রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ৯ দিনের দুই নবজাতকের ঘটনা আমাদের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের বিষয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। কালচার ও সেনসিটিভিটি পরীক্ষায় দেখা যায়, তাদের সংক্রমণের জীবাণুর বিরুদ্ধে অধিকাংশ প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়। অথচ এই নবজাতকেরা জীবনের শুরুতেই নিজেরা কোনো অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করেনি।
প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে এমন প্রতিরোধী জীবাণুর শিকার তারা হলো কীভাবে? উত্তরটি লুকিয়ে আছে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ও অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে।
আমাদের দেশে হালকা জ্বর, সর্দি বা পেটের সমস্যায় অনেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ফার্মেসি থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে সেবন করেন। অনেক ক্ষেত্রে রোগটি ভাইরাসজনিত হলেও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখে না।
বরং অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ শরীরে থাকা অসংখ্য ব্যাকটেরিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। মানবদেহে শত শত ধরনের ব্যাকটেরিয়া বাস করে, যাদের অনেকেই আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। কিন্তু ব্রড-স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি উপকারী ব্যাকটেরিয়াকেও ধ্বংস করে।
যেসব ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিকের আক্রমণেও টিকে যায়, তারা ধীরে ধীরে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া।
প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার
ব্যাকটেরিয়া শুধু নিজেদের সংখ্যা বাড়ায় না; তারা একে অপরের সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের জিনও বিনিময় করতে পারে। প্লাসমিড ও ট্রান্সপোসনের মতো জিনগত উপাদানের মাধ্যমে একটি ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত অন্য ব্যাকটেরিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এই সমস্যা শুধু একজন ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রতিরোধী জীবাণু ও তাদের জিন পানি, মাটি, খাদ্য, গবাদিপশু এবং বিভিন্ন স্পর্শতলের মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে একজনের অযথা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার পুরো সমাজের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যখন সাধারণ সংক্রমণেও প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করবে না। তখন প্রয়োজন হবে আরও শক্তিশালী ও ব্যয়বহুল ওষুধের।
আইসিইউতে বাড়ছে সংকট
গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, হাসপাতালের আইসিইউগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণ চিকিৎসাকে আরও জটিল করে তুলছে। এতে রোগীর হাসপাতালে থাকার সময় বাড়ছে এবং চিকিৎসার ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হারিয়ে গেলে আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার অনেক ক্ষেত্র—যেমন অস্ত্রোপচার, ক্যানসারের চিকিৎসা বা নবজাতকের চিকিৎসা—আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
আমাদের করণীয়
এই সংকট মোকাবিলায় ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিছু বিষয় মেনে চলা জরুরি।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ না করা।
- প্রেসক্রিপশনে দেওয়া নিয়ম অনুযায়ী ওষুধ সেবন করা।
- অবশিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক নিজের সিদ্ধান্তে ভবিষ্যতে ব্যবহার না করা।
- চিকিৎসককে অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার জন্য চাপ না দেওয়া।
- পশুপালনে প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার এড়িয়ে চলা।
মনে রাখতে হবে, মানুষের শরীর অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী হয় না; প্রতিরোধী হয়ে ওঠে ব্যাকটেরিয়া। সেই ব্যাকটেরিয়া ও তাদের প্রতিরোধী জিন এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
অ্যান্টিবায়োটিক জীবন রক্ষাকারী ওষুধ। কিন্তু এর অযথা ব্যবহার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই নিজের জন্য নয়, আগামী দিনের শিশুদের জন্যও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।



