রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর কোনো রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হলো—ক্ষমতার সঙ্গে দলীয় আচরণের সীমারেখা কতটা স্পষ্ট রাখা যায়। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় যে দল গণতন্ত্র, জবাবদিহি, সুশাসন ও জনগণের অধিকারের কথা বলে, ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই দলের নেতাকর্মীদের আচরণই হয়ে ওঠে প্রতিশ্রুতির বাস্তব পরীক্ষা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ বাস্তবতা নতুন নয়। অতীতে ক্ষমতাসীন দলের নাম ব্যবহার করে দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, প্রভাব বিস্তার কিংবা সাধারণ মানুষকে হয়রানির অভিযোগ বারবার জনআস্থার সংকট তৈরি করেছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপির জন্যও তৃণমূলের আচরণ এখন কেবল সাংগঠনিক বিষয় নয়; এটি সরকারের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
ক্ষমতায় আসার কয়েক মাসের মধ্যেই বিএনপি নেতৃত্ব দলের নাম ব্যবহার করে দখল, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, হামলা, ভাঙচুর ও অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযোগ যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি গুরুতর ক্ষেত্রে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বিবেচনা করছে দলটি।
এই অবস্থানকে শুধু দলীয় ‘শুদ্ধি অভিযান’ হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা ধরা পড়বে না। কারণ ক্ষমতাসীন দলের একজন স্থানীয় নেতার অপরাধের প্রভাব শুধু দলের সাংগঠনিক ভাবমূর্তিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তাবোধকেও প্রভাবিত করে। একজন ব্যবসায়ী যদি মনে করেন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাকে চাঁদা দিতে হবে, কোনো জমির মালিক যদি মনে করেন প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তার সম্পত্তি দখলের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, কিংবা কোনো সাধারণ মানুষ যদি থানায় যাওয়ার আগে রাজনৈতিক পরিচয়ের কথা চিন্তা করেন—তাহলে সেখানে কেবল একটি দলের শৃঙ্খলাজনিত সমস্যা থাকে না; আইনের শাসনের প্রশ্নও সামনে আসে।
বিএনপির নেতৃত্ব এ বিষয়টি যে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে, তার একটি ধারাবাহিকতা রয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান জানিয়েছিলেন, দলটি বিভিন্ন অভিযোগে সাত হাজারের বেশি সদস্যের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে। এর মধ্যে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও অসদাচরণের অভিযোগে পদ থেকে সরানো এবং বহিষ্কারের ঘটনাও ছিল। তখন তিনি দলীয় শৃঙ্খলাকে দুর্বলতা নয়, শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন।
অর্থাৎ বর্তমান কঠোর অবস্থান একেবারে আকস্মিক কোনো প্রতিক্রিয়া নয়। ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই বিএনপির নেতৃত্ব উপলব্ধি করেছিল যে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি দলের সামনে ক্ষমতায় ফেরার পর নতুন ধরনের সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। সেই চ্যালেঞ্জের একটি বড় অংশ হলো—দলের জনপ্রিয়তা কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতাকে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা ঠেকানো।
ক্ষমতা বদলালেই কেন একই অভিযোগ বার বার ফিরে আসে
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বড় সমস্যা হলো, ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার কেন্দ্রও পরিবর্তিত হয়। দীর্ঘদিন বিরোধী দলে থাকা নেতাকর্মীদের একটি অংশ ক্ষমতায় গেলে নিজেদের রাজনৈতিক বিজয়কে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত সুবিধা অর্জনের সুযোগ হিসেবে দেখার ঝুঁকিতে পড়েন। দলীয় পরিচয় তখন জনসেবার পরিচয় না হয়ে কখনো কখনো প্রভাব বিস্তারের পরিচয়ে পরিণত হয়।
এই প্রবণতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বক্তব্য যতই কঠোর হোক, বাস্তবে তা ঠেকাতে হলে সাংগঠনিক কাঠামো, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং আইনের প্রয়োগ—তিনটি বিষয় একসঙ্গে কার্যকর করতে হবে।
কারণ শুধু দলীয় বহিষ্কার সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না। কোনো ব্যক্তি যদি চাঁদাবাজি বা দখলের মতো অপরাধে জড়িত হন, তার বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা যেমন প্রয়োজন, তেমনি রাষ্ট্রীয় আইনের আওতায় তদন্ত ও বিচারও প্রয়োজন। আবার শুধু মামলা দিয়ে রাজনৈতিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। দলীয় মনোনয়ন, পদ-পদবি, স্থানীয় নেতৃত্ব নির্বাচন এবং সংগঠনের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিও গুরুত্বপূর্ণ।
বিএনপির পক্ষ থেকে অভিযোগ তদন্তের পর দায়ীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। গুরুতর ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের কথাও এসেছে। এটাই কার্যকর হওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। কারণ অভিযোগ এবং অপরাধ এক জিনিস নয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অভিযোগ, ব্যক্তিগত বিরোধ, জমিজমা নিয়ে পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিংবা ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার ঘটনাও কখনো রাজনৈতিক রং পেতে পারে। ফলে প্রতিটি অভিযোগকে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি।
অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রমাণই হোক মূল ভিত্তি
রাজনৈতিক দলের জন্য সবচেয়ে কঠিন ভারসাম্য হলো—অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া, কিন্তু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে ধরে না নেওয়া। এ ক্ষেত্রে বিএনপির সামনে দ্বৈত দায়িত্ব রয়েছে।
একদিকে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ সত্যিই অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ব্যক্তিগত শত্রুতা বা স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে ‘দখল-চাঁদাবাজি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে কি না, সেটিও যাচাই করতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপি নেতাদের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, দলের প্রকৃত নেতাকর্মীরা দখল, চাঁদাবাজি কিংবা অন্যায় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান এমন বক্তব্য দিয়েছেন। এই বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। কারণ দলের লাখ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সামগ্রিক অভিযোগ আর কিছু ব্যক্তির অপরাধ—দুটিকে এক করে দেখলে মাঠপর্যায়ের অসংখ্য কর্মীও অযথা সামাজিক সন্দেহের মুখে পড়তে পারেন।
সুতরাং অভিযোগ উঠলেই গণমাধ্যমে বিচার নয়, আবার দলীয় পরিচয়ের কারণে অভিযোগ চাপা দেওয়াও নয়—এই দুই চরম অবস্থার মাঝখানে থাকতে হবে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া।
তৃণমূলই আসল পরীক্ষা
রাজধানীতে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব যতই কঠোর নির্দেশনা দিক, তার বাস্তব মূল্যায়ন হবে জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে। কারণ সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ঘটে তৃণমূলেই।
একজন সংসদ সদস্য বা কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে সাধারণ মানুষের বছরে কয়েকবার দেখা হতে পারে; কিন্তু স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী, ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতা কিংবা ওয়ার্ড পর্যায়ের সংগঠকের সঙ্গে মানুষের প্রতিদিনের যোগাযোগ থাকে। ফলে ওই কর্মীর আচরণই অনেক সময় সাধারণ মানুষের কাছে পুরো দলের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।
এই বাস্তবতা বিএনপি নেতৃত্বও বুঝতে পারছে। চলতি বছরের জুনে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলীয় সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় বেশি সময় দেওয়া, জনগণের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং সরকারি সেবা যেন হয়রানিমুক্তভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে তা নজরদারি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে চাঁদাবাজি, অপরাধ ও মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও বলা হয়েছিল।
এর অর্থ হলো, দলীয় রাজনীতিকে শুধু নির্বাচনী সংগঠন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় দলকে জনগণের কাছে প্রতিদিনের জবাবদিহির মধ্যেও থাকতে হবে।
‘দলীয় পরিচয়’ যেন অপরাধের ঢাল না হয়
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে একটি অভিযোগ রয়েছে—ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা অনেক সময় আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রভাব তৈরি করে। কোনো ব্যক্তি যদি মনে করেন দলীয় পরিচয় তাকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখবে, তাহলে সেখান থেকেই শুরু হয় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি।
বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বের জন্য তাই সবচেয়ে বড় বার্তা হতে পারে—দলীয় পরিচয় কাউকে আইনের বাইরে রাখবে না।
তারেক রহমান নির্বাচনের আগেও দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক করে বলেছিলেন, কেউ আইনের বাইরে গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং দলীয় পরিচয় তাকে রক্ষা করবে না। এই বক্তব্য ক্ষমতায় আসার পর বাস্তব প্রয়োগের দাবি রাখে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো এমপি, মন্ত্রী, মেয়র, স্থানীয় নেতা বা প্রভাবশালী সংগঠক যদি কোনো অভিযোগে অভিযুক্ত হন, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে পদমর্যাদা যেন তদন্তের পথে বাধা না হয়। আবার অভিযোগ প্রমাণের আগেই পদ হারানোও যেন নিয়মে পরিণত না হয়। রাজনৈতিক দলকে একই সঙ্গে কঠোর এবং ন্যায়সংগত—দুই ধরনের মানদণ্ডই বজায় রাখতে হবে।
সরকারের ভাবমূর্তি ও দলের ভাবমূর্তি আলাদা নয়
বর্তমান বাস্তবতায় বিএনপির জন্য আরেকটি জটিলতা হলো দল ও সরকারের সম্পর্ক। বিএনপি এখন শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়; একই সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। ফলে কোনো বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ উঠলে তার রাজনৈতিক প্রভাব সরকারের ওপরও পড়ে।
এপ্রিল মাসে দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তৃণমূলের কিছু নেতাকর্মীর অসদাচরণ সরকার ও দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে—এমন উদ্বেগ বিএনপির ভেতরে তৈরি হয়েছে এবং নেতৃত্ব আরও সক্রিয় সাংগঠনিক ও আইনগত পদক্ষেপের কথা ভাবছে।
এই উদ্বেগের যৌক্তিকতা রয়েছে। কারণ সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নীতি বা প্রশাসনিক সংস্কারের সাফল্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানোর আগেই যদি স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক চাঁদাবাজি, দখল কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ সামনে আসে, তাহলে সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
রাজনীতিতে মানুষের ধারণা তৈরি হয় শুধু নীতিগত সিদ্ধান্তে নয়, দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায়। বাজারে একজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কেমন আচরণ করা হচ্ছে, থানায় একজন নাগরিক কতটা নিরাপত্তা পাচ্ছেন, ভূমি অফিসে একজন সাধারণ মানুষ কতটা হয়রানির শিকার হচ্ছেন—এসব অভিজ্ঞতাই শেষ পর্যন্ত সরকারের প্রতি আস্থার ভিত্তি তৈরি করে।
দলীয় শুদ্ধি অভিযান কতটা টেকসই হবে?
এখন প্রশ্ন হলো, বিএনপির বর্তমান কঠোর অবস্থান কতটা দীর্ঘমেয়াদি হবে। রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, কোনো ঘটনার পর সাময়িকভাবে কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও কিছুদিন পর একই ধরনের অভিযোগ আবার সামনে এসেছে। কারণ সমস্যাটি অনেক সময় ব্যক্তির চেয়ে বড়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামো, অর্থনৈতিক স্বার্থ, সংগঠনের অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা এবং প্রশাসনের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক।
তাই শুধু ‘কঠোর ব্যবস্থা’ ঘোষণা করলেই হবে না। প্রয়োজন একটি স্থায়ী সাংগঠনিক ব্যবস্থা।
প্রথমত, দলীয় অভিযোগ গ্রহণের জন্য কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, অভিযোগ তদন্তের জন্য নির্দিষ্ট কাঠামো প্রয়োজন। তৃতীয়ত, সাংগঠনিক শাস্তির ক্ষেত্রে একই ধরনের অপরাধে একই ধরনের মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে। চতুর্থত, গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে দলীয় পদ থেকে অপসারণের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, স্থানীয় পর্যায়ে নতুন নেতৃত্ব তৈরির ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক প্রভাব, পেশিশক্তি বা ব্যক্তিগত বাহুবল নয়—রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও জনসম্পৃক্ততাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
তৃণমূলের কর্মীদেরও আত্মশুদ্ধি প্রয়োজন
দখল-চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অবস্থান মানে শুধু কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্দেশ নয়। এটি দলের প্রত্যেক নেতাকর্মীর রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের বিষয়। একজন তৃণমূল কর্মীকে বুঝতে হবে, ক্ষমতাসীন দলের কর্মী হওয়া কোনো বিশেষ সুবিধার লাইসেন্স নয়। বরং ক্ষমতাসীন দলের কর্মী হিসেবে তার দায়িত্ব আরও বেশি। বিরোধী দলের কর্মী হিসেবে যে আচরণকে তিনি অন্যায়ের বলে সমালোচনা করেছেন, ক্ষমতায় এসে একই আচরণ করলে তা আরও বেশি প্রশ্ন তৈরি করবে।
একইভাবে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদেরও বুঝতে হবে, তৃণমূলকে শুধু নির্বাচনের সময় প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক শক্তি হিসেবে দেখলে হবে না। তাদের রাজনৈতিক শিক্ষা, সাংগঠনিক প্রশিক্ষণ এবং জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত রাখতে হবে। রাজনৈতিক কর্মীর শক্তি হওয়া উচিত মানুষের আস্থা। ভয়, দখল কিংবা অর্থনৈতিক প্রভাব দিয়ে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব; কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক ভিত্তি শক্ত করে না।
প্রশাসনের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ
দখল ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দলের অবস্থানের পাশাপাশি প্রশাসনের নিরপেক্ষতাও অপরিহার্য। কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি অপরাধ করলে তাকে আইনের আওতায় আনার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থার। সেখানে দলীয় হস্তক্ষেপ থাকলে কোনো ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিই কার্যকর হবে না।
এ কারণেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের উচিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার স্পষ্ট সুযোগ দেওয়া। একই সঙ্গে মিথ্যা মামলা, রাজনৈতিক হয়রানি বা প্রতিপক্ষকে দমন করার জন্য আইন ব্যবহারের সম্ভাবনাও বন্ধ করতে হবে।
চাঁদাবাজি কিংবা দখল—দুটিই কেবল রাজনৈতিক সমস্যা নয়; এগুলো নাগরিক অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, ব্যবসার পরিবেশ এবং আইনের শাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে এর সমাধানও দলীয় কার্যালয়ের সিদ্ধান্তে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
বিএনপির সামনে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপির সামনে মূলত দুটি পথ খোলা। একদিকে দলীয় পরিচয়ের অপব্যবহারকে ছোটখাটো বিচ্যুতি হিসেবে দেখার সুযোগ রয়েছে; অন্যদিকে এটিকে ক্ষমতার রাজনীতির দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি হিসেবে নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মোকাবিলা করার সুযোগ রয়েছে।
প্রথম পথ বেছে নিলে সাময়িকভাবে স্থানীয় ক্ষমতার কিছু সমীকরণ হয়তো অক্ষুণ্ন থাকতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দলের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব বাড়ার ঝুঁকি থাকবে। দ্বিতীয় পথটি কঠিন, কারণ এতে দলের ভেতরের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হতে পারে। কিন্তু কার্যকর রাজনৈতিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার পরীক্ষা আসলে সেখানেই। সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, দলের নাম ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে ছাড় দেওয়া হবে না এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখন এই বক্তব্যের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে এর বাস্তব প্রয়োগে।
দখল ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান কোনো রাজনৈতিক দলের জন্য কেবল ভাবমূর্তি রক্ষার কৌশল হওয়া উচিত নয়। এটি হতে হবে রাজনৈতিক সংস্কার ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির অংশ। কারণ ক্ষমতাসীন দলের একজন কর্মীর অন্যায় আচরণ অনেক সময় পুরো সরকারের ওপর মানুষের মূল্যায়নকে প্রভাবিত করে।
বিএনপি যদি সত্যিই তৃণমূলে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাহলে ‘কাকে চিনি’ বা ‘কার লোক’—এই প্রশ্নের বদলে ‘অভিযোগের সত্যতা কী’ এবং ‘আইন কী বলছে’—এই দুটি প্রশ্নকে সামনে রাখতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত উভয়ের অধিকার রক্ষা করে নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি শুধু কতজন নেতাকর্মী আছে, কতটি কমিটি আছে কিংবা কতজন জনপ্রতিনিধি আছে—তা দিয়ে পরিমাপ হবে না। বরং মানুষ দলটির নেতাকর্মীদের কাছে কতটা নিরাপদ বোধ করে, তাদের কাছে ন্যায়বিচার ও সেবা পাওয়ার প্রত্যাশা কতটা তৈরি হয়েছে, এবং দলীয় পরিচয়ের কারণে কেউ অন্যায়ের সুবিধা পাচ্ছে কি না—এসব দিয়েই সেই শক্তির প্রকৃত মাপকাঠি নির্ধারিত হবে।
ক্ষমতার প্রথম কয়েক মাসে দখল-চাঁদাবাজির অভিযোগের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার যে বার্তা বিএনপি দিচ্ছে, সেটি তাই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে ঘোষণার চেয়ে ধারাবাহিক প্রয়োগই শেষ পর্যন্ত সেই বার্তার বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারণ করবে। তৃণমূলের একজন কর্মী থেকে শুরু করে প্রভাবশালী নেতা কিংবা জনপ্রতিনিধি—অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে যদি একই নীতিতে ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তাহলে দলীয় শৃঙ্খলা কেবল সাংগঠনিক নির্দেশ থাকবে না; তা রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে, যদি কঠোরতার ঘোষণা কেবল কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থাকে এবং স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহার চলতেই থাকে, তাহলে সেই ঘোষণার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। তাই বিএনপির সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ ‘কঠোর’ হওয়া নয়; বরং কঠোরতার সঙ্গে ন্যায়সংগত, স্বচ্ছ ও ধারাবাহিক হওয়া।
রাজনীতিতে জনগণের আস্থা অর্জন করতে সময় লাগে, কিন্তু তা হারাতে খুব বেশি সময় লাগে না। ক্ষমতাসীন দলের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ দলীয় কার্যালয়, প্রশাসনিক প্রভাব বা সাংগঠনিক শক্তি নয়—জনগণের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস রক্ষা করতে হলে তৃণমূলের প্রতিটি স্তরে একটি কথাই প্রতিষ্ঠা করতে হবে: দল মানুষের জন্য, মানুষ দলের জন্য নয়; রাজনৈতিক পরিচয় সেবার দায়িত্ব, সুবিধা ভোগের অধিকার নয়।
ম. হামিদুল হক মানিক, নির্বাহী সদস্য: বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে)



