আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সাম্প্রতিক উত্তেজনা এখন আর শুধু দুই প্রতিবেশী দেশের সীমান্তসংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একদিকে পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে তালেবান-নিয়ন্ত্রিত আফগানিস্তান থেকে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে পাকিস্তানের কৌশলগত গুরুত্বও বাড়ছে।
ফলে ভৌগোলিকভাবে ভিন্ন দুটি অঞ্চলের নিরাপত্তা বাস্তবতা একই সময়ে পাকিস্তানের সামরিক সক্ষমতা, গোয়েন্দা তৎপরতা ও কূটনৈতিক মনোযোগের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।
৫ অক্টোবর রাশিয়ার আয়োজনে মস্কো ফরম্যাটের বৈঠকে আফগানিস্তান-পাকিস্তান উত্তেজনা আলোচনার অন্যতম বিষয় হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পাশাপাশি চীন, ভারত, ইরান, রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। রাশিয়া জানিয়েছে, তারা দুই পক্ষকে একটি ‘যৌক্তিক সমঝোতার’ দিকে এগিয়ে নিতে চায়।
টিটিপিকে ঘিরে মূল বিরোধ
বর্তমান উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি)। তবে বিষয়টি এখন শুধু আফগানিস্তান-পাকিস্তান সম্পর্কের আরেকটি সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ কমে এসেছে।
২০২১ সালে তালেবান কাবুলের ক্ষমতা দখল করার পর পাকিস্তান আফগানিস্তানে নিজেদের প্রভাবকে কৌশলগত সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করেছিল। কিন্তু টিটিপিকে ঘিরে নিরাপত্তা সংকট সেই হিসাবকে অনেকটাই জটিল করে তুলেছে।
আফগান তালেবান ও টিটিপি পৃথক সংগঠন হলেও দীর্ঘদিনের বিদ্রোহী তৎপরতা, যোগাযোগ ও পরিচালনাগত সম্পর্কের কারণে তাদের সম্পূর্ণ আলাদা করে দেখা কঠিন। জাতিসংঘের একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে টিটিপি এখনো লজিস্টিক ও পরিচালনাগত সুযোগ এবং আর্থিক সহায়তা পেয়ে থাকে।
এ কারণে ইসলামাবাদের দাবি কেবল কাবুলের নীতিগত অবস্থান পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। টিটিপির সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতার দাবি তালেবান নেতৃত্বকে এমন কিছু নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বাধ্য করতে পারে, যেসব পরিবেশ থেকেই একসময় তাদের নিজেদের সশস্ত্র আন্দোলন সহায়তা পেয়েছিল।
সামরিক চাপ কতটা ফলপ্রসূ?
সীমান্তে চাপ এবং সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে পাকিস্তান কাবুলকে সহযোগিতায় বাধ্য করার চেষ্টা করছে। গত কয়েক সপ্তাহে আফগানিস্তানে পাকিস্তানের বিমান হামলাও দুই দেশের উত্তেজনা বাড়িয়েছে।
পাকিস্তান এসব হামলাকে জঙ্গি আস্তানার বিরুদ্ধে অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেছে। অন্যদিকে তালেবান বেসামরিক হতাহতের অভিযোগ তুলেছে।
তবে সামরিক চাপ সবসময় প্রত্যাশিত মাত্রায় সহযোগিতা নিশ্চিত করে না। এর ফলে কাবুলের কাছে ইসলামাবাদের ওপর নির্ভরতা কমানোর তাগিদও বাড়তে পারে। এই প্রেক্ষাপটে আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতের ক্রমবর্ধমান যোগাযোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও ভারত ধীরে ধীরে আফগানিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়িয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হলে কাবুলের সামনে ইসলামাবাদের বাইরে বিকল্প যোগাযোগের সুযোগ আরও বাড়তে পারে।
এটি পাকিস্তানের জন্য একটি জটিল সমীকরণ তৈরি করছে। তালেবানকে নিরাপত্তা ইস্যুতে চাপ দিতে গিয়ে ইসলামাবাদ এমন কিছু আঞ্চলিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে, যেগুলোকে তারা দীর্ঘদিন সীমিত রাখতে চেয়েছে।
আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ
আফগানিস্তানের অভ্যন্তরেও তালেবানবিরোধী সশস্ত্র তৎপরতায় কিছু পরিবর্তনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় তালেবান বাহিনীর সঙ্গে বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষের খবর এসেছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, এসব গোষ্ঠী ভবিষ্যতে কতটা সংগঠিত ও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।
পাকিস্তানের জন্য তালেবান সরকারের পতনই একমাত্র সম্ভাব্য কৌশল—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে আফগানিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে বিরোধী শক্তি দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারলে তালেবানের একক নিয়ন্ত্রণের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
এর ফলে তালেবানকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় আরও সামরিক সম্পদ ব্যয় করতে হতে পারে এবং ইসলামাবাদের সঙ্গে আলোচনায় তাদের অবস্থানও পরিবর্তিত হতে পারে।
তবে এমন পরিবর্তনের অর্থ সরাসরি তালেবান সরকারকে উৎখাত করা নয়। বরং আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ শক্তির ভারসাম্যে পরিবর্তন এলে বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। সেই প্রক্রিয়ার বৈধতা ও ভবিষ্যৎ কাঠামো অবশ্যই আফগান জনগণের অংশগ্রহণের ওপর নির্ভর করবে।
মধ্যপ্রাচ্যে পাকিস্তানের নতুন কৌশলগত অবস্থান
আফগানিস্তান নিয়ে পাকিস্তানের এই চাপের সময়েই মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির কৌশলগত ভূমিকা বাড়ছে।
গত ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মক্কায় একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।
এরপর তিন দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। আগস্টের শেষ দিকে তারা একটি কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি গঠন এবং সৌদি আরবে একটি স্থায়ী সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে একমত হয়। প্রাথমিকভাবে ওই সচিবালয়ের মহাসচিব হিসেবে একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানানো হয়।
তবে এই চুক্তিকে সব পরিস্থিতিতে একইভাবে কার্যকর হবে—এমন পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নিজস্ব নিরাপত্তা স্বার্থ এবং আঞ্চলিক হুমকি সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিতে পার্থক্য রয়েছে। তারপরও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাটি এখন শুধু প্রতীকী পর্যায়ে নেই।
ইয়েমেনে হুতিদের হামলা এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে তিন দেশ এরই মধ্যে সমন্বয় করছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার জানিয়েছেন, ইরান হুতিদের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা নিয়ে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির সদস্যদের জরুরি বৈঠক হবে।
ফলে পাকিস্তান একই সময়ে দুটি ভিন্ন নিরাপত্তা বাস্তবতার মুখোমুখি। পশ্চিম দিকে আফগানিস্তান থেকে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে, আর অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ভূমিকা বিস্তৃত হচ্ছে।
দুই অঞ্চলের সংকট কেন পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত
আফগানিস্তানের সংকট মধ্যপ্রাচ্যের নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর কারণ নয়। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আফগান তালেবান ও পাকিস্তানের বর্তমান বিরোধের মূল কারণও নয়।
তবে একটি রাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা, গোয়েন্দা নজরদারি, কূটনৈতিক মনোযোগ এবং কৌশলগত সময়—সবই সীমিত। ফলে আফগানিস্তান থেকে আসা নিরাপত্তা চাপ এমন একটি রাষ্ট্রের ওপর পড়ছে, যে একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে আরও গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ভূমিকা নিতে শুরু করেছে।
এই কারণেই আফগানিস্তানের অস্থিরতাকে শুধু দক্ষিণ এশিয়ার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে পুরো আঞ্চলিক চিত্রটি স্পষ্ট হয় না।
মস্কো ফরম্যাটের বৈঠকও এই পরিবর্তিত বাস্তবতার একটি উদাহরণ। ভারত ও পাকিস্তান পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী, চীন ও ভারতের মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা রয়েছে, ইরানের নিজস্ব আঞ্চলিক স্বার্থ রয়েছে এবং রাশিয়া তালেবান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। তারপরও পাকিস্তান-তালেবান সংঘাত আরও বিস্তৃত হোক—এমন পরিস্থিতি আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্য নতুন নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।
দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামো তাই ক্রমেই আন্তঃসংযুক্ত হয়ে উঠছে। দেশগুলো এক অঞ্চলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও অন্য অঞ্চলে সহযোগিতা করছে এবং তৃতীয় কোনো ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান সামঞ্জস্য করছে। ফলে একটি অঞ্চলের নিরাপত্তা সংকট সরাসরি কোনো অভিন্ন জোট ছাড়াও অন্য অঞ্চলের কৌশলগত সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
সামনে পাকিস্তানের জন্য বড় প্রশ্ন
মস্কো বৈঠক সাময়িক উত্তেজনা কমানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু পাকিস্তানের গভীরতর প্রশ্নটি থেকেই যাবে—টিটিপির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে তালেবানকে শুধু আচরণ পরিবর্তনের জন্য চাপ দিলেই ইসলামাবাদের নিরাপত্তা উদ্বেগ কতটা দূর করা সম্ভব হবে?
যদি ধারাবাহিক সামরিক ও কূটনৈতিক চাপেও প্রত্যাশিত ফল না আসে এবং আফগানিস্তানের বিরোধী শক্তিগুলো নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে থাকে, তাহলে পাকিস্তান আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ শক্তির ভারসাম্যকে নিজেদের কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে পারে—এমন সম্ভাবনা বিশ্লেষণে উঠে আসতে পারে।
এর অর্থ সরাসরি তালেবানকে উৎখাত করা নয়। বরং আফগানিস্তানে ক্ষমতার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের বাইরে বৃহত্তর রাজনৈতিক সমঝোতার সুযোগ তৈরির চেষ্টা হতে পারে। তবে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যে যেকোনো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থাকবে—সেটি কতটা আফগান জনগণের অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক বৈধতার ভিত্তিতে তৈরি হচ্ছে এবং একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ কীভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে।
মস্কো বৈঠকের পর তাই আলোচনার কেন্দ্র শুধু পাকিস্তান ও তালেবান তাদের সাম্প্রতিক সংঘাত কমাতে পারবে কি না—সেটিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং ২০২১ সালের পর তৈরি আফগান রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে নিজেদের নিরাপত্তা চাহিদার সামঞ্জস্য কীভাবে তৈরি করবে, ইসলামাবাদ শেষ পর্যন্ত সেই প্রশ্নের কী উত্তর খুঁজছে—সেদিকেও নজর থাকবে।



