রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক হামলা, সংঘর্ষ, জমি দখল, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা নতুন করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর মধ্যেই গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এসব সহিংসতার নেপথ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মদদ এবং অপরাধীচক্রগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের তথ্য উঠে আসার বিষয়টি সামনে এসেছে। প্রতিবেদনে আরও আশঙ্কা করা হয়েছে, সামনে জনজীবনে আরও বড় ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা হতে পারে।
এটি নিছক আইনশৃঙ্খলার একটি বিচ্ছিন্ন সংকেত নয়। বরং রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা, গোয়েন্দা সক্ষমতা, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, অপরাধী নেটওয়ার্কের পুনর্গঠন এবং নগর অর্থনীতির একটি অন্ধকার দিক—সবকিছুকে একসঙ্গে সামনে নিয়ে আসে। প্রশ্ন হলো, যদি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করতে পারে, তাহলে সেই তথ্য মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে? আর যদি শীর্ষ সন্ত্রাসীরা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বিভিন্ন অপরাধীচক্রকে প্রভাবিত করে থাকে, তাহলে তাদের অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক ভিত্তি ভেঙে দিতে রাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত?
সহিংসতার চরিত্র বদলাচ্ছে
সাম্প্রতিক সহিংসতার দিকে তাকালে একটি বিষয় স্পষ্ট—অপরাধ এখন আর কেবল ব্যক্তিগত বিরোধ বা বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জমি, ব্যবসা, নির্মাণকাজ, বাজার, পরিবহন, মাদক ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ অপরাধীচক্রের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। সেই প্রতিযোগিতায় রাজনৈতিক পরিচয়, স্থানীয় প্রভাব এবং অস্ত্রধারী গোষ্ঠীর সক্ষমতা একে অন্যের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। রাজধানীতে সাম্প্রতিক কয়েকটি হামলার ঘটনাকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরও এখন পুরোনো অপরাধী নেটওয়ার্কের দিকে। নিউ গিনি প্রোপার্টিজ, রাড্ডা ক্লিনিক, চাঁদ উদ্যান ও শ্যামলী হাউজিংকে ঘিরে হামলা ও দখলচেষ্টার অভিযোগ সামনে আসার পর বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে।
এখানে মূল সমস্যা শুধু হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করা নয়। হামলার নির্দেশদাতা কে, অর্থ জোগানদাতা কে, অস্ত্র সরবরাহ করছে কারা, স্থানীয় পর্যায়ে কারা আশ্রয় দিচ্ছে এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের অর্থনৈতিক লাভ কার কাছে যাচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করাই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ। কারণ একজন অস্ত্রধারীকে গ্রেপ্তার করলেই একটি নেটওয়ার্ক ধ্বংস হয় না। নেটওয়ার্কের অর্থের উৎস, যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রভাবশালী আশ্রয়দাতারা অক্ষত থাকলে নতুন লোক দিয়ে পুরোনো কাঠামো আবার দাঁড় করানো সম্ভব।
পুরোনো সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক কেন ফিরছে?
বাংলাদেশের নগর অপরাধের ইতিহাসে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একটি দীর্ঘ ও জটিল অধ্যায় রয়েছে। একসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে তাদের অনেকে আত্মগোপনে যায়, গ্রেপ্তার হয় অথবা কারাগারে থাকে। রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়ে কেউ কেউ আবার প্রকাশ্যে আসার সুযোগ পেয়েছে। এদের সঙ্গে স্থানীয় অপরাধী, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজ ও জমি দখলকারী চক্রের নতুন সম্পর্ক তৈরি হলে অপরাধের পুরোনো কাঠামো নতুন রূপ পেতে পারে।
চলতি বছরের বিভিন্ন প্রতিবেদনে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া বা দীর্ঘদিন পর সক্রিয় হয়ে ওঠা অপরাধীদের ঘিরে পুরোনো দ্বন্দ্ব, আধিপত্য বিস্তার ও প্রতিশোধমূলক সহিংসতার কথা এসেছে। একই সঙ্গে পুলিশ ও অপরাধ বিশ্লেষকদের বক্তব্যে অবৈধ অস্ত্র, দুর্বল মাঠপর্যায়ের সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অপরাধী নেটওয়ার্ক পরিচালনার অভিযোগ উঠলেই সেটিকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। গোয়েন্দা তথ্য তদন্তের সূচনা করতে পারে; কিন্তু আদালতে দায় প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন সাক্ষ্য, আলামত, আর্থিক লেনদেন, যোগাযোগের তথ্য এবং অন্যান্য আইনসম্মত প্রমাণ।
এই পার্থক্যটি বজায় রাখা জরুরি। কারণ অপরাধ দমনের নামে যদি গোয়েন্দা তথ্যকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার বানানো হয়, তাহলে প্রকৃত অপরাধীরা যেমন আড়ালে থেকে যাবে, তেমনি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও জনগণের আস্থা হারাবে।
সবচেয়ে বড় বিপদ ‘পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতি’
শীর্ষ সন্ত্রাসীরা নিজেরা সবসময় মাঠে থাকে না। তাদের শক্তির বড় অংশ আসে অন্যদের ব্যবহার করার সক্ষমতা থেকে। একটি এলাকায় কয়েকজন অস্ত্রধারী তরুণ, কয়েকজন চাঁদাবাজ, কিছু দালাল, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং অর্থের জোগানদাতাকে একত্র করা গেলে একটি ছোট অপরাধীচক্রও দ্রুত শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। এ কারণেই অপরাধ দমনে শুধু ‘সন্ত্রাসী ধরো’ নীতি যথেষ্ট নয়। দরকার ‘অপরাধের অর্থনীতি ভাঙো’ নীতি।
যে জমি দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ হচ্ছে, সেই জমির মালিকানা নিয়ে আদালতের মামলা আছে কি না—তা খুঁজতে হবে। কে জমি কেনাবেচার মধ্যস্থতা করছে, কার ব্যাংক বা মোবাইল আর্থিক হিসাবে অস্বাভাবিক অর্থ ঢুকছে, কোন ব্যবসা থেকে চাঁদা আদায় হচ্ছে, কারা অস্ত্রের খরচ দিচ্ছে—এসব তথ্য একত্র করে অপরাধের আর্থিক কাঠামো শনাক্ত করতে হবে। বর্তমান সময়ে এটি আগের তুলনায় অনেক বেশি সম্ভব। ব্যাংকিং ব্যবস্থা, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, সিসিটিভি, মোবাইল ফোনের ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল যোগাযোগের তথ্য তদন্তকে অনেক শক্তিশালী করতে পারে—অবশ্যই আদালতসম্মত প্রক্রিয়া ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তার আইন মেনে।
গোয়েন্দা তথ্য আছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ কতটা?
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অনেক ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সহিংসতার বিষয়ে আগাম তথ্য পাওয়ার পরও তা মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতিতে পুরোপুরি রূপান্তর করতে পারেনি। কর্মকর্তারা দুর্বল সমন্বয়, ঘন ঘন বদলি, স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে নতুন কর্মকর্তাদের সীমিত অভিজ্ঞতা এবং সিদ্ধান্ত নিতে অনীহার মতো সমস্যার কথা বলেছেন। এখানেই গোয়েন্দা ব্যবস্থার আসল পরীক্ষা।
একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন যতই নিখুঁত হোক, সেটি যদি সংশ্লিষ্ট থানার ওসি, জোনাল কর্মকর্তা, গোয়েন্দা ইউনিট এবং অপারেশনাল কমান্ডের কাছে সময়মতো না পৌঁছায়, কিংবা পৌঁছানোর পর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যদি কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারেন, তাহলে গোয়েন্দা তথ্যের মূল্য প্রায় শূন্যে নেমে আসে। তাই প্রয়োজন ‘ইন্টেলিজেন্স টু অ্যাকশন’ ব্যবস্থার। অর্থাৎ তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে ঝুঁকি মূল্যায়ন, মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব বণ্টন, নজরদারি, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং ঘটনার পর তদন্ত—পুরো প্রক্রিয়াকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মধ্যে আনতে হবে।
১২২ অপরাধীচক্রের তথ্য কী বার্তা দেয়?
রাজধানীতে ১২২টি সক্রিয় অপরাধীচক্রের অস্তিত্বের তথ্য সম্প্রতি সামনে এসেছে। ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, মিরপুরে সবচেয়ে বেশি অপরাধীচক্র সক্রিয় এবং মোহাম্মদপুর এলাকায় গ্যাং-সংঘাতের কারণে প্রাণহানির ঘটনাও উল্লেখযোগ্য। এসব চক্র জমি, ব্যবসা, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, বাজার, ফুটপাত, মাদক ও চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই পরিসংখ্যান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এতে বোঝা যায়, অপরাধ কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির সমস্যা নয়; এটি একটি নেটওয়ার্কভিত্তিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বদলে অপরাধী নেটওয়ার্কের কার্যক্রম নতুন রাজনৈতিক আশ্রয়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার অভিযোগও এসেছে। অর্থাৎ অপরাধী যদি কোনো একটি দলের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাকে দমন করার পর অন্য কোনো রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ে নতুন করে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ থাকে—তাহলে সমস্যার মূল জায়গায় আঘাত করা হচ্ছে না। অপরাধীর পরিচয় তাই রাজনৈতিক হওয়া উচিত নয়। অপরাধীর পরিচয় একটাই—সে অপরাধী। একইভাবে পৃষ্ঠপোষকের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য হওয়া দরকার।
রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ভাঙতে না পারলে অভিযান ব্যর্থ হবে
বাংলাদেশে সংঘবদ্ধ অপরাধের সবচেয়ে কঠিন দিকগুলোর একটি হলো অপরাধী ও প্রভাবশালীদের সম্পর্ক। একজন সন্ত্রাসীর হাতে অস্ত্র থাকা যতটা বিপজ্জনক, তার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক হলো সেই অস্ত্রধারীর পেছনে এমন একজন প্রভাবশালী থাকা, যার কারণে পুলিশ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করে। এই দ্বিধা যদি তৈরি হয়, তাহলে অপরাধী বুঝে যায়—আইনের নাগাল থেকে বের হওয়ার পথ আছে।
সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ প্রশাসন থেকে দল-মত নির্বিশেষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পুলিশপ্রধানও অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে তার অপরাধী পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও অপরাধী ও অপরাধের পৃষ্ঠপোষক—উভয়ের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
এটি বাস্তবে কার্যকর করা গেলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু ঘোষণা যথেষ্ট নয়। এর প্রমাণ দিতে হবে কয়েকটি কঠিন মামলায়—যেখানে অপরাধী যেমন গ্রেপ্তার হবে, তেমনি তার পৃষ্ঠপোষক, অর্থদাতা ও নির্দেশদাতার বিরুদ্ধেও নিরপেক্ষ তদন্ত হবে।
যৌথ অভিযান—কেন দরকার, কীভাবে?
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে যৌথ অভিযানের প্রয়োজনীয়তার কথাও এসেছে। যৌথ অভিযান বলতে শুধু বড় সংখ্যক পুলিশ নিয়ে কোনো এলাকায় অভিযান চালানো বোঝানো উচিত নয়। বরং পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ, আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার তথ্য একত্র করে লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান পরিচালনা করা বেশি কার্যকর।
একটি অপরাধীচক্রের বিরুদ্ধে অভিযানের আগে জানতে হবে—
কে নেতৃত্ব দিচ্ছে?
অর্থ কোথা থেকে আসছে?
অস্ত্র কোথা থেকে আসছে?
কোন এলাকায় তাদের প্রভাব?
কারা তাদের সহযোগী?
কোন ব্যবসা বা জমি দখল থেকে আয় হচ্ছে?
কোন রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব তাদের সুরক্ষা দিচ্ছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া গেলে অভিযান হবে তথ্যনির্ভর। অন্যথায় তা কেবল দৃশ্যমান কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
কিশোর গ্যাংকে শুধু অপরাধী হিসেবে দেখলে চলবে না
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কিশোর ও তরুণদের ব্যবহার। বিভিন্ন অপরাধীচক্র কম বয়সী ছেলেদের ব্যবহার করে থাকে—কারণ তাদের ওপর সরাসরি সন্দেহ কম পড়ে এবং তাদের দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো তুলনামূলক সহজ। সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী অভিযান জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের এসব গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকদের তথ্য সংগ্রহের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এখানে শুধু গ্রেপ্তার অভিযান যথেষ্ট নয়। একজন কিশোর কেন অপরাধীচক্রে ঢুকছে, কে তাকে অস্ত্র দিচ্ছে, কে তাকে টাকা দিচ্ছে এবং কে তাকে রাজনৈতিক বা সামাজিক সুরক্ষা দিচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন। কারণ কিশোরকে সরিয়ে দিলে যদি তার জায়গায় আরও পাঁচজনকে আনা যায়, তাহলে অভিযান সাময়িকভাবে দৃশ্যমান ফল দেবে, কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
পুলিশের সংস্কার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমাধান অসম্ভব
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটির প্রতিবেদনে সহিংস অপরাধ, কিশোর গ্যাং, সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং ডিজিটাল প্রতারণাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে গোয়েন্দাভিত্তিক টহল, সিসিটিভি, দ্রুত সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা, অপরাধী ডাটাবেজ এবং প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিংয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন জরুরি।
একই থানায় প্রতিদিনের সাধারণ দায়িত্বের সঙ্গে সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলার দায়িত্বও চাপিয়ে দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। বিশেষায়িত তদন্ত ইউনিটকে আরও দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অপরাধীচক্রের জন্য আলাদা তথ্যভান্ডার থাকা দরকার—যেখানে তার সদস্য, যোগাযোগ, মামলা, অস্ত্র, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সহযোগীদের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ হবে।
‘অপারেশন’ নয়, দরকার ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় কৌশল
অভিযান শুরু হলে কিছুদিন অপরাধ কমে আসা স্বাভাবিক। কিন্তু অভিযানের পর নজরদারি বন্ধ হয়ে গেলে অপরাধীরা আবার সংগঠিত হতে পারে। তাই একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল দরকার। প্রথম ধাপে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও অপরাধীচক্র শনাক্ত করতে হবে। দ্বিতীয় ধাপে অস্ত্র, অর্থ ও পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ক ভাঙতে হবে। তৃতীয় ধাপে মামলা দ্রুত তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হবে। চতুর্থ ধাপে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও জনগণকে সম্পৃক্ত করে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—অভিযান যেন ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে না হয়ে অপরাধের বিরুদ্ধে হয়।
জনগণের আস্থা ফেরানোই চূড়ান্ত লক্ষ্য
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় মানুষের মানসিকতায়। একজন সাধারণ নাগরিক যখন মনে করেন, প্রভাবশালী কেউ চাইলে তার জমি দখল করতে পারে, ব্যবসায় চাঁদা চাইতে পারে কিংবা অস্ত্র নিয়ে হামলা করতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত আইনের হাত থেকে বেরিয়ে যেতে পারে—তখন রাষ্ট্রের প্রতি তার আস্থা কমতে থাকে।
এই আস্থার সংকট অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে। বিনিয়োগ কমে, ব্যবসার খরচ বাড়ে, জমি ও সম্পত্তির বিরোধ বাড়ে এবং তরুণদের একটি অংশ অপরাধী নেটওয়ার্কের সহজ অর্থের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। তাই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মদদসংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্যকে শুধু একটি অপরাধসংক্রান্ত খবর হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি রাষ্ট্রের জন্য একটি সতর্কসংকেত।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে যদি সত্যিই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মদদে বিভিন্ন সহিংসতা ও অপরাধীচক্র সক্রিয় হওয়ার তথ্য থাকে, তাহলে এখন সবচেয়ে প্রয়োজন ঠান্ডা মাথায়, প্রমাণভিত্তিক ও দলনিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়া। আতঙ্ক ছড়িয়ে বা রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না।
প্রথম কাজ হতে হবে তথ্য যাচাই। দ্বিতীয় কাজ অপরাধী নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা। তৃতীয় কাজ তাদের অর্থ ও অস্ত্রের উৎস বন্ধ করা। চতুর্থ কাজ পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনা। পঞ্চম কাজ মামলা ও বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত করা।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, গোয়েন্দা প্রতিবেদন কোনো আদালতের রায় নয়। প্রতিবেদনে যে নাম বা নেটওয়ার্কের কথা আসবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ তদন্ত ও প্রমাণ ছাড়া অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। এই ভারসাম্যই রাষ্ট্রের শক্তি।
আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এমন একটি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা, যেখানে অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধই হবে বিচারের ভিত্তি। যে সন্ত্রাসী মাঠে অস্ত্র চালায় এবং যে প্রভাবশালী তার হাতে অস্ত্র তুলে দেয়—আইনের চোখে দুজনেরই জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ সন্ত্রাসীর হাত ভাঙা জরুরি, কিন্তু সন্ত্রাসী তৈরির কারখানা বন্ধ করা আরও জরুরি। আর সেই কারখানার জ্বালানি যদি হয় অর্থ, অস্ত্র, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি—তাহলে শুধু অভিযান দিয়ে নয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত সংস্কার ও কঠোর আইনি প্রয়োগের মাধ্যমেই এই চক্র ভাঙতে হবে।
জননিরাপত্তা কোনো দলের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা—গোয়েন্দা তথ্যকে কতটা কার্যকর, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মত পদক্ষেপে রূপান্তর করা যায়।
ম. হামিদুল হক মানিক, কার্যনির্বাহী সদস্য, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন



