মানুষ সাধারণত অর্থ-সম্পদ, চাকরি, ব্যবসা কিংবা কোনো সুযোগ হারানোকে ‘ক্ষতি’ হিসেবে দেখে। কিন্তু কুরআনের দৃষ্টিতে প্রকৃত ক্ষতি কেবল দুনিয়াবি সম্পদ হারানো নয়; বরং সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো আখিরাতের সফলতা হারানো এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি অর্জন করা।
পবিত্র কুরআনে বিভিন্ন আয়াতে এমন কিছু মানুষের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের প্রকৃত অর্থেই ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ বলা হয়েছে। কুরআনের আলোকে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছয় শ্রেণি হলো—
১. আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকার ভঙ্গকারী
যারা আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকার করার পর তা ভঙ্গ করে, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, কুরআন তাদের ক্ষতিগ্রস্ত বলে উল্লেখ করেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
الَّذِينَ يَنقُضُونَ عَهْدَ اللَّهِ مِن بَعْدِ مِيثَاقِهِ… أُولَٰئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ
‘যারা আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়ার পর তা ভঙ্গ করে, যে সম্পর্ক বজায় রাখতে আল্লাহ আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করে—তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।’
(সুরা আল-বাকারা: ২৭)
২. আল্লাহর সঙ্গে শরিক স্থাপনকারী
ইসলামে শিরক অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করে এবং তওবা না করে সেই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, সে ভয়াবহ পরিণতির সম্মুখীন হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
‘যদি তুমি আল্লাহর সঙ্গে শরিক কর, তবে তোমার আমল অবশ্যই নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তুমি অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’
(সুরা আয-যুমার: ৬৫)
৩. আল্লাহর আয়াত অস্বীকারকারী
যারা অহংকার বা অবিশ্বাসের কারণে আল্লাহর আয়াত ও নিদর্শনকে অস্বীকার করে, কিয়ামতের দিন তারা নিজেদের প্রকৃত ক্ষতির মুখোমুখি হবে।
আল্লাহ বলেন—
وَمَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَٰئِكَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنفُسَهُم…
‘আর যাদের পাল্লা হালকা হবে, তারাই নিজেদের ক্ষতি করেছে।’
(সুরা আল-আরাফ: ৯)
৪. আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও আখিরাত অস্বীকারকারী
যারা মনে করে মৃত্যুর পর আর কোনো জীবন, হিসাব বা বিচার নেই, কুরআন তাদেরও ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
قَدْ خَسِرَ الَّذِينَ كَذَّبُوا بِلِقَاءِ اللَّهِ
‘নিশ্চয়ই তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যারা আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎকে মিথ্যা মনে করেছে।’
(সুরা আল-আনআম: ৩১)
৫. যে ব্যক্তি নিজেকে ও পরিবারকে আখিরাতের ক্ষতির দিকে ঠেলে দেয়
কিয়ামতের দিন সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতির মধ্যে একটি হলো নিজের পাশাপাশি পরিবার-পরিজনেরও আখিরাত নষ্ট হয়ে যাওয়া।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
قُلْ إِنَّ الْخَاسِرِينَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنفُسَهُمْ وَأَهْلِيهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ…
‘বলুন, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত তারাই, যারা কিয়ামতের দিন নিজেদের এবং নিজেদের পরিবার-পরিজনকে ক্ষতির মধ্যে ফেলবে। জেনে রেখো, এটাই সুস্পষ্ট ক্ষতি।’
(সুরা আয-যুমার: ১৫)
এ আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নিজের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদেরও সঠিক পথে উৎসাহিত করা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
৬. ইমান, সৎকর্ম, সত্য ও ধৈর্য থেকে বঞ্চিত ব্যক্তি
সুরা আল-আসর অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত হলেও মানুষের সফলতা ও ব্যর্থতার একটি পূর্ণাঙ্গ মাপকাঠি তুলে ধরে।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَالْعَصْرِ إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ
‘সময়ের শপথ! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তবে তারা ছাড়া, যারা ইমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে এবং পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে ও ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।’
(সুরা আল-আসর: ১–৩)
অর্থাৎ কুরআনের দৃষ্টিতে প্রকৃত সফলতার জন্য প্রয়োজন ইমান, সৎকর্ম, সত্যের পথে আহ্বান এবং ধৈর্য।
প্রকৃত ক্ষতি কোথায়?
দুনিয়ায় অর্থ-সম্পদ হারানো অবশ্যই কষ্টের বিষয়। কিন্তু সেগুলো আবার অর্জন করা সম্ভব। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো এমনভাবে জীবন কাটানো, যাতে মানুষ তার আখিরাতের সফলতা হারিয়ে ফেলে।
তাই কুরআনের শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ব্যাংক ব্যালেন্স, সম্পদ বা সামাজিক মর্যাদা নয়; প্রকৃত সফলতার মাপকাঠি হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি ও আখিরাতের মুক্তি।
আল্লাহ আমাদের ইমানের ওপর অটল রাখুন, সৎকর্ম করার তাওফিক দিন, সত্য ও ধৈর্যের পথে চলার শক্তি দিন এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে হেফাজত করুন। আমিন।



