tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়শ্রমবাজারে ধসের শঙ্কা, ৯ মাসে বিদেশে কর্মী যাওয়া কমেছে ৩৩ শতাংশ

শ্রমবাজারে ধসের শঙ্কা, ৯ মাসে বিদেশে কর্মী যাওয়া কমেছে ৩৩ শতাংশ

সৌদি আরবে সংঘাতের প্রভাব, আটকা হাজারো প্রবাসী; সংকুচিত মালয়েশিয়া-আমিরাতের বাজার, বিকল্প কর্মসংস্থান নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ ও অসংখ্য পরিবারের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এই খাত। তবে আঞ্চলিক সংঘাত, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ নীতির পরিবর্তনে বাংলাদেশের বিদেশি শ্রমবাজার ক্রমেই চাপে পড়ছে। বিশেষ করে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার দীর্ঘদিন ধরে সীমিত থাকায় বিকল্প কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই।

এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যায়। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে বিদেশে কর্মী যাওয়ার হার কমেছে প্রায় ৩৩ শতাংশ। দেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরবেও কর্মী গমন কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। এর মধ্যে সংঘাত ও বিমান চলাচলে বিঘ্নের কারণে ছুটিতে দেশে এসে অন্তত ২০ হাজার প্রবাসী আটকা পড়েছেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। কর্মস্থলে ফিরতে না পারার পাশাপাশি অনেকের চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে গুটিকয়েক দেশের ওপর নির্ভরতা, চাহিদাভিত্তিক দক্ষ কর্মী তৈরিতে সীমাবদ্ধতা এবং নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এখনই বিকল্প বাজার তৈরি, দক্ষতা উন্নয়ন, স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া ও কার্যকর অভিবাসন কূটনীতিতে জোর দেওয়া না হলে কর্মসংস্থান, প্রবাসী আয় এবং বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

৯ মাসে বিদেশগামী কর্মী কমেছে ২ লাখ ৭৫ হাজার

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশে গিয়েছিলেন ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯৪ জন বাংলাদেশি কর্মী। চলতি বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৬৯৩ জনে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা কমেছে ২ লাখ ৭৫ হাজার ২০১ জন।

এ পতন শুধু একটি নির্দিষ্ট শ্রমবাজারের সংকট নয়; বরং বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতাও সামনে নিয়ে এসেছে। নতুন বাজারে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা এবং প্রচলিত বাজারগুলোতে নিয়োগ কমে যাওয়ায় বিদেশে কাজের সুযোগ প্রত্যাশী বিপুলসংখ্যক মানুষের সামনে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

সৌদি আরবে সংঘাত, আতঙ্কে প্রবাসীরা

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিদেশি শ্রমবাজার সৌদি আরব। দেশটিতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও বিমান চলাচলে বিঘ্নের কারণে প্রবাসী কর্মীদের যাতায়াতে ভোগান্তি বেড়েছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, ছুটিতে দেশে এসে অন্তত ২০ হাজার প্রবাসী আটকা পড়েছেন। তাদের অনেকে নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে ফিরতে না পেরে চাকরি হারানোর আশঙ্কায় রয়েছেন।

বিএমইটির পরিসংখ্যানেও সৌদি আরবে কর্মী গমনের বড় ধরনের পতন দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে দেশটিতে গিয়েছিলেন ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৮৩ জন বাংলাদেশি। চলতি বছরের একই সময়ে গেছেন ৩ লাখ ৭ হাজার ৮৮৭ জন। অর্থাৎ কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমেছে ৪৫ দশমিক ৮ শতাংশ।

২০২৫ সালে মোট ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ জন বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে বিদেশে যান। তাদের মধ্যে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জনের গন্তব্য ছিল সৌদি আরব। ফলে দেশটির শ্রমবাজারে অস্থিরতা বাংলাদেশের সামগ্রিক বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

চলতি বছরের ২১ অক্টোবর পর্যন্ত বিএমইটি থেকে বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়েছেন ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭১৮ জন। তবে ছাড়পত্র নেওয়া এবং বাস্তবে বিদেশে যাওয়ার সংখ্যা এক নয়। তাই শ্রমবাজারের প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে এ দুই ধরনের পরিসংখ্যান আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।

সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। যারা দেশটিতে কর্মরত, তাদের অনেকেই নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। অন্যদিকে, ছুটিতে দেশে আসা কর্মীদের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার পথেও তৈরি হয়েছে নানা জটিলতা।

সৌদি আরবের রিয়াদ ও দাম্মামগামী ফ্লাইট চলাচল বন্ধ বা সীমিত থাকায় অনেক প্রবাসীকে বিকল্প পথে যাতায়াত করতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে টিকিটের দাম, পাশাপাশি এক শহর থেকে অন্য শহরে যাতায়াতের অতিরিক্ত ব্যয়ও বহন করতে হচ্ছে তাদের।

সৌদি আরবের জেদ্দা থেকে ঢাকায় ফেরা প্রবাসী সুবল দাস জানান, দীর্ঘ ১৫ মাস পর দেশে ফিরেছেন তিনি। পরিচিত পরিবেশে ফিরে স্বস্তি পেলেও বিমানভাড়া বেড়ে যাওয়ায় তাকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। তার ভাষ্য, দেশে ফেরার টিকিটের দাম দুই দিন আগেও ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার রিয়ালের মধ্যে ছিল। কিন্তু এক দিনের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৬০০ রিয়ালে। ফলে বাড়তি ৬০০ থেকে ৭০০ রিয়াল খরচ করে দেশে ফিরতে হয়েছে তাকে।

একই ফ্লাইটে সৌদি আরবের রিয়াদ থেকে দেশে ফেরেন ফরিদপুরের আতিয়ার মণ্ডল। গত ১৪ অক্টোবর রিয়াদ থেকে দেশে ফেরার টিকিট কাটলেও ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাকে অপেক্ষা করতে হয়। পরে বাধ্য হয়ে জেদ্দা থেকে নতুন টিকিট কেনেন তিনি। রিয়াদ থেকে বাসে মক্কা এবং সেখান থেকে আবার বাসে জেদ্দায় পৌঁছাতে হয় তাকে। শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরতে পারলেও অতিরিক্ত যাতায়াত ও বিমানভাড়ার খরচ তার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

রিয়াদে কর্মরত প্রবাসী নাজমুল ইসলাম বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আতঙ্ক নিয়েই তাকে কাজে যেতে হচ্ছে। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি দেশে থাকা পরিবারের সদস্যরাও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। যারা ছুটিতে দেশে এসেছেন, তাদের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তার মতে, সৌদি আরবে থাকা প্রবাসীদের মধ্যে এক ধরনের চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে।

রেমিট্যান্সেও বাড়ছে অনিশ্চয়তা

বৈদেশিক কর্মসংস্থানের পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে দেশে এসেছে ২ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স, যা গত ১১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। তবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ আয় ৩ শতাংশ বেশি। আগস্টে রেমিট্যান্স এসেছিল ২ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৮ হাজার ৫৯১ মিলিয়ন ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ৫৮৬ মিলিয়ন ডলার।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আগের বছরের তুলনায় রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি থাকলেও সাম্প্রতিক মাসে আয় কমে যাওয়ার প্রবণতা উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে কর্মসংস্থান ও প্রবাসী আয়ের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে রেমিট্যান্সের ওঠানামার পেছনে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা ছাড়াও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার, অর্থ পাঠানোর আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের ব্যবহার এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক বিষয় ভূমিকা রাখে।

গুটিকয়েক দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা

বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো সীমিতসংখ্যক দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্বের ২০৩টি দেশে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানো হয়েছে। এ সময়ে বিদেশে যাওয়া ১ কোটি ১০ লাখের বেশি কর্মীর প্রায় ৭৯ শতাংশ গেছেন মাত্র পাঁচটি দেশে। আর ৯৪ শতাংশ কর্মীর গন্তব্য ছিল ১০টি দেশ।

অন্যদিকে, দেড় দশকে ৯৮টি দেশে ১০০ জন করেও বাংলাদেশি কর্মী পাঠানো সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ কাগজে-কলমে বহু দেশে কর্মী পাঠানোর নজির থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ কর্মসংস্থান কয়েকটি নির্দিষ্ট বাজারের ওপর নির্ভরশীল।

এই নির্ভরতা সংকটের সময় বড় ঝুঁকি তৈরি করে। কোনো একটি দেশে নিয়োগ বন্ধ হয়ে গেলে বা রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে বিপুলসংখ্যক কর্মীর বিদেশযাত্রা ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে কর্মী পাঠানোর সুযোগ সীমিত হলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থানের চাপও বাড়তে পারে।

মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও ওমানের মতো গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারে কর্মী যাওয়ার সুযোগ বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়েছে। মালয়েশিয়ায় নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগের পর ২০২৪ সালের জুনে শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায়। ওমানেও ২০২৪ সাল থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের যাওয়ার সুযোগ কার্যত বন্ধ রয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি আগের মতো নেই। ২০২৩ সালে দেশটিতে প্রায় এক লাখ বাংলাদেশি কর্মী গেলেও ২০২৫ সালে গেছেন মাত্র ১৩ হাজার ৭৫০ জন। ফলে প্রচলিত শ্রমবাজারগুলোতে নিয়োগ কমে যাওয়ার পাশাপাশি নতুন গন্তব্যে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাও জরুরি হয়ে উঠেছে।

বিকল্প শ্রমবাজারেও প্রতারণার ঝুঁকি

প্রচলিত বাজারে সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় নতুন গন্তব্যের সন্ধানে যাচ্ছেন অনেক বাংলাদেশি। কিন্তু এসব বাজারে যথাযথ যাচাই-বাছাই ও নজরদারির অভাবে প্রতারণার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।

কম্বোডিয়ায় কল সেন্টারে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কর্মীদের নিয়ে গিয়ে অনলাইন প্রতারণার কাজে যুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে। বিএমইটির হিসাবে, ২০২৫ সালে কম্বোডিয়ায় যাওয়ার জন্য ১২ হাজার ২৬৩ জন বাংলাদেশি কর্মী ছাড়পত্র নিয়েছেন। একই বছর রাশিয়ায় গেছেন ৪ হাজার ৭২৭ জন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু কর্মী পাঠানোর সংখ্যা বাড়ানোকে সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। সংশ্লিষ্ট দেশের শ্রম আইন, কাজের ধরন, বেতন, আবাসন, নিয়োগকর্তার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং কর্মীদের নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। তা না হলে বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা নিয়ে যাওয়া মানুষ প্রতারণা, জোরপূর্বক শ্রম কিংবা অন্যান্য শোষণের শিকার হতে পারেন।

ভিসা জটিলতায় আমিরাতপ্রবাসীরা

সংযুক্ত আরব আমিরাতেও বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য ভিসা জটিলতা বড় বাধা হয়ে রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সময় বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার দায়ে ৫৭ বাংলাদেশির কারাদণ্ডের ঘটনার পর দেশটি বাংলাদেশিদের জন্য সাময়িকভাবে ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এরপর সাধারণ কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার আর পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। তবে উচ্চ পেশাগত দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীদের জন্য ভিসা চালু রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতে অন্তত ১০ থেকে ১২ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। তাদের অনেকে ভিসাসংক্রান্ত জটিলতায় পড়েছেন। চলতি বছরের জুলাই থেকে অনেকের ভিসা বাতিল হচ্ছে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এভাবে প্রায় পাঁচ হাজার বাংলাদেশি অবৈধ অবস্থায় পড়েছেন।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দাবি, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের হামলার সময় যুদ্ধের ভিডিও সরাসরি সম্প্রচার বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করে ভিসা বাতিল করা হচ্ছে। তবে এ ধরনের পদক্ষেপের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এবং ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের আইনি সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

ভিসা জটিলতার কারণে প্রবাসীদের কর্মসংস্থান, বৈধ অবস্থান এবং দেশে ফেরার পরিকল্পনা অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি কর্মীদের স্বার্থ রক্ষায় কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।

মালয়েশিয়া ও জাপানে নতুন উদ্যোগ

সংকুচিত শ্রমবাজারের মধ্যে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মীরা আবেদন করতে পারবেন। তবে কতজন কর্মী যাওয়ার সুযোগ পাবেন এবং নিয়োগপ্রক্রিয়া কত দ্রুত সম্পন্ন হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

জাপানের সঙ্গেও কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত চুক্তি অনুযায়ী নতুন সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী বছরের ১ এপ্রিল থেকে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তির মেয়াদ পাঁচ বছর, যা পরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরও পাঁচ বছর বাড়বে। তবে প্রাথমিকভাবে কতজন কর্মী নিয়োগ পাবেন, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নিশ্চিত করা হয়নি।

এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শ্রমবাজার সম্প্রসারণেও আলোচনা চলছে। গত ১৩ অক্টোবর দেশটির রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ আলী আল হুমুদির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিনের বৈঠকে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, ট্যাক্সিচালক ও ট্রাকচালক নিয়োগ এবং দক্ষ কর্মী পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উদ্যোগের বাস্তব সুফল পেতে হলে ঘোষণার পাশাপাশি নিয়োগপ্রক্রিয়া দ্রুত কার্যকর করা, কর্মীদের দক্ষতা যাচাই, ভাষা শিক্ষা এবং নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে নিয়োগ ব্যয় নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

দক্ষতা উন্নয়ন ও অভিবাসন কূটনীতিতে জোর দেওয়ার তাগিদ

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর মানবজমিনকে বলেন, দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য বিকল্প শ্রমবাজার খুঁজে বের করা জরুরি। কোন কোন দেশে বাংলাদেশি কর্মীদের চাহিদা রয়েছে এবং সেখানে কী ধরনের কাজের সুযোগ আছে, তা চিহ্নিত করতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দেশের চাহিদা অনুযায়ী কর্মীদের প্রস্তুত করা, সচেতনতা বাড়ানো, প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং বিদেশে যাওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা করতে হবে।

তার মতে, সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে এ ধরনের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেছে। তবে সব উদ্যোগের জন্য এখনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়ন শুরু হতে দেরি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রমবাজার সম্প্রসারণে কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত, কোন দেশে কোন পেশার কর্মীর চাহিদা রয়েছে, তা নির্ধারণ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কারিগরি প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা করতে হবে। তৃতীয়ত, বিদেশে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে প্রতারণা ও অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় কমাতে হবে।

পাশাপাশি বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোকে শ্রমবাজার অনুসন্ধান, নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং কর্মীদের অধিকার রক্ষায় আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। নতুন বাজারে প্রবেশের আগে সেখানকার শ্রম আইন, বেতন কাঠামো, কাজের পরিবেশ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করাও জরুরি।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের শ্রমবাজারনির্ভরতা কাটিয়ে ওঠার একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সৌদি আরবের মতো বৃহৎ বাজারে কর্মী গমন কমে যাওয়া, মালয়েশিয়া ও আমিরাতে সীমিত সুযোগ এবং নতুন গন্তব্যে প্রতারণার ঝুঁকি—সবকিছুই বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতের দুর্বলতা সামনে এনেছে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু নতুন শ্রমবাজার খোলার ঘোষণা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, কার্যকর কূটনৈতিক তৎপরতা এবং বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এসব উদ্যোগ কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে ভবিষ্যতে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ, প্রবাসী আয়ের স্থিতিশীলতা এবং দেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই খাতের টেকসই অগ্রগতি। মানবজমিন থেকে নেয়া।।