tanaka
প্রচ্ছদমতামত‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ ছেড়ে সামরিক জোটে যোগ দিয়ে কী লাভ?

‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ ছেড়ে সামরিক জোটে যোগ দিয়ে কী লাভ?

কূটনৈতিক অঙ্গনে বিষয়টি বাহবা কুড়ানোর মতো মনে হলেও, সদ্যগঠিত ‘মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট’ বা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে রয়েছে নানা কৌশলগত ঝুঁকি। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে নিয়ে গঠিত এই সামরিক জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের প্রস্তাব এখন নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এক পররাষ্ট্রনৈতিক প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

প্রস্তাবটি শুনতে আকর্ষণীয়—তিনটি প্রভাবশালী মুসলিমপ্রধান দেশের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা এবং ন্যাটোর আদলে ‘একজনের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা’ নীতিতে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা। কিন্তু পররাষ্ট্রনীতি কেবল আবেগ, প্রতীক বা ধর্মীয় সংহতির ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হতে পারে না। জাতীয় স্বার্থ, ভৌগোলিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা বিবেচনাই সেখানে মুখ্য।

বাংলাদেশের জন্য এই জোটে যোগ দেওয়া অর্থ হতে পারে এমন কিছু নিরাপত্তা দায় গ্রহণ করা, যার সরাসরি প্রয়োজন বা সুস্পষ্ট সুফল দেশের জন্য নাও থাকতে পারে। দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, সামরিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘদিনের জোটনিরপেক্ষ কূটনৈতিক অবস্থান বিবেচনায় কোনো সামরিক জোটে যুক্ত হওয়ার আগে সরকারকে অত্যন্ত সতর্কভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

মক্কা চুক্তি সৌদি আরব, তুরস্ক বা পাকিস্তানের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু অন্য দেশগুলোর প্রয়োজন বাংলাদেশের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য—এমনটি ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা

ঢাকার প্রথমেই যে প্রশ্নটি করা প্রয়োজন, তা হলো—বাংলাদেশ ঠিক কোন নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলার জন্য এই সামরিক জোটে যোগ দিতে চাইছে?

বাংলাদেশ এমন একটি ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে, যেখানে দেশের নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ মূলত বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল, ভারতীয় সীমান্ত, মিয়ানমার এবং রোহিঙ্গা সংকটকে ঘিরে। দেশের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সন্ত্রাস ও আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমন এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।

পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে উষ্ণ হয়েছে। এটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন। তবে পররাষ্ট্রনীতিতে ইতিহাস একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম। ফলে সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার প্রশ্নে দেশের জনগণের ঐতিহাসিক সংবেদনশীলতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।

পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো সামরিক জোটে যুক্ত হলে দেশটির কৌশলগত বিরোধ ও নিরাপত্তা হিসাবের কিছু অংশ বাংলাদেশের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্বের মতো আঞ্চলিক বিরোধে বাংলাদেশকে কোনো পক্ষের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার প্রয়োজন আছে কি না, তা গভীরভাবে বিবেচনা করা দরকার।

অনেকে ভারতের ওপর কৌশলগত চাপ তৈরির যুক্তিতে বাংলাদেশের এই জোটে যোগ দেওয়ার পক্ষে মত দিতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিবেশী পরিবর্তন করা যায় না। তাই প্রতিবেশীদের সঙ্গে বৈরিতা বাড়ানোর বদলে পারস্পরিক সম্মান, সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রাখাই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বাংলাদেশের দুই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমার। দুই দেশের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি। মিয়ানমারে চলমান সংঘাত এবং রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য বড় নিরাপত্তা ও মানবিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত।

এমন বাস্তবতায় কোনো সামরিক জোটে বাংলাদেশের যোগদান আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। এর প্রভাব শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; অর্থনীতি, বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কেও তা পড়তে পারে।

দরকার পারস্পরিক সহযোগিতা, সামরিক জোট নয়

বাংলাদেশের উচিত সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রাখা। একই সঙ্গে দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক, দক্ষ ও সময়োপযোগী করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। তুরস্কের কাছ থেকে আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সংগ্রহ কিংবা সৌদি আরবের সঙ্গে জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো বাংলাদেশের জন্য উপকারী হতে পারে।

কিন্তু এসব সহযোগিতার জন্য সামরিক জোটে যোগ দেওয়া অপরিহার্য নয়। কোনো দূরবর্তী অঞ্চলের দেশ আক্রান্ত হলে বাংলাদেশের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আগাম প্রতিশ্রুতিও প্রয়োজন নেই।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি হলো বিভিন্ন শক্তিধর দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। ওয়াশিংটন, বেইজিং, লন্ডন, মস্কো, দিল্লি ও রিয়াদ—বিভিন্ন ইস্যুতে এসব দেশ পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও বাংলাদেশ তাদের সবার সঙ্গেই নিজস্ব স্বার্থ অনুযায়ী সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে।

কোনো সামরিক জোটে যোগ দিলে সেই কৌশলগত নমনীয়তা কিছুটা হলেও সীমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে কেবল ধর্মীয় সংহতি বা তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভের কথা বিবেচনা করে জাতীয় নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক স্বাধীনতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলা ঠিক হবে না। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেও বাংলাদেশ স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে পারে।

মক্কা চুক্তি শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখা। সরাসরি কোনো সামরিক জোটে না গিয়ে প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়ানোই হতে পারে অধিক বাস্তবসম্মত পথ।

এই জটিল ও পরিবর্তনশীল বিশ্বে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো নির্দিষ্ট সামরিক জোটের অংশ হওয়া নয়; বরং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার সক্ষমতা এবং সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশলগত স্বাধীনতা।