tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়ওষুধের দাম নাগালের মধ্যে রাখতে ভারসাম্যপূর্ণ নীতির সুপারিশ

ওষুধের দাম নাগালের মধ্যে রাখতে ভারসাম্যপূর্ণ নীতির সুপারিশ

ওষুধের দাম যতটা সম্ভব কম রাখাই ওষুধনীতির একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। রোগীর সামর্থ্যের মধ্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানসম্মত ওষুধের উৎপাদন ও সরবরাহ টেকসই রাখতে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বিজ্ঞানভিত্তিক অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়ন, স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য মূল্য নির্ধারণ, নিয়মিত মূল্য পর্যালোচনা, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং রোগীর আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছেন।

মঙ্গলবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাইনেট আয়োজিত ‘রোগীর নাগালে ওষুধ, উৎপাদকের টেকসইতা: ভারসাম্যপূর্ণ ওষুধনীতির সন্ধানে’ শীর্ষক জাতীয় নীতি সংলাপ ২০২৬-এ এসব কথা উঠে আসে। সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও অ্যালায়েন্স ফর হেলথ রিফর্মস বাংলাদেশের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ।

তিনি বলেন, রোগীর জন্য ওষুধ সাশ্রয়ী রাখা এবং ওষুধশিল্পের টেকসইতা নিশ্চিত করা পরস্পরবিরোধী লক্ষ্য নয়; বরং একই জনস্বাস্থ্যনীতির দুটি অপরিহার্য উদ্দেশ্য। তাঁর ভাষায়, ‘ওষুধনীতির লক্ষ্য সর্বনিম্ন সম্ভাব্য মূল্য নির্ধারণ নয়; লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি টেকসই মূল্য, যা রোগী বহন করতে পারেন এবং উৎপাদকও টেকসইভাবে মানসম্মত ওষুধ উৎপাদন করতে পারেন।’

মূল প্রবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশে ১৯৯৪ সাল থেকে ১১৭টি তালিকাভুক্ত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণে মূলত কস্ট-প্লাস প্রাইসিং পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। তবে নিয়মিত মূল্য সমন্বয় না হওয়া এবং ২০২২ সালের পর এসব ওষুধের মূল্য পুনর্নির্ধারণ না করায় কাঁচামাল, জ্বালানি, শ্রম, প্যাকেজিং, পরিবহন ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তনের সঙ্গে উৎপাদন ব্যয়ের ব্যবধান বেড়েছে। এতে কম মূল্যের কিছু প্রয়োজনীয় ওষুধের উৎপাদন ও সরবরাহ টেকসই রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

প্রবন্ধে আরও বলা হয়, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ২৯৫টিতে উন্নীত করে নতুন মূল্য কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে আগস্টে বাস্তবায়নের আগেই সেই উদ্যোগ বাতিল করা হয়।

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়নে রোগের বোঝা, ক্লিনিক্যাল প্রমাণ, নিরাপত্তা, ব্যয়-কার্যকারিতা এবং রোগীর আর্থিক বোঝা বিবেচনার সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে মূল্য নির্ধারণ ও ওষুধ নিয়ন্ত্রণে স্বচ্ছতা, নির্ভরযোগ্য বাজার তথ্য, কার্যকর প্রতিযোগিতা, অংশীজনের পরামর্শ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।

আলোচনায় ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় ওষুধ কোম্পানিগুলোকে সরাসরি যুক্ত করার সুযোগ থাকা উচিত নয়। ২০২৬ সালে করা অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকাও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের তুলনায় কম বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, তালিকা প্রণয়নে কোম্পানিগুলোকে সম্পৃক্ত করলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হতে পারে। তবে তাদের মতামত ও পর্যবেক্ষণের সুযোগ রাখা যেতে পারে। একই সঙ্গে দেশীয় ওষুধশিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধি ও মিশন প্রধান ডা. মামুনুর রহমান মালিক বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতি দুই বছর পরপর অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা হালনাগাদ করে। বাংলাদেশে ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টর অ্যাসেসমেন্ট সার্ভে করা হয় না। তাই ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ২০২৩ সালের ওষুধ ও কসমেটিকস আইনের ১৩ ধারায় অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রকাশ এবং প্রতি দুই বছর পরপর তা হালনাগাদের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। কিন্তু সেটি কার্যকর হয়নি। জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের কথা থাকলেও তা হয়নি। তাই ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণে স্থায়ী ও আইনসম্মত প্রক্রিয়া প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. সেলিম রেজা বলেন, বাংলাদেশের ওষুধশিল্প দেশের অন্যতম গর্বের খাত। এ শিল্পকে টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে হবে।

স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সদস্য আবু মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, অপ্রয়োজনীয় মোড়ক ও প্রচার ব্যয়ের কারণে ওষুধের দাম বাড়ানো উচিত নয়। চিকিৎসকদের উপহার, বিদেশ ভ্রমণসহ বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার প্রবণতাও নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. চৌধুরী মাহমুদ হাসান বলেন, মানসম্মত ওষুধ উৎপাদন নিশ্চিত করতে বাস্তবসম্মত মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। কম দামে ওষুধ সরবরাহ করতে হলে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে। বিশেষ করে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের ক্ষেত্রে সরকারি ভর্তুকির বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

ড্যাব মহাসচিব জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, রোগীর নাগালে ওষুধ বলতে রোগীর আয় অনুযায়ী সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ পাওয়াকে বোঝায়। দেশে একটি কার্যকর জাতীয় ওষুধনীতি ও স্বাস্থ্যনীতি প্রয়োজন। সংলাপের সুপারিশগুলো সমন্বিত করে সরকারের কাছে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এনডিএফের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেন ওষুধ কোম্পানিগুলোর উদ্দেশে বলেন, চিকিৎসকদের উপহার দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। বিপুল অর্থ বিপণনে ব্যয় না করে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের দাম কমানো এবং রোগীর স্বার্থে ব্যয় করা হলে তা বেশি কার্যকর হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক এ ধরনের নীতি সংলাপ ধারাবাহিকভাবে আয়োজনের আহ্বান জানান। তিনি চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য খাতে অনৈতিক আর্থিক লেনদেন বন্ধের ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্য উন্নয়নের মাধ্যমে স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনের তাগিদ দেন।

বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির (বাপি) ট্রেজারার ও স্কয়ারের নির্বাহী পরিচালক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে যেন উৎপাদন কমে না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। বাপির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট এম মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, ওষুধশিল্পের টেকসইতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি উৎপাদন সক্ষমতাও আরও শক্তিশালী করতে হবে।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের উপপরিচালক তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ডিজিডিএ মূলত নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে কাজ করে না। নীতির আলোকে তদারকি, সমন্বয় ও মনিটরিং করাই তাদের দায়িত্ব।

জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ বলেন, ড্রাগ কন্ট্রোল অথোরিটিকে আরও পেশাদার হতে হবে। চিকিৎসকদের বিনামূল্যে ওষুধ দেওয়ার মতো অনৈতিক ও অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করা প্রয়োজন।

ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ বলেন, প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ রোগীদের পকেট থেকে চিকিৎসায় ব্যয় হচ্ছে। বিপণনে ব্যয় করা অর্থের একটি অংশ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধে ব্যয় করা হলে প্রান্তিক মানুষের উপকার হবে। তিনি এ ধরনের নীতি সংলাপ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।

সংলাপে ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. শাদরুল আলম এবং ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির ভূইয়াসহ আরও অনেকে বক্তব্য দেন।