কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের দান সিন্দুক খুলে এবারও সৃষ্টি হয়েছে নতুন রেকর্ড। শনিবার (২৭ জুন) সকালে মসজিদের ১০টি দান সিন্দুক এবং অতিরিক্ত তিনটি ট্রাঙ্ক খুলে গণনা শেষে পাওয়া গেছে ১৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার ১৪৬ টাকা, যা এ পর্যন্ত একবারে সর্বোচ্চ প্রাপ্ত দানের অর্থ।
শুধু নগদ অর্থই নয়, এবার বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার, রূপা, হীরা এবং বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রাও পাওয়া গেছে। স্বর্ণালঙ্কারের পরিমাণ শত ভরিরও বেশি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া দিনার, ইউরো, মার্কিন ডলারসহ বিভিন্ন দেশের মুদ্রা এবং মানতকারীদের হাজারো চিঠিও উদ্ধার করা হয়েছে।
সকাল ৭টায় জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিনের উপস্থিতিতে দান সিন্দুক খোলার কার্যক্রম শুরু হয়। লোহার সিন্দুক থেকে টাকা বের করে বড় বড় বস্তায় ভরা হয়। এবার মোট ৪৩ বস্তা টাকা পাওয়া যায়, যা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। পরে মসজিদের দ্বিতীয় তলায় নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে টাকা গণনার কাজ চলে এবং রাত সাড়ে ৮টার দিকে তা শেষ হয়।
টাকা গণনার কাজে এবারও ছিল বিশাল আয়োজন। মোট ৬৭১ জনের একটি দল এতে অংশ নেয়। তাদের মধ্যে ছিলেন পাগলা মসজিদ মাদরাসা ও আল জামিয়াতুল ইমদাদিয়ার ৪০৬ জন শিক্ষার্থী, মসজিদের ৩৫ জন কর্মচারী, জেলা প্রশাসনের ১৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং রূপালী ব্যাংকের ১৩০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। এছাড়া র্যাব, পুলিশ ও আনসারের ৭৫ সদস্য নিরাপত্তা ও সহযোগিতার দায়িত্ব পালন করেন। পুরো কার্যক্রম তদারকি করেন ১৩ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।
এবারের অর্থ যোগ হওয়ায় পাগলা মসজিদের ব্যাংক হিসাবে জমাকৃত দানের পরিমাণ ১৩০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এর আগে ব্যাংকে জমা ছিল প্রায় ১১৪ কোটি টাকা। পাশাপাশি অনলাইনে দানের ২৪ লাখ ৭৬ হাজার ৮৮২ টাকাও ব্যাংকে সংরক্ষিত রয়েছে।
প্রায় ছয় মাস পর এবার দান সিন্দুক খোলা হয়। সর্বশেষ গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর সিন্দুক খুলে পাওয়া গিয়েছিল ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩৮ টাকা। তবে এবার নির্ধারিত ১০টি সিন্দুক প্রায় দেড় মাস আগেই পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় দান গ্রহণ অব্যাহত রাখতে অতিরিক্ত তিনটি বড় ট্রাঙ্ক সংযুক্ত করা হয়। সেগুলোও দানে পরিপূর্ণ হয়ে যায়।
টাকা গণনার সময় সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে জেলা প্রশাসক ও মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন জানান, মসজিদ ও ইসলামিক কমপ্লেক্সের পরিচালন ব্যয় মেটানোর পর অবশিষ্ট অর্থ ব্যাংকে জমা রাখা হয়। সেই অর্থের লভ্যাংশ থেকে জেলার বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা এবং অসহায় ও জটিল রোগে আক্রান্ত মানুষের সহায়তায় অনুদান দেওয়া হয়। এছাড়া দান হিসেবে পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রা ও মূল্যবান স্বর্ণালঙ্কার জেলা প্রশাসনের ট্রেজারিতে সংরক্ষণ করা হয়।
পাগলা মসজিদে শুধু নগদ অর্থ বা স্বর্ণালঙ্কারই নয়, ভক্তরা গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি, ফলমূল, কোরআন শরীফসহ নানা সামগ্রীও দান করেন। এসব সামগ্রী মসজিদের নিলামঘরে জমা দিয়ে পরে নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয় এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত অর্থও ব্যাংকে জমা করা হয়।
নরসুন্দা নদীর তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো মানুষ দান করতে আসেন। অনেকের বিশ্বাস, এই মসজিদে দান করলে মানত পূরণ হয় এবং মনের আশা পূর্ণ হয়। সেই বিশ্বাস থেকেই বছরজুড়ে অব্যাহত থাকে বিপুল পরিমাণ দান, যা প্রতিবারই নতুন নতুন রেকর্ড গড়ে দিচ্ছে।



