tanaka
প্রচ্ছদমতামতক্ষমতার রাজনীতি নয়, মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনই হোক রাষ্ট্র পরিচালনার মূল লক্ষ্য

ক্ষমতার রাজনীতি নয়, মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনই হোক রাষ্ট্র পরিচালনার মূল লক্ষ্য

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দেশপ্রেমের প্রশ্নটি কেবল জাতীয়তাবাদী স্লোগান, রাজনৈতিক বক্তৃতা কিংবা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আবেগঘন বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। দেশপ্রেমের প্রকৃত পরিচয় পাওয়া যায় মানুষের জীবনে রাষ্ট্রের ইতিবাচক উপস্থিতি নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে। একজন নাগরিক যখন ন্যায্য অধিকার পান, কৃষক যখন তাঁর উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পান, শ্রমিক যখন শ্রমের মর্যাদা ও উপযুক্ত মজুরি পান, তরুণ যখন যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ পান এবং সাধারণ মানুষ যখন হয়রানি ছাড়া সরকারি সেবা লাভ করেন, তখনই দেশপ্রেমের রাজনৈতিক দর্শন বাস্তব অর্থ ধারণ করে। রাষ্ট্র পরিচালনার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনকে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় করে তোলা।

প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শন, জনকল্যাণের প্রতিশ্রুতি এবং সরকার পরিচালনার দক্ষতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও এই বাস্তবতাকে সামনে রাখা জরুরি। তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য ও অঙ্গীকারের তাৎপর্য শুধু দলীয় রাজনীতির সাফল্যে নয়; বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা কতটা জনমুখী হয়, প্রশাসন কতটা জবাবদিহিমূলক হয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, তার ওপর নির্ভরশীল।

একটি রাষ্ট্রের নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জাতীয় স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া। বাংলাদেশের মতো জনবহুল, অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় অথচ বহুমুখী সমস্যায় আক্রান্ত দেশে এই চ্যালেঞ্জ আরও গভীর। এখানে দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি দমন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হয়। ফলে নেতৃত্বের দক্ষতা কেবল রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা দিয়ে বিচার করা যায় না; বিচার করতে হয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিচক্ষণতা, বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং জনস্বার্থের ধারাবাহিকতার মাধ্যমে। তারেক রহমানের নেতৃত্বের মূল্যায়নেও থাকবে আবেগের পাশাপাশি যুক্তি, প্রত্যাশার পাশাপাশি বাস্তব ফলাফল এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পাশাপাশি সুশাসনের পরিমাপযোগ্য মানদণ্ড।

১. দেশপ্রেমের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় মর্যাদা ও জনগণের অধিকার রক্ষায় দৃঢ় থাকা। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় দেশপ্রেমের পরিধি আরও বিস্তৃত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, খাদ্যনিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্ন।

তারেক রহমানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সামনে এই বহুমাত্রিক জাতীয় স্বার্থকে কার্যকর নীতিতে রূপান্তর করার দায়িত্ব রয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এমন হতে হবে, যেখানে কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অযথা বৈরিতা কিংবা অন্ধ নির্ভরশীলতা—কোনোটিই প্রাধান্য পাবে না। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রেখে বাণিজ্য, পানি বণ্টন, সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও জ্বালানি সহযোগিতায় ন্যায্য স্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অগ্রাধিকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।

জাতীয় স্বার্থ রক্ষার অর্থ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করা নয়; বরং পারস্পরিক সম্মান, ন্যায্যতা ও বাস্তববাদী কূটনীতির ভিত্তিতে দেশের জন্য সর্বোত্তম ফল অর্জন করা। বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, প্রবাসী কর্মীদের অধিকার সংরক্ষণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আদায়—এসব ক্ষেত্রেই দক্ষ নেতৃত্বের পরিচয় স্পষ্ট হয়।

দেশপ্রেমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাষ্ট্রের সব নাগরিককে সমান মর্যাদার অধিকারী হিসেবে বিবেচনা করা। ধর্ম, বর্ণ, অঞ্চল, পেশা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিকের অধিকার নির্ধারিত হতে পারে না। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের পাশাপাশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, দরিদ্র জনগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, নারী, প্রবীণ এবং পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। যে রাষ্ট্র নাগরিকের পরিচয়ের চেয়ে নাগরিকত্বকে বড় করে দেখতে পারে, সেই রাষ্ট্রই প্রকৃত অর্থে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি শক্তিশালী করে। সুতরাং দেশপ্রেমের রাজনৈতিক দর্শনকে বাস্তবায়ন করতে হলে বক্তব্যের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, আইন প্রয়োগ এবং নাগরিক সেবার মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশকে ভালোবাসার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো দেশের মানুষের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা।

২. গণতান্ত্রিক রাজনীতির সার্থকতা নির্ধারিত হয় জনগণের জীবনমানের পরিবর্তনের মাধ্যমে। নির্বাচনে জয়লাভ একটি রাজনৈতিক দলের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ তৈরি করে, কিন্তু সেই সুযোগের যথার্থ ব্যবহারই নেতৃত্বের প্রকৃত পরিচয়। তারেক রহমানের সামনে তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যুক্ত করা।

বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে রাষ্ট্রের উন্নয়নের সুফল শুধু একটি শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং সমাজের প্রান্তিক মানুষও তার অংশীদার হবেন।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি। আয় সীমিত অথচ খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও পরিবহন ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকলে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের সাফল্য শুধু প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে, মানুষের প্রকৃত আয় বাড়ছে কি না, বাজারে পণ্যের দাম নাগালের মধ্যে থাকছে কি না এবং কর্মজীবী পরিবারগুলো সঞ্চয়ের সুযোগ পাচ্ছে কি না।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, বাজারের অস্বাভাবিক কারসাজি প্রতিরোধ, আমদানি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি কার্যকর করতে হবে। ফ্যামিলি কার্ডের মতো উদ্যোগ তখনই সফল হবে, যখন প্রকৃত সুবিধাভোগী সঠিকভাবে চিহ্নিত হবেন, বিতরণে স্বচ্ছতা থাকবে এবং রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ব্যক্তিগত যোগাযোগের ভিত্তিতে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ বন্ধ হবে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে নিছক অনুদান বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখাও সমীচীন নয়। এর সঙ্গে কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ যুক্ত করতে হবে। মানুষের হাতে সাময়িক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি তাঁকে দীর্ঘ মেয়াদে স্বাবলম্বী করে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের সাফল্য নির্ভর করে নাগরিককে সাহায্য করার পাশাপাশি তাঁর নিজের সক্ষমতা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টির ওপর।

৩. বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার মূল শক্তি কৃষক, শ্রমিক, প্রবাসী কর্মী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং তরুণ জনগোষ্ঠী। অথচ এই জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করে। কৃষক উৎপাদন ব্যয়ের চাপ সামলাতে হিমশিম খান, শ্রমিক ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের প্রত্যাশা করেন, আর শিক্ষিত তরুণেরা অনেক সময় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও উপযুক্ত কাজ খুঁজে পান না।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত এই সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান। কৃষক কার্ডের কার্যকারিতা নির্ভর করবে কৃষকের কাছে সার, বীজ, কৃষিযন্ত্র, সহজ ঋণ ও প্রয়োজনীয় কৃষিতথ্য পৌঁছানোর ওপর। উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সংরক্ষণাগার, হিমাগার, গ্রামীণ সড়ক, সরবরাহব্যবস্থা এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশ জরুরি। মধ্যস্বত্বভোগীদের অযৌক্তিক প্রভাব কমিয়ে কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি করতে পারলে কৃষক যেমন লাভবান হবেন, তেমনি ভোক্তার ব্যয় কমানোরও সুযোগ সৃষ্টি হবে।

কৃষিকে শুধু খাদ্য উৎপাদনের খাত হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না। আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা, জলবায়ু-সহনশীল চাষাবাদ এবং কৃষিভিত্তিক শিল্পের সমন্বয়ে এ খাতকে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ের শক্তিশালী উৎসে পরিণত করা সম্ভব। এ জন্য নীতিগত সহায়তার পাশাপাশি প্রয়োজন বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা।

তরুণদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। সরকারি চাকরি সীমিত; তাই প্রত্যেক শিক্ষিত তরুণের কর্মসংস্থানের প্রত্যাশা শুধু সরকারি নিয়োগের ওপর নির্ভর করতে পারে না। তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিপ্রযুক্তি, উৎপাদনশিল্প, পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা, সৃজনশীল অর্থনীতি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা খাতে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রমকে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে কারিগরি ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের বিস্তার ঘটানো প্রয়োজন।

তারেক রহমান তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এই অঙ্গীকারের বাস্তব সাফল্য নির্ভর করবে প্রশিক্ষণের মান, কর্মসংস্থানের প্রকৃত সংখ্যা, নতুন উদ্যোক্তার টিকে থাকার সক্ষমতা এবং শিক্ষিত বেকারত্ব হ্রাসের ওপর।

এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ ও উদ্ভাবনের অংশীদার হিসেবেও দেখতে হবে। তাঁদের মতপ্রকাশ, গবেষণা, সৃজনশীল উদ্যোগ এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা গেলে দেশের উন্নয়নপ্রক্রিয়ায় নতুন গতি সঞ্চারিত হতে পারে।

৪. সরকার পরিচালনা একটি বহুমাত্রিক দায়িত্ব। এখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অর্থনীতি, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, কূটনীতি, সামাজিক সুরক্ষা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে হয়। একটি সিদ্ধান্তের প্রভাব অনেক সময় একাধিক খাতে পড়ে। ফলে শুধু দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ নয়, সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য পরিণতি অনুধাবন এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও জরুরি।

তারেক রহমান সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা, প্রশাসনিক জবাবদিহি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন এবং মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়ের নির্দেশনা এ ধরনের প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের উদাহরণ। তবে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করাই দক্ষতার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য সুস্পষ্ট লক্ষ্য, নির্ধারিত সময়সীমা, পরিমাপযোগ্য ফলাফল এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। কোন প্রকল্পে কত অর্থ ব্যয় হলো, নির্ধারিত সময়ে কতটা কাজ সম্পন্ন হলো, মানুষের কী উপকার হলো এবং ব্যর্থতার কারণ কী—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা উচিত।

সরকারি অর্থ জনগণের কর, ঋণ ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় আয়ের সমন্বয়ে গঠিত। এই অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অপচয়, অনিয়ম ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের সুযোগ কমাতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা, জনস্বার্থ এবং দীর্ঘমেয়াদি সুফলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় বৃদ্ধি কিংবা সময়ক্ষেপণের জন্য সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনাও অপরিহার্য।

প্রশাসনিক দক্ষতার আরেকটি বড় পরীক্ষা হলো আমলাতন্ত্রকে কার্যকর ও জনবান্ধব করে তোলা। সরকারি কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা, নিরপেক্ষতা এবং দায়িত্ব পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদেরও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হবে। ফাইলের দীর্ঘসূত্রতা, সেবা পেতে ঘুষ, অযথা হয়রানি কিংবা রাজনৈতিক তদবিরের সংস্কৃতি দূর করা ছাড়া সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

তারেক রহমানের নেতৃত্বের কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে তিনি কতটা শক্তিশালী ও পেশাদার প্রশাসন গড়ে তুলতে পারেন, যেখানে ব্যক্তির আনুগত্যের চেয়ে যোগ্যতা এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে আইনের বিধান বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে।

৫. দুর্নীতি শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থের ক্ষতি করে না; এটি মানুষের অধিকার, সুযোগ ও আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। দুর্নীতির কারণে যোগ্য ব্যক্তি সুযোগ হারান, ব্যবসার ব্যয় বাড়ে, উন্নয়ন প্রকল্পের মান কমে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের বিশ্বাস দুর্বল হয়। তারেক রহমান সরকার পরিচালনার অগ্রাধিকারে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, কার্যকর দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি ক্রয় ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা।

দুর্নীতিবিরোধী অভিযান যেন প্রতিপক্ষকে হয়রানি কিংবা দলীয় প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার হাতিয়ার না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধের বিচার হতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। একইভাবে ক্ষমতাসীন দলের কেউ দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলদারি কিংবা অন্য কোনো অপরাধে জড়িত হলে তাঁর বিরুদ্ধেও সমানভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। যা ইতোপূর্বে মিরপুরের সাংসদ মিষ্টি ও ইসরাকের বেলায় আমরা লক্ষ্য করেছি। এধরনের কর্মকান্ড সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পায়।

কান্ড আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, কিন্তু নাগরিকের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করে নয়। গ্রেপ্তার, তদন্ত, বিচার এবং শাস্তি—প্রতিটি পর্যায়ে আইন ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। বিচারবহির্ভূত শাস্তি কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্তব্যবস্থা ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়ে তখনই, যখন তারা দেখেন আইন সবার জন্য সমান। ক্ষমতাবান ব্যক্তি এবং সাধারণ নাগরিকের জন্য যদি ভিন্ন মানদণ্ড কার্যকর হয়, তাহলে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। এ কারণেই দুর্নীতি দমন ও আইনের শাসন কেবল প্রশাসনিক কর্মসূচি নয়; এটি তারেক রহমানের নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতারও গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।

৬. গণতন্ত্রের শক্তি শুধু নির্বাচনে নয়, বরং ভিন্নমতকে সম্মান করার সংস্কৃতিতে। বিরোধী দল, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সরকারের সমালোচনা শত্রুতা নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি নীতির দুর্বলতা চিহ্নিত করে সংশোধনের সুযোগ তৈরি করে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হওয়া উচিত—সরকারের বৈধতা নির্বাচনী ম্যান্ডেট থেকে এলেও সরকারের দায়িত্ব সব নাগরিকের প্রতি। যারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন, যারা অন্য দলকে ভোট দিয়েছেন, কিংবা যারা ভোট দেননি, সবার অধিকার সমান। রাষ্ট্রকে কোনো দলের একক সম্পত্তি হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হবে।

বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের নিরাপত্তাও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ সব ধর্মের মানুষ এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নাগরিকদের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ধর্মীয় উৎসব পালনের নিরাপত্তা, উপাসনালয়ের সুরক্ষা এবং সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ।

একইভাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংসদীয় বিতর্ক এবং স্থানীয় সরকারব্যবস্থার কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। শক্তিশালী রাষ্ট্র মানে এমন রাষ্ট্র নয়, যেখানে সব সিদ্ধান্ত এককেন্দ্রিকভাবে নেওয়া হয়। বরং শক্তিশালী রাষ্ট্র হলো সেটি, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ম অনুযায়ী কাজ করে, ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকে এবং ভুল সিদ্ধান্ত সংশোধনের কার্যকর ব্যবস্থা থাকে।

৭. বাংলাদেশের অর্থনীতিকে টেকসই পথে এগিয়ে নিতে হলে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। শুধু সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়; প্রয়োজন উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের জন্য আস্থাশীল পরিবেশ সৃষ্টির।ব্যবসায়ীদের জন্য নীতির ধারাবাহিকতা, সহজ ঋণ, দ্রুত অনুমোদন এবং স্থিতিশীল আইনগত কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির নামে শ্রমিকের অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা কিংবা করের ন্যায্য দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। উন্নয়নকে হতে হবে অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর, সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং পরিবেশগতভাবে টেকসই। একই সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নয়নে মানবাধিকার, সুশাসন, গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা এবং স্বচ্ছতার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্য তুলে ধরেছেন।

এই লক্ষ্যকে বাস্তব রূপ দিতে হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে কার্যকর প্রতিষ্ঠান ও নির্ভরযোগ্য নীতির ভিত্তি শক্তিশালী করতে হবে।প্রবাসী কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, বিদেশে তাঁদের অধিকার সংরক্ষণ, বৈধ অভিবাসন সহজ করা এবং রেমিট্যান্স ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করাও অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ হওয়া প্রয়োজন। প্রবাসীদের শ্রম ও ত্যাগের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা গেলে তা পরিবার, স্থানীয় অর্থনীতি এবং জাতীয় উন্নয়নে আরও বড় অবদান রাখতে পারে।

৮. তারেক রহমানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সামনে সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বড় দায়িত্ব ও কঠিন পরীক্ষা। দেশপ্রেমের বক্তব্যকে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারে, জনকল্যাণের প্রতিশ্রুতিকে মানুষের বাস্তব সুবিধায় এবং সরকার পরিচালনার পরিকল্পনাকে দৃশ্যমান ফলাফলে রূপান্তর করতে পারলেই তাঁর নেতৃত্ব দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করবে।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি হলো আত্মসমালোচনার মানসিকতা। সরকারের ভুল হলে তা স্বীকার করা, ব্যর্থ নীতি সংশোধন করা, জনগণের অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে শোনা এবং বিরোধী মতের যৌক্তিক পরামর্শ গ্রহণ করা দুর্বলতার লক্ষণ নয়; বরং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচয়। রাষ্ট্র পরিচালনায় সব সিদ্ধান্ত সঠিক হবে না, কিন্তু ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সক্ষমতা একটি সরকারকে এগিয়ে নিতে পারে।

জনগণ সরকারের কাছে শুধু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি চান না; তাঁরা চান নিরাপদ জীবন, ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান, সাশ্রয়ী চিকিৎসা, মানসম্মত শিক্ষা এবং সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা। তাঁরা চান, তাঁদের করের অর্থ সঠিকভাবে ব্যয় হোক, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁরা আশাবাদী হতে পারেন এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে অন্যায় সুবিধা কিংবা বঞ্চনার শিকার হতে না হয়।

তারেক রহমান যদি রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে এই প্রত্যাশাগুলোকে গুরুত্ব দিতে পারেন, তাহলে তাঁর দেশপ্রেমের রাজনৈতিক দর্শন কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তা মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তনের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। আর যদি রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতা, প্রতিহিংসার পরিবর্তে ন্যায়বিচার, অপচয়ের পরিবর্তে দক্ষতা এবং ক্ষমতার প্রদর্শনের পরিবর্তে জনসেবাকে অগ্রাধিকার দেওয়া যায়, তাহলে বাংলাদেশ একটি অধিকতর দায়িত্বশীল ও জনমুখী রাষ্ট্রের পথে এগিয়ে যেতে পারবে।

শেষ পর্যন্ত ইতিহাস কোনো নেতাকে শুধু তাঁর বক্তব্য, জনপ্রিয়তা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করে না। ইতিহাস মূল্যায়ন করে তিনি মানুষের জন্য কী করেছেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে কতটা শক্তিশালী করেছেন, বৈষম্য কতটা কমিয়েছেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কেমন বাংলাদেশ রেখে গেছেন। তারেক রহমানের নেতৃত্বের সাফল্যও নির্ধারিত হবে এই কঠিন অথচ ন্যায্য মানদণ্ডেই।

দেশপ্রেমের সবচেয়ে বড় প্রমাণ দেশবাসীর জীবনমানের উন্নয়ন। আর জনকল্যাণমুখী রাজনীতির সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো—রাষ্ট্রকে মানুষের আস্থার জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করা। বাংলাদেশকে সেই জায়গায় পৌঁছে দিতে পারাই হবে তাঁর নেতৃত্বের প্রকৃত অর্জন।

ম. হামিদুল হক মানিক, কার্যনির্বাহী সদস্য: বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে)