মানবজীবনে পবিত্রতা রক্ষা, মানসিক প্রশান্তি অর্জন এবং সুশৃঙ্খল সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলার অন্যতম মাধ্যম হলো বৈবাহিক বন্ধন। ইসলাম মানুষের স্বাভাবিক চাহিদাকে স্বীকৃতি দিয়ে বিয়ের প্রতি যেমন উৎসাহ দিয়েছে, তেমনি এর জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম, শর্ত ও শিষ্টাচারও নির্ধারণ করেছে। অন্যদিকে, বিবাহবহির্ভূত অনৈতিক সম্পর্ক ও গোপন মেলামেশাকে ইসলাম নিষিদ্ধ করেছে।
ইজাব-কবুল ও সাক্ষীর উপস্থিতি
ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার জন্য ইজাব-কবুল অর্থাৎ প্রস্তাব ও গ্রহণ এবং সাক্ষীর উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, ন্যূনতম দুজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুজন নারী সাক্ষীর উপস্থিতিতে ইজাব-কবুল সম্পন্ন হতে হয়।
বিখ্যাত ফকিহ আলাউদ্দিন কাজানি (রহ.) বলেন, ‘বিয়ের মূল ভিত্তি হলো ইজাব ও কবুল।’
ইবনু নুজাইম (রহ.)-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শুধু মুখে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পরস্পরকে স্বীকার করলেই নতুন করে বৈবাহিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় না। সাক্ষীদের সামনে কোনো পুরুষ যদি কোনো নারীকে নিজের স্ত্রী এবং নিজেকে তার স্বামী বলে দাবি করেন এবং নারীও একই কথা বলেন, তবু নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ইজাব-কবুল না হলে নতুন বিবাহ সংঘটিত হবে না। কারণ, স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দেওয়া পূর্ববর্তী কোনো সম্পর্কের স্বীকৃতি হতে পারে; এর মাধ্যমে নতুন সম্পর্ক সৃষ্টি হয় না।
বিয়ের গুরুত্ব ও ফজিলত
ইসলাম যুবসমাজকে নৈতিক অবক্ষয় থেকে রক্ষা এবং চরিত্রের পবিত্রতা বজায় রাখতে বিয়ের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
দৃষ্টি সংযত ও লজ্জাস্থান হেফাজতের মাধ্যম
নবী করিম (সা.) যুবকদের উদ্দেশে বলেছেন—
يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ، مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوجْ، فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ، وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ
অর্থ: ‘হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যে বিয়ের সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিয়ে করে নেয়। কেননা তা দৃষ্টিকে সংযত রাখে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করে।’ (বুখারি, ৫০৬৬)
দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণতা
বিয়ের মর্যাদা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِذَا تَزَوَجَ الْعَبْدُ فَقَدْ اسْتَكْمَلَ نِصْفَ الدِّينِ، فَلْيَتَّقِ اللَّهَ فِي النِّصْفِ الْبَاقِي
অর্থ: ‘যখন কোনো বান্দা বিয়ে করে, তখন সে তার দ্বীনের অর্ধেক পূর্ণ করে। অতএব, বাকি অর্ধেকের বিষয়ে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে।’ (বায়হাকি, ৫৪৮৬; তাবরানি, ৯৭২)
বিয়ের সঠিক পদ্ধতি, অভিভাবক ও ঘোষণা
ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে বিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈধ চুক্তি ও পবিত্র বন্ধন। তাই এটি সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিয়ম ও মূলনীতি অনুসরণ করতে হয়।
অভিভাবকের ভূমিকা ও বিয়ের ঘোষণা
বিয়ের ক্ষেত্রে অভিভাবকের ভূমিকা নিয়ে ইসলামি ফিকহে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা রয়েছে। একটি হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন—
لَا نِكَاحَ إِلَّا بِوَلِيٍّ
অর্থ: ‘অভিভাবক ছাড়া বিয়ে নেই।’ (তিরমিজি, ১১০১)
এ ছাড়া বিয়েকে প্রকাশ্য করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারণ, গোপন সম্পর্ক বা গোপন বিয়েকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে পারিবারিক ও সামাজিক নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে।
তবে বিয়েতে অভিভাবকের ভূমিকা ও এর আইনগত প্রভাব মাজহাবভেদে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তাই নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনা
বিয়ের বৈধ বন্ধনের বাইরে নারী-পুরুষের অবৈধ সম্পর্ক ও অনৈতিক মেলামেশাকে ইসলাম কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَ لَا تَقۡرَبُوا الزِّنٰۤی اِنَّهٗ كَانَ فَاحِشَۃً ؕ وَ سَآءَ سَبِیۡلًا
অর্থ: ‘তোমরা জিনার কাছেও যেও না। নিশ্চয় তা অশ্লীলতা এবং অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত ৩২)
অঙ্গপ্রত্যঙ্গের জিনা
অবৈধ সম্পর্কের দিকে নিয়ে যেতে পারে—এমন বিভিন্ন আচরণ থেকেও সতর্ক করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
زِنَا الْعَيْنَيْنِ النَّظَرُ، وَزِنَا الْأُذُنَيْنِ الِاستِمَاعُ، وَزِنَا اللِّسَانِ الْكَلَامُ، وَزِنَا الْيَدِ الْبَطْشُ، وَزِنَا الرِّجْلِ الْخُطَا، وَالْقَلْبُ يَهْوَى وَيَتَمَنَّى، وَيُصَدِّقُ ذَلِكَ الْفَرْجُ أو يُكَذِّبُهُ
অর্থ: ‘দুই চোখের জিনা হলো (কামনার সঙ্গে) তাকানো, দুই কানের জিনা হলো (অবৈধ কথা) শোনা, জিহ্বার জিনা হলো কথা বলা, হাতের জিনা হলো স্পর্শ করা এবং পায়ের জিনা হলো সেদিকে হেঁটে যাওয়া। অন্তর কামনা ও আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে; আর লজ্জাস্থান সেটিকে বাস্তবায়িত করে অথবা করে না।’ (বুখারি, ৬২৪৩)
নির্জনে নারী-পুরুষের অবস্থান
গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের নির্জনে অবস্থানের বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন—
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ
অর্থ: ‘কোনো পুরুষ যখন কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে একত্রিত হয়, তখন তাদের তৃতীয়জন হয় শয়তান।’ (তিরমিজি, ২১৬৫)
বিয়ে শুধু পরিচয়ের বিষয় নয়
অতএব, কোনো নারী-পুরুষ পরস্পরকে স্বামী-স্ত্রী বলে পরিচয় দিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের মধ্যে নতুন বৈবাহিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় না। বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার জন্য শরিয়ত নির্ধারিত শর্ত ও পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়।
বৈধভাবে সংসার শুরু করতে ইজাব-কবুল, সাক্ষী এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট শরিয়তি বিধান যথাযথভাবে পালন করা জরুরি। অন্যদিকে, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, অনৈতিক মেলামেশা ও নির্জনবাস থেকে বিরত থাকার নির্দেশও ইসলামে স্পষ্টভাবে দেওয়া হয়েছে।
তবে কোনো নির্দিষ্ট নারী-পুরুষের সম্পর্ক আদৌ বৈধ বিবাহে পরিণত হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ঘটনার বিস্তারিত তথ্য, ইজাব-কবুলের ভাষা, সাক্ষীদের উপস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট মাজহাবের বিধান বিবেচনা করতে হবে। তাই বাস্তব কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতির কাছে বিস্তারিত তথ্য দিয়ে ফতোয়া নেওয়াই নিরাপদ।



