tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকবিয়েতে আগ্রহ হারাচ্ছেন ইরানিরা, প্রতি ১০ জনে ৯ জনই সংসার ও সন্তান...

বিয়েতে আগ্রহ হারাচ্ছেন ইরানিরা, প্রতি ১০ জনে ৯ জনই সংসার ও সন্তান নিতে অনিচ্ছুক

ইরানে বিয়ে ও পরিবার গঠনের বিষয়ে মানুষের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচালিত একটি জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৯০ শতাংশ ইরানি জানিয়েছেন, তারা বিয়ে করতে কিংবা সন্তান নিতে আগ্রহী নন। জীবনযাত্রার ব্যয়, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তারা। খবর সামা টিভির।

ইনস্টাগ্রামে পরিচালিত ওই জরিপে প্রায় এক লাখ মানুষ অংশ নেন। তাদের মধ্যে ১২ হাজারের বেশি মন্তব্য বিশ্লেষণ করে বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার বিষয়ে অনীহার বিভিন্ন কারণ উঠে এসেছে।

অর্থনৈতিক চাপেই বেশি ভয়

জরিপে অংশ নেওয়া অনেক ইরানি জানিয়েছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবার চালানোর কথা ভাবাই কঠিন হয়ে পড়েছে। বাড়িভাড়া, অনিশ্চিত চাকরি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তাদের বিয়ের সিদ্ধান্ত থেকে দূরে রাখছে।

অনেকের ভাষ্য, নিজেদের দৈনন্দিন খরচ মেটাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে স্ত্রী বা সন্তানের দায়িত্ব নেওয়া তাদের জন্য বড় ঝুঁকি। আবার কেউ কেউ জানিয়েছেন, তারা বিয়ে ও সন্তান—দুটিই চান, কিন্তু বর্তমান আর্থিক ও সামাজিক বাস্তবতা তাদের সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে না।

দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে ইরানের মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে। বাসস্থান থেকে শুরু করে খাবার ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পরিবার গঠনের পরিকল্পনা পিছিয়ে দিচ্ছেন অনেকে।

বিয়েকেও ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন অনেকে

শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও অনেককে বিয়েবিমুখ করে তুলছে। জরিপের মন্তব্যগুলোতে বিবাহবিচ্ছেদ, পারস্পরিক অবিশ্বাস, সন্দেহ এবং দাম্পত্য কলহের বিষয় উঠে এসেছে।

কেউ কেউ জানিয়েছেন, আশপাশের মানুষের ব্যর্থ দাম্পত্য জীবন দেখে তাদের মধ্যেও বিয়ে নিয়ে ভয় তৈরি হয়েছে। এমনকি ইতোমধ্যে বিবাহিত কিছু অংশগ্রহণকারীও মন্তব্য করেছেন, তাদের মতে বিয়ে না করাই ভালো ছিল।

ফলে অনেক তরুণ-তরুণী দাম্পত্য জীবনের সম্ভাব্য জটিলতা এড়াতেই বিয়ে থেকে দূরে থাকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ

জরিপে অংশ নেওয়া অনেক বাবা-মা সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের প্রশ্ন—বর্তমান পরিস্থিতিতে সন্তানকে জন্ম দেওয়ার পর তাকে নিরাপদ ও স্বচ্ছল ভবিষ্যৎ দেওয়ার নিশ্চয়তা কোথায়?

সন্তানের শিক্ষা, জীবনযাত্রা, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নিয়েও উদ্বিগ্ন তারা। কারও কারও আশঙ্কা, বর্তমান সামাজিক পরিবেশে সন্তানকে সঠিকভাবে বড় করে তোলা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

পরিবেশগত সংকটও প্রভাব ফেলছে

ইরানিদের বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার অনাগ্রহের পেছনে পরিবেশগত সংকটের কথাও উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া অনেকে বায়ু ও পানি দূষণ, বনাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ড এবং পরিবেশগত অব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।

তাদের মতে, পরিবেশগত নিরাপত্তার অভাব, রাষ্ট্রীয় নীতির দুর্বলতা, দুর্নীতি ও পর্যাপ্ত সম্পদের সংকট ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।

রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতাও বড় কারণ

কিছু অংশগ্রহণকারী সরাসরি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতিকে দায়ী করেছেন। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি সরকারবিরোধী আন্দোলন, সহিংসতা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তাদের সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

অনেকেই জানিয়েছেন, তারা ভবিষ্যতে নিজেদের সন্তানদের জন্য আরও স্থিতিশীল ও নিরাপদ একটি দেশ দেখতে চান। বর্তমান বাস্তবতায় সেই নিশ্চয়তা না থাকায় পরিবার বড় করার সিদ্ধান্তকে তারা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন।

জরিপে অংশ নেন কারা?

জরিপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ পুরুষ এবং ৩২ শতাংশ নারী। অংশগ্রহণকারীদের বড় একটি অংশের বয়স ছিল ২৫ থেকে ৩৪ বছরের মধ্যে।

প্রায় ১২ হাজার মন্তব্যে অংশগ্রহণকারীদের মতামত আরও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এসব মন্তব্যে শুধু বিয়ে বা সন্তান নেওয়ার অনাগ্রহ নয়, বরং এর পেছনে থাকা অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক পরিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের চিত্রও ফুটে উঠেছে।