tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে উন্নয়নের প্রত্যাশা, নজর মোংলা বন্দরে

প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে উন্নয়নের প্রত্যাশা, নজর মোংলা বন্দরে

প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর থামতেই সড়কের পাশে অপেক্ষমাণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে উচ্ছ্বাস। কেউ মোবাইল ফোনে মুহূর্তটি ধারণ করেন, কেউ এগিয়ে আসেন একনজর দেখার আশায়। গাড়ি থেকে নেমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন সাধারণ মানুষের সঙ্গে হাত মেলান, তখন অনেকের মুখে ফুটে ওঠে আনন্দের হাসি। কারও কাছে এটি জীবনের স্মরণীয় মুহূর্ত, কারও কাছে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার বিশেষ প্রাপ্তি।

তবে ব্যক্তিগত আনন্দের বাইরেও প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের বড় প্রত্যাশা—মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে, বাড়বে শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ, তৈরি হবে কর্মসংস্থানের সুযোগ। দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে খুলনা-মোংলা অঞ্চল অর্থনৈতিকভাবে আরও গতিশীল হয়ে উঠবে—এমন আশাও করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সুন্দরবন পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া প্রধানমন্ত্রীর খুলনা ও মোংলা সফরজুড়ে মানুষের উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি উঠে এসেছে উন্নয়ন ঘিরে নানা প্রত্যাশা। খুলনার দাকোপ উপজেলার নলিয়ান থেকে মোংলা বন্দর, নৌঘাঁটি, প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল ও এলএনজি টার্মিনাল-সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে উপকূলীয় জনপদের সম্ভাবনা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্রগুলো গুরুত্ব পেয়েছে।

সকালে হেলিকপ্টারে সুন্দরবন ও হিরণ পয়েন্ট এলাকা পর্যবেক্ষণ শেষে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দাকোপের নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অবতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে নৌপথে মোংলার উদ্দেশে রওনা হন তিনি। পরে বানৌজা মোংলায় পৌঁছে নৌবাহিনী, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সভা ও মধ্যাহ্নবিরতির পর বিকেলে মোংলা বন্দর জেটি পরিদর্শন করেন। এরপর প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলের নির্ধারিত এলাকা ঘুরে দেখেন তিনি। বিকেল পাঁচটার দিকে মোংলা হেলিপ্যাড থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন সরকারপ্রধান।

একনজর দেখার আনন্দ, সঙ্গে উন্নয়নের প্রত্যাশা

প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে স্থানীয় মানুষের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো। সড়কের পাশে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করা মানুষের সঙ্গে তাঁর সরাসরি কুশল বিনিময় সফরে যোগ করে ভিন্ন মাত্রা।

স্থানীয় বাসিন্দা কালাম শেখ বলেন, প্রধানমন্ত্রী গাড়ি থেকে নেমে তাঁর সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। ভিড়ের মধ্যে আরও একবার হাত মেলানোর সুযোগ পেয়েছেন তিনি। জীবনে এমন সুযোগ আর নাও আসতে পারে উল্লেখ করে নিজের আনন্দের কথা জানান কালাম শেখ।

সুজন আহমেদ নামের আরেক ব্যক্তি বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে কাছ থেকে দেখা এবং তাঁর সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ পেয়ে তাঁরা আনন্দিত। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর প্রধানমন্ত্রীর সান্নিধ্য পাওয়ায় তাঁদের অপেক্ষা সার্থক হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

তবে স্থানীয়দের এই উচ্ছ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এলাকার অর্থনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাও। তাঁদের প্রত্যাশা, মোংলা বন্দরকে ঘিরে দীর্ঘদিনের সম্ভাবনাগুলো এবার বাস্তব রূপ পাবে। শিল্পকারখানা গড়ে উঠলে এবং নতুন বিনিয়োগ এলে স্থানীয় তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়বে, সম্প্রসারিত হবে ব্যবসা-বাণিজ্য। একই সঙ্গে উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকায়ও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

মোংলা বন্দর ঘিরে অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অন্যতম কেন্দ্র মোংলা বন্দর। ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নৌপথের চ্যানেলে নাব্য বজায় রাখা, জেটি নির্মাণ ও ড্রেজিংয়ের কাজ এগিয়ে নেওয়া এবং শুল্ক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন করা গেলে আমদানি-রপ্তানিতে নতুন গতি আসতে পারে। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।

ব্যবসায়ী মমিন হাওলাদারের মতে, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক উন্নয়ন উদ্যোগগুলো এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। তাঁর প্রত্যাশা, বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন-সংক্রান্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে এবং শক্তিশালী হবে স্থানীয় অর্থনীতি।

ব্যবসায়ী সবুজ শেখ বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক বিকাশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু হলে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি এলএনজি টার্মিনাল-সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে শিল্প ও বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা উন্মোচিত হবে বলে আশা করেন তিনি।

মোংলা বন্দর বার্থ ও শিপ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. জুলফিকার আলীও বন্দরের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, বন্দরকেন্দ্রিক অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল ও এলএনজি টার্মিনাল-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেওয়া গেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বাগেরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি শেখ সাহেদ আলী রবি মনে করেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমাতে মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। এ জন্য বন্দরের চ্যানেলে নাব্য বৃদ্ধি, নিয়মিত ড্রেজিং এবং মোংলা কাস্টমস হাউস ও শুল্ক বিভাগের আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

অন্যদিকে, পুনঃসংস্কার করা গাড়ি আমদানিকারকদের সংগঠন বারভিডার সভাপতি আব্দুল হক আমদানি-সংক্রান্ত বৈষম্য নিরসনের প্রত্যাশা জানিয়েছেন। তাঁর আশা, প্রধানমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

কর্মসংস্থান ও জীবনমান বদলের প্রত্যাশা

মোংলা বন্দর, প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল ও এলএনজি টার্মিনাল ঘিরে স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা কেবল ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বেকার তরুণদের কর্মসংস্থান, উপকূলীয় মানুষের বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক জীবনমান উন্নয়নের প্রশ্ন।

স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর এ অঞ্চলে বিনিয়োগের গতি বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জীবিকা হারানো উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

বিএনপি নেতা হাফিজুর রহমান তুহিনের মতে, মোংলা বন্দরের অসমাপ্ত জেটি নির্মাণ, ড্রেজিংসহ থমকে থাকা প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রস্তাবিত এলএনজি টার্মিনাল ও অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণের পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

উপকূলীয় এই অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, জীবিকার অনিশ্চয়তা এবং শিল্পায়নের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়লে শুধু মোংলা নয়, আশপাশের জেলা ও জনপদও এর সুফল পেতে পারে।

প্রত্যাশা থেকে বাস্তবায়ন—এখন নজর প্রকল্পের অগ্রগতিতে

প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে স্থানীয় মানুষের উচ্ছ্বাস এবং ব্যবসায়ী মহলের প্রত্যাশা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়ন নিয়ে নতুন করে আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। স্থানীয়দের কাছে মোংলা বন্দর শুধু পণ্য আমদানি-রপ্তানির একটি কেন্দ্র নয়; এটি কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন, বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির বিকাশেরও একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র।

তবে সফর ঘিরে তৈরি হওয়া প্রত্যাশা বাস্তবে কতটা প্রতিফলিত হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতা দূর করার ওপর। পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি সময়মতো বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

একই সঙ্গে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার বিষয়টি উন্নয়ন পরিকল্পনায় সমান গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে। শিল্পায়ন ও বন্দর সম্প্রসারণের উদ্যোগ যেন পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে, সে জন্য পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ও কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন-প্রত্যাশাকে সামনে এনেছে। এখন তাঁদের অপেক্ষা—মোংলা বন্দরকেন্দ্রিক সম্ভাবনা কত দ্রুত বাস্তব উদ্যোগে রূপ নেয় এবং সেই উন্নয়নের সুফল কতটা পৌঁছায় স্থানীয় মানুষের জীবন ও জীবিকায়।