চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় চাকরিচ্যুত সাবেক র্যাব সদস্য সুমন মুন্সীসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপহরণের কাজে ‘এসআরবি’ লেখা কালো জ্যাকেট, ভুয়া পরিচয়পত্র ও হ্যান্ডকাফ ব্যবহার করত চক্রটি। প্রায় পাঁচ দিন পর অপহৃত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসানকে টেকনাফের একটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম ব্যবসায়ীকে উদ্ধারের পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান।
পুলিশ জানায়, গত ১৭ অক্টোবর রাতে বাঁশখালীর পুঁইছড়ির প্রেমবাজারে নিজের হার্ডওয়্যারের দোকান থেকে হাসানকে তুলে নিয়ে যায় কয়েকজন ব্যক্তি। কালো পোশাকের ওপর ‘এসআরবি’ লেখা জ্যাকেট পরা ওই ব্যক্তিরা নিজেদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয় দেন। হাসানের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে বলে জানিয়ে তাঁকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
অপহরণের কয়েক ঘণ্টা পর হাসানের পরিবারের কাছে ফোন করে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তাঁকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়। পুলিশের তথ্যমতে, অপহরণের পর হাসানকে একাধিক স্থানে নেওয়া হয়। পরে তাঁকে টেকনাফের লেদা এলাকার ২৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়। সেখানে তাঁকে মারধর করে পরিবারের কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য চাপ দেওয়া হয়।
কৌশলে ক্যাম্পের বাইরে এনে উদ্ধার
পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে সরাসরি অভিযান চালানোর ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে কৌশলগতভাবে অপহৃত ব্যবসায়ীকে উদ্ধারের পরিকল্পনা করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মাধ্যমে ক্যাম্পে অবস্থানরত সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে হাসানকে বাইরে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
পরে বুধবার (২২ অক্টোবর) ভোর ৪টার দিকে তাঁকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। প্রায় পাঁচ দিন অপহরণকারীদের জিম্মায় থাকার পর অক্ষত অবস্থায় হাসানের ফিরে আসাকে অভিযানের বড় সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেন পুলিশ সুপার।
এ ঘটনায় গ্রেপ্তার অন্য পাঁচজন হলেন মিজানুর রহমান, জয়নাল উদ্দিন, দেলোয়ার হোসেন, আব্বাস উদ্দিন এবং ছলিম ওরফে সেলিম।
‘এসআরবি’ জ্যাকেট দিয়ে ভয় দেখানোর কৌশল
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে ভুক্তভোগীদের ভয় দেখানো এবং সহজে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য ‘এসআরবি’ লেখা জ্যাকেট ব্যবহার করত চক্রটি।
অভিযানে পাঁচটি কালো জ্যাকেট, দুটি ভুয়া পরিচয়পত্র এবং একটি হ্যান্ডকাফ জব্দ করা হয়েছে।
পুলিশ সুপার বলেন, প্রাথমিক তদন্তে একটি পরিকল্পিত চক্রের তথ্য পাওয়া গেছে। চক্রটির সদস্যরা সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের আর্থিক অবস্থা, চলাফেরা ও অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে সুমন মুন্সীকে জানাতেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরে ভুয়া পরিচয়ে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হতো।
সাবেক র্যাব সদস্যের বিরুদ্ধে ১৩ মামলা
পুলিশ জানায়, সুমন মুন্সী আগে র্যাবের সদস্য হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০২১ সালে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁকে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে ছিনতাই, দস্যুতা ও অস্ত্র আইনে ১৩টি মামলা রয়েছে। পরে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের নিয়ে তিনি একটি চক্র গড়ে তোলেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
গ্রেপ্তার জয়নাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে তিনটি এবং ছলিম ওরফে সেলিমের বিরুদ্ধে দুটি মামলা রয়েছে। আব্বাস উদ্দিনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা রয়েছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, ভুয়া ‘এসআরবি’ পরিচয় ব্যবহার করে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা করতেন সুমন। চক্রের অন্য সদস্যরা সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের আর্থিক অবস্থা ও চলাফেরার তথ্য সংগ্রহ করে তাঁকে জানাতেন। বাঁশখালীর আব্বাস উদ্দিন স্থানীয় পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, ছলিম ওরফে সেলিম টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৬-এর বাসিন্দা হওয়ায় ক্যাম্পের ভেতরে যোগাযোগ ও সমন্বয়ে সহায়তা করতেন বলে মনে করছে পুলিশ।
পরিচয় নিশ্চিত না হয়ে কাউকে সঙ্গে না নেওয়ার পরামর্শ
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে কেউ কাউকে নিয়ে যেতে চাইলে প্রথমেই তাঁর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। এ ধরনের ঘটনায় সন্দেহ হলে আশপাশের লোকজনের সহায়তা নেওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট থানায় যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।
পুলিশের দাবি, পরিকল্পিতভাবে ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায় করাই ছিল চক্রটির মূল উদ্দেশ্য। উদ্ধার হওয়া ব্যবসায়ীর ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা এবং চক্রটির অপরাধ কর্মকাণ্ডের বিষয়ে তদন্ত চলছে।



