বিশ্বজুড়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ‘এল নিনো’ পরিস্থিতি। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরে সৃষ্ট বিশাল উষ্ণ পানির প্রবাহ চলতি বছরে শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’ তৈরি করতে পারে। এর প্রভাবে ২০২৭ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে খরা, অতিবৃষ্টি, তীব্র তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, প্রশান্ত মহাসাগরের নিচ দিয়ে পূর্ব দিকে অগ্রসর হওয়া ‘কেলভিন ওয়েভ’ নামের উষ্ণ পানির বিশাল ঢেউ এই পরিস্থিতির মূল কারণ। কিছু এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৭.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি রেকর্ড করা হয়েছে।
মার্কিন জাতীয় মহাসাগর ও বায়ুমণ্ডল প্রশাসনের (NOAA) জলবায়ু পূর্বাভাস কেন্দ্রের বিজ্ঞানী মিশেল এল’হিউরো বলেন, এই কেলভিন ওয়েভ অত্যন্ত শক্তিশালী এবং এটি ১৯৯৭ সালের ভয়াবহ সুপার এল নিনোর সমতুল্য হতে পারে।
১৮৫০ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র ছয়বার এমন ‘সুপার এল নিনো’ দেখা গেছে। NOAA-এর ১৯৫০ সাল থেকে সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫–১৬ সালের এল নিনো ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী। এর আগে ১৯৯৭–৯৮, ১৯৮২–৮৩ এবং ১৯৭২–৭৩ সালেও শক্তিশালী এল নিনো রেকর্ড করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৯৭–৯৮ সালের এল নিনোর কারণে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছিল। তবে ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ছিল ১৮৭৭–৭৮ সালের এল নিনো, যার কারণে ভয়াবহ খরা ও দুর্ভিক্ষে প্রায় ৩ থেকে ৫ কোটি মানুষের মৃত্যু ঘটে।
বর্তমানে সমুদ্রের তাপমাত্রা আগের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় সম্ভাব্য নতুন এল নিনো আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে ইন্দোনেশিয়ার পূর্বে অবস্থিত ‘ওয়েস্ট প্যাসিফিক ওয়ার্ম পুল’ অঞ্চলকে, যা বিশ্বের অন্যতম উষ্ণ সমুদ্র এলাকা।
বিশ্বে কী প্রভাব পড়তে পারে?
কেলভিন ওয়েভের অগ্রযাত্রা শেষ হলে প্রশান্ত মহাসাগরের বিষুবীয় অঞ্চলের তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। এতে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের স্বাভাবিক আবহাওয়ার প্যাটার্ন পূর্ব দিকে সরে গিয়ে বৈশ্বিক বায়ুচাপ ও বায়ুপ্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটাবে। এর ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, অতিবৃষ্টি ও ঘূর্ণিঝড়সহ চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। একই সঙ্গে সমুদ্র থেকে বিপুল পরিমাণ তাপ ও আর্দ্রতা বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়বে।
এত উত্তাপের উৎস কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেলভিন ওয়েভের মূল শক্তি আসে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ সমুদ্রাঞ্চল থেকে, বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চল থেকে। ট্রেড উইন্ডের কারণে সেখানে দীর্ঘদিন ধরে উষ্ণ পানি জমা হয়। দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও ধারাবাহিক লা নিনার প্রভাবে ২০২৫ সালে এই অঞ্চলে রেকর্ড তাপ সঞ্চিত হয়েছে।
যখন ট্রেড উইন্ড দুর্বল হয়ে ‘ওয়েস্টার্লি উইন্ড বার্স্ট’-এ রূপ নেয়, তখন উষ্ণ পানি পূর্ব দিকে ঠেলে যায়। এতে সমুদ্রের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে কেলভিন ওয়েভ সৃষ্টি হয়, যা কয়েক মাস ধরে দক্ষিণ আমেরিকার দিকে অগ্রসর হয়।
এই ঢেউ পেরুর উপকূলে পৌঁছালে গভীর সমুদ্রের ঠান্ডা পানি উপরে উঠতে বাধা পায়। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠ অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, ১৯৯৭ সালের পর এমন শক্তিশালী পরিস্থিতি আবার দেখা যেতে পারে।



