সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। চুক্তিটি সরাসরি কোনো দেশকে লক্ষ্য করে করা হয়নি। তবে এর মাধ্যমে তিন দেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার হওয়ায় আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কৌশলগত হিসাব-নিকাশে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন সমীকরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো তুরস্ক ও ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান দ্বন্দ্ব। বিশেষ করে সিরিয়াকে ঘিরে দুই দেশের অবস্থান দিন দিন বিপরীতমুখী হয়ে উঠছে।
সম্প্রতি সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরাইলের হামলার পর উত্তেজনা বাড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় জর্ডানে সিরিয়া ও ইসরাইলের প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠকও হয়েছে।
সিরিয়াই এখন বিরোধের প্রধান ক্ষেত্র
বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্ক ও ইসরাইলের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে সিরিয়া।
আঙ্কারা সিরিয়ার নতুন সরকারের সঙ্গে সামরিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে চাইছে। অন্যদিকে, সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক প্রভাব বাড়াকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি হিসেবে দেখছে ইসরাইল।
গত ১৮ আগস্ট তুরস্ক সীমান্তের কাছাকাছি সিরিয়ার আবু আল-দুহুর বিমানঘাঁটিতে ইসরাইলি হামলার পর দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ শুরু হয়। এতে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে তাদের দ্বন্দ্ব আরও প্রকাশ্য রূপ নেয়।
তুরস্কে নিযুক্ত মার্কিন দূত টম ব্যারাকও ওই হামলার সমালোচনা করেন। তিনি হামলাটিকে অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা সৃষ্টি হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তুরস্ককে সংঘাতে জড়িয়ে ফেলার চেষ্টা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় দাবি করে, সিরিয়া ওই ঘাঁটিতে তুর্কি সেনা মোতায়েনের অনুমতি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সেখানে তুরস্কের ব্যবস্থাপনায় রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল বলেও অভিযোগ করে ইসরাইল।
তবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের কার্যালয় এ দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
কেন তুরস্ককে নিয়ে উদ্বিগ্ন ইসরাইল?
সিরিয়ার দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের পর দেশটির পুনর্গঠনে তুরস্ক সামরিক প্রশিক্ষণ, সরঞ্জাম ও অন্যান্য সহায়তা দিয়ে আসছে। ফলে দামেস্কের নতুন সরকারের ওপর আঙ্কারার প্রভাব বাড়ছে।
অন্যদিকে, সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের পর সিরিয়ায় ইসরাইল একাধিক সামরিক অভিযান চালিয়েছে এবং দক্ষিণাঞ্চলের কিছু এলাকায় অবস্থানও শক্ত করেছে।
ইসরাইল সিরিয়ায় তুরস্কের সামরিক অবকাঠামো গড়ে তোলার বিরোধিতা করে আসছে। কারণ এতে সিরিয়ার আকাশসীমায় ইসরাইলের সামরিক তৎপরতা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে ২০২৪ সাল থেকে তুরস্ক-ইসরাইল সম্পর্ক আরও খারাপ হয়েছে। এরদোয়ানও একাধিকবার জানিয়েছেন, সিরিয়া, লেবাননসহ আশপাশের অঞ্চলে তুর্কি স্বার্থ ও মিত্রদের ওপর হামলা হলে আঙ্কারা তা উপেক্ষা করবে না।
ইসরাইলের বক্তব্যেও কঠোরতা
তুরস্কের আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধিকে ইসরাইলের বিভিন্ন মহল এখন সরাসরি নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে। দেশটির কিছু রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষক তুরস্ককে ‘নতুন ইরান’ হিসেবেও অভিহিত করছেন।
ইসরাইলের আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে বিষয়টি রাজনৈতিক প্রচারণাতেও উঠে এসেছে। নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির একটি নির্বাচনী বিলবোর্ডে এরদোয়ানের সঙ্গে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি, হিজবুল্লাহ নেতা নাইম কাসেম ও নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানিকে দেখানো হয়েছে।
তেল আবিবের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো গালিয়া লিন্ডেনস্ট্রসের মতে, তুরস্কের প্রতি ইসরাইলি উদ্বেগের পেছনে রয়েছে আঙ্কারার কঠোর বক্তব্য এবং এরদোয়ানের আঞ্চলিক সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সক্ষমতা।
মক্কা চুক্তিতে বদলাচ্ছে কৌশলগত হিসাব
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার নীতি রয়েছে। ফলে তুরস্ক ও ইসরাইলের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্রেও এই চুক্তি নতুন কৌশলগত হিসাব তৈরি করতে পারে।
তুরস্ক ইতোমধ্যে কাতারে সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। দোহায় কাতার-তুরস্ক যৌথবাহিনী কমান্ড পরিচালনার পাশাপাশি সেখানে প্রায় তিন হাজার তুর্কি সেনা রয়েছে। সোমালিয়ার মোগাদিশুতেও তুরস্কের কয়েক শ সেনার উপস্থিতি রয়েছে।
বিশ্লেষক লিন্ডেনস্ট্রসের মতে, কাতার ও সোমালিয়ায় তুরস্কের সামরিক উপস্থিতি এবং সিরিয়ায় সম্ভাব্য আরও বিস্তৃত ভূমিকা ইসরাইলের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সম্প্রতি ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এরদোয়ানকে সিরিয়ায় ইসরাইলের সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আঙ্কারার হস্তক্ষেপের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন।
‘ইসলামিক ন্যাটো’ হওয়ার পথে?
তুরস্কের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইলকের সেজারের মতে, মক্কা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এক দেশের ওপর হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার নীতি ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা নীতির সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।
চুক্তিটির শক্তির জায়গা হিসেবে বিশ্লেষকরা তিন দেশের ভিন্ন ভিন্ন সক্ষমতার কথা বলছেন। সৌদি আরব দিচ্ছে বিপুল অর্থনৈতিক শক্তি, তুরস্কের রয়েছে ন্যাটোর অন্যতম বৃহৎ সেনাবাহিনী ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প, আর পাকিস্তানের রয়েছে যুদ্ধ-অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী ও পারমাণবিক সক্ষমতা।
এই তিন শক্তির সমন্বয় আঞ্চলিক প্রতিপক্ষগুলোর কৌশলগত পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এটিকে সরাসরি ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে চিহ্নিত করা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। পাকিস্তানি নিরাপত্তা বিশ্লেষক উমাইর জামালের মতে, আপাতত ওয়াশিংটন এ জোট নিয়ে খুব বেশি উদ্বিগ্ন নয়। তবে দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের আঞ্চলিক নিরাপত্তা জোট মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি শুধু সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সামরিক সহযোগিতার বিষয় নয়; এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর শক্তির ভারসাম্যেও পড়তে পারে। আর সিরিয়াকে ঘিরে তুরস্ক-ইসরাইলের বিরোধ যত বাড়বে, নতুন এই প্রতিরক্ষা সমীকরণের গুরুত্বও তত বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
সূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট, রয়টার্স, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস ও দ্য উইক



