tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়অভিভাবক ছাড়া বিদেশযাত্রা: প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে বিমানবন্দরে আটকানোর আইন আছে কি?

অভিভাবক ছাড়া বিদেশযাত্রা: প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে বিমানবন্দরে আটকানোর আইন আছে কি?

প্রাপ্তবয়স্ক কোনো নারী একা বিদেশ ভ্রমণ করতে চাইলে তার স্বামী বা পরিবারের অনুমতি নেওয়া কি বাধ্যতামূলক? সঙ্গে কোনো অভিভাবক না থাকলে বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা ও বিমান টিকিট থাকার পরও কি বিমানবন্দর থেকে তাকে আটকে দেওয়া যায়? সাম্প্রতিক একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে নতুন করে সামনে এসেছে এসব প্রশ্ন।

গত ৮ আগস্ট নেপালে একটি সম্মেলনে অংশ নিতে যাচ্ছিলেন তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী। তাদের সবার কাছেই ছিল বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা ও বিমান টিকিট। তবে ঢাকার বিমানবন্দরে তাদের বিদেশযাত্রা আটকে দেন ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা।

অভিযোগ রয়েছে, এ সময় ওই নারীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়—তারা অবিবাহিত কি না, তাদের বিদেশযাত্রার বিষয়টি পরিবারের সদস্যরা জানেন কি না এবং কোনো অভিভাবক ছাড়া তারা কেন বিদেশে যাচ্ছেন।

পরে আইনি প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন ওই তিন নারী। প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত রুল জারি করেন। বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও তাদের বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার কার্যক্রম কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শুধু অবিবাহিত হওয়া, অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণ কিংবা লিঙ্গের ভিত্তিতে প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের বিদেশযাত্রায় বাধা না দেওয়ার নির্দেশনা কেন দেওয়া হবে না, সেটিও জানতে চেয়েছেন আদালত।

সংবিধানে কী বলা আছে?

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদে নাগরিকের চলাফেরার স্বাধীনতার পাশাপাশি দেশ ত্যাগ এবং দেশে ফিরে আসার অধিকার স্বীকৃত। তবে জনস্বার্থে আইনের মাধ্যমে এই অধিকারের ওপর যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ আরোপ করা যেতে পারে।

এ ছাড়া সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতার কথা বলা হয়েছে। ২৮ অনুচ্ছেদে লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্য না করার নীতিও স্বীকৃত হয়েছে।

পাসপোর্ট আইনে কী বলা আছে?

বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মূল আইনগুলোর একটি হলো বাংলাদেশ পাসপোর্ট আদেশ, ১৯৭৩। সেখানে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারী অবিবাহিত—এমন বিষয়কে বিদেশযাত্রা বন্ধের সাধারণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। একইভাবে স্বামী বা অভিভাবকের সঙ্গে ভ্রমণ করাকে প্রাপ্তবয়স্ক নারীর জন্য সাধারণ বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবেও বলা হয়নি।

তবে নির্দিষ্ট আইনগত পরিস্থিতিতে একজন নাগরিকের বিদেশযাত্রা সীমিত বা বন্ধ করা যেতে পারে। যেমন, আদালতের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা, কোনো গুরুতর অপরাধসংক্রান্ত আইনগত বাধা অথবা জাতীয় নিরাপত্তা ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, “বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে শুধু তিনি অবিবাহিত, একা বা অভিভাবক ছাড়া বিদেশ যাচ্ছেন—এই কারণে তার বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার কোনো সাধারণ আইনগত সুযোগ নেই।”

তিনি বলেন, সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিককে বাংলাদেশ ত্যাগ ও পুনরায় প্রবেশের মৌলিক অধিকার দিয়েছে। এ অধিকারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে হলে তা আইন দ্বারা আরোপিত এবং জনস্বার্থে যুক্তিসংগত হতে হবে। কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ধারণা বা প্রশাসনিক বিবেচনার ভিত্তিতে নতুন কোনো শর্ত আরোপ করা যায় না।

তার মতে, বৈধ পাসপোর্ট, প্রয়োজনীয় ভিসা বা অনুমতি এবং টিকিট থাকা অবস্থায় শুধু নারী হওয়া, অবিবাহিত হওয়া কিংবা সঙ্গে অভিভাবক না থাকার কারণে বিদেশযাত্রা বন্ধ করা হলে তা সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না—সে প্রশ্ন উঠতে পারে।

তিনি আরও বলেন, এর আগে অন্য একটি মামলাতেও বিদেশযাত্রার অধিকারে আইনগত ভিত্তি ছাড়া নির্বাহী হস্তক্ষেপের বিষয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ রয়েছে। নেপালগামী তিন নারীর ঘটনায় হাইকোর্ট ইতোমধ্যে তাদের বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার বৈধতা নিয়ে রুল জারি করেছেন।

তাহলে প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে আটকানো যাবে কি?

সাধারণভাবে শুধু অবিবাহিত হওয়া, নারী হওয়া কিংবা অভিভাবক ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ করছেন—এই কারণগুলোকে প্রাপ্তবয়স্ক কোনো নারীর বিদেশযাত্রা বন্ধের স্বতন্ত্র আইনগত ভিত্তি হিসেবে দেখানোর সুযোগ সীমিত।

তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে আদালতের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা, বৈধ ভ্রমণ নথির সমস্যা, ভিসা বা ইমিগ্রেশনসংক্রান্ত আইনগত জটিলতা কিংবা অন্য কোনো নির্দিষ্ট আইনি বাধা থাকলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।

ফলে বৈধ পাসপোর্ট, প্রয়োজনীয় ভিসা ও অন্যান্য ভ্রমণ নথি থাকা সত্ত্বেও শুধু অবিবাহিত হওয়া বা অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণের কারণে প্রাপ্তবয়স্ক নারীর বিদেশযাত্রা বন্ধ করা আইনসম্মত কি না—সাম্প্রতিক রিটের পর এই প্রশ্নের চূড়ান্ত ব্যাখ্যার জন্য আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।