কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের প্রাণহানি থামছেই না। সাগরে গোসল করতে নেমে ঢেউ ও স্রোতে ভেসে গিয়ে গত ১২ বছরে শিক্ষার্থীসহ ৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে অন্তত ১ হাজার ২০০ পর্যটককে জীবিত উদ্ধার করেছেন লাইফ গার্ড কর্মীরা। সাগরে ডুবে মৃত্যুর পাশাপাশি দুর্ঘটনাজনিত প্রাণহানির ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। অথচ সৈকতের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পর্যাপ্ত লাইফ গার্ড, নিরাপত্তাকর্মী ও নজরদারির ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পর্যটকদের নিরাপত্তায় জেলা প্রশাসন ও ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও সাগরে ভেসে যাওয়ার ঘটনা বন্ধ করা যাচ্ছে না। এর মধ্যে গত ১৭ অক্টোবর ইনানী সৈকতসংলগ্ন পাটুয়ারটেক এলাকার ‘টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্ট’-এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটক নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হন। একের পর এক এমন ঘটনায় দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
পর্যটকের চাপ বেশি, নিরাপত্তায় ঘাটতি
সংশ্লিষ্ট লাইফ গার্ড সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী পয়েন্টে পর্যটকদের ভিড় সবচেয়ে বেশি থাকে। এ ছাড়া হিমছড়ি ও ইনানী সৈকতেও প্রতিদিন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পর্যটকের সমাগম ঘটে। এসব এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ সাগরে গোসল করতে নামলেও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত জনবল নেই।
সৈকতের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পর্যটকদের বাড়তি চাপ রয়েছে। অন্যান্য পয়েন্টেও ভিড় লেগে থাকে। কিন্তু পুরো সৈকতে সমানভাবে নিরাপত্তাকর্মী, লাইফ গার্ড ও নজরদারির ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে কোনো পর্যটক স্রোতে ভেসে গেলে দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
একের পর এক প্রাণহানি, উদ্বেগ বাড়ছে
সৈকতে গোসল করতে নেমে পর্যটকদের প্রাণহানির ঘটনা নতুন নয়। সম্প্রতি হিমছড়ির পেচারদ্বীপ এলাকায় সাগরে গোসল করতে নেমে পাঁচ পর্যটক স্রোতে ভেসে যান। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অন্য একজন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁকে উদ্ধারে লাইফ গার্ড, ফায়ার সার্ভিস, কোস্ট গার্ড ও ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্যরা অভিযান চালান।
সি সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার প্রকল্প কর্মকর্তা মো. ইমতিয়াজ আহমেদ জানান, হিমছড়ি পয়েন্টে দুই দলের কয়েকজন পর্যটক সাগরে গোসল করতে নেমে স্রোতে ভেসে যান। তাঁদের মধ্যে একজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। অন্যদের উদ্ধারে অভিযান চালানো হয়।
তিনি বলেন, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় কেউ গোসল করতে নেমে নিখোঁজ হলে উদ্ধারের জন্য সি সেফের ২৭ জন লাইফ গার্ড কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। তবে কলাতলী থেকে দক্ষিণে দরিয়ানগর, হিমছড়ি, পাটুয়ারটেক, ইনানী হয়ে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ সৈকতে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত কর্মী নেই।
ইমতিয়াজ আহমেদের ভাষ্য, সাগরের স্রোত ও ঢেউয়ের আচরণ অনেক সময় পর্যটকেরা বুঝতে পারেন না। যে জায়গাকে অগভীর মনে হয়, সেখানেও হঠাৎ গভীরতা বেড়ে যেতে পারে। আবার স্রোতে ভেসে গেলে সাঁতার জানা ব্যক্তির পক্ষেও তীরে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অসতর্কভাবে সাগরে নামা মুহূর্তেই প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
লাইফ গার্ডের সংখ্যা বাড়ানোর দাবি
সি সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার জ্যেষ্ঠ কর্মী আব্দুর রশীদ বলেন, বর্তমানে সুগন্ধা বিচে আটজন লাইফ গার্ড দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক পর্যটকের সমাগমের তুলনায় এই জনবল যথেষ্ট নয়। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লাইফ গার্ডের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি।
তিনি জানান, দায়িত্ব পালনকালে অসুস্থ পর্যটকদের হাসপাতালে নেওয়াসহ বিভিন্ন জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়। এ সময় নানা প্রতিকূলতা ও মানুষের বিরূপ মন্তব্যের মুখেও পড়তে হয় লাইফ গার্ড কর্মীদের। সীমিত সামর্থ্য নিয়েই তাঁরা দায়িত্ব পালন করছেন।
আব্দুর রশীদের মতে, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে পর্যটকের চাপ বিবেচনায় নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পর্যাপ্ত লাইফ গার্ড নিয়োগ এবং উদ্ধার কার্যক্রমের সক্ষমতা বাড়ানো দরকার।
সমন্বিত নিরাপত্তাব্যবস্থার তাগিদ
সৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে লাইফ গার্ডের কার্যক্রম পুরো সৈকতে বিস্তৃত করার পাশাপাশি নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা।হোটেল কক্স-টুডের মহাব্যবস্থাপক আবু তালেব শাহ বলেন, পর্যটকেরা মূলত সমুদ্রসৈকত উপভোগ করতেই কক্সবাজারে আসেন। তাই শৈবাল পয়েন্ট থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত পুরো সৈকতে লাইফ গার্ডের কার্যক্রম বিস্তৃত করা প্রয়োজন। এ জন্য জেলা প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি সৈকতে নিরাপত্তাবেষ্টনী ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা কার্যকর করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকলে পর্যটকদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়, যা তাঁদের ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দীর্ঘ মেয়াদে এটি কক্সবাজারের পর্যটনশিল্প সম্পর্কেও বিরূপ ধারণা তৈরি করতে পারে।
প্রাণহানি ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সাগরে নামার আগে লাইফ গার্ডের নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের মতে, যেখানে লাইফ গার্ডের নিরাপত্তাসেবা নেই, সেখানে সাগরে গোসল করতে নামা থেকে বিরত থাকা উচিত।
পর্যটকদের প্রাণহানি রোধে শুধু সতর্কবার্তা জারি করাই যথেষ্ট নয়। সৈকতের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পর্যাপ্ত লাইফ গার্ড নিয়োগ, নিয়মিত মাইকিং, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ এবং সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জরুরি উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা জরুরি।
কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত দেশের পর্যটনশিল্পের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে এই আকর্ষণই তাঁদের জন্য মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রাণহানির প্রতিটি ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সমন্বিত ও কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।



