীদের পক্ষে আইনি সহায়তা প্রদান করেন অ্যাডভোকেট শহীদ উল্লাহ, অ্যাডভোকেট বদিউল আলম সুজন এবং অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম মনির।



