বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও প্রয়াত দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া দেশে মানবিক নেতৃত্ব দিয়েছেন। যা দেশের মানুষের কাছে চিরঅমøান। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে স্বল্প সময়ে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ ধারণা, গ্রামকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিশেষ ঋণ বিতরণ কর্মসূচি, বেসরকারি খাত ও শিল্পায়ন, রেমিট্যান্স ও প্রবাসী শ্রমবাজার, পোশাকশিল্প, বহুদলীয় রাজনীতির সূচনা, স্বনির্ভর বাংলাদেশ কর্মসূচি, খাল খনন কর্মসূচি, গ্রাম সরকার প্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও সম্পর্ক উন্নয়নে দেশ ব্যাপক সফলতা অর্জন করে। ১৯৯১-১৯৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে তিনি অর্থনীতিকে বাজারমুখী করতে নীতিগত সংস্কার গ্রহণ করেন। বিশেষ করে ব্যাংকিং ব্যবস্থা, ভ্যাট প্রচলন, নারী শিক্ষা, বিমা খাত, শেয়ারবাজার ও তৈরি পোশাকশিল্পে তাঁর সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো দেশে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
সেই ধারাবাহিকতা রক্ষায় মানবিকতা আর নেতৃত্বের মেলবন্ধনে তারেক রহমান নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন দেশের মানুষের কাছে। তারেক রহমানের তথা বিএনপির ৩১ দফা কর্মসূচির প্রতিশ্রুতিগুলো একটি নতুন রাষ্ট্রচিন্তার রূপরেখা হিসেবে তুলে ধরে রাষ্ট্র সংস্কার এবং নতুন সমাজ বিনির্মাণের জন্য তিনি রাষ্ট্রের বেসিক কাঠামোর কিছু পরিবর্তনের কথা বলেছেন। এই পরিবর্তনগুলো ছাড়া আসলে ‘জনগণের রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। ১৩ জুলাই, ২০২৩ সালে রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের রূপরেখায় তিনি জাতির উদ্দেশে ঘোষণা দিয়েছিলেনÑ জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করতে হবে। তিনি বলেছেনÑ বাংলাদেশকে একটি রেইনবো নেশন হিসেবে গড়ে তুলতে চান। তিনি পুনর্মিলনের কথা বলেছেন। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, আইনসভা, ক্যাবিনেটের ক্ষমতার ভারসাম্যের কথা বলেছেন। বিগত পনেরো বছরে রাজনৈতিক সংকট ছিল, জনগণ ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে পারেনি। এই সংকট সমাধান ছাড়া এই রাষ্ট্র মেরামত অসম্ভব। তারেক রহমান এই অবস্থা থেকে উত্তরণে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। একাধারে দুইবারের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না এমন প্রস্তাব দিয়েছেন। বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে ন্যস্ত করার পক্ষে মত দিয়েছেন। সবার জন্য স্বাস্থ্য, সর্বজনীন চিকিৎসা, দেশে সার্টিফিকেট বেইজড এডুকেশন থেকে নিড বেইজড এডুকেশনের স্বপ্ন তাঁর। সংবিধানের সত্তর অনুচ্ছেদ সংশোধন, দুর্নীতি দমনে নিরপেক্ষ ন্যায়পাল নিয়োগ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকারের অঙ্গীকার তারেক রহমানের রাজনীতির মূল বক্তব্য।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন সব দেশপ্রেমিকের। এই স্বপ্ন যেন রাষ্ট্র মেরামতে প্রতিফলিত হয় সেই গণমানুষের রাজনীতি নিয়েই ভাবছেন। শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়েও সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয় সম্পর্কে জাতির উদ্দেশে প্রস্তাব রেখেছেন। মানুষের প্রতি মানুষের আন্তরিকতা এবং ভালোবাসার বন্ধন গড়ে তোলার ইঙ্গিত দেন। তারেক রহমানের রাষ্ট্র ভাবনায় মানবিক বিষয়ের উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে তাঁর চিন্তা প্রসারিত। শিক্ষিত বেকার যুবকদের জন্য ভাতার কথা ভাবছেন তিনি। আগামীদিনে একটি সাম্যভিত্তিক, মানবিক মর্যাদাপূর্ণ এবং সামাজিক সুবিচারের বাংলাদেশের কথা বলেছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল স্পিরিট এটাই ছিল। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ তারেক রহমানের রাজনীতির মূল দর্শন। সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করাই যার একমাত্র লক্ষ্য। কোটা আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক এবং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মূল সেøাগানই কিন্তু ছিল জাস্টিস বা ন্যায়বিচার। ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, মতবাদ, বিশ্বাস, চিন্তার বৈচিত্র্য, সমতল- হাওর-পাহাড় সব জায়গায়, সবখানে তিনি সাম্য এবং মানবিক রাজনীতির কথা বলছেন, যেখানে সবার পরিচয় হবে একটাইÑ আমরা বাংলাদেশি। তারেক রহমানের রাষ্ট্র চিন্তায় আছে মাটি, মানুষ আর বাংলাদেশের মানচিত্র, আছে এক মানবিক বাংলাদেশ গড়ার আকাক্সক্ষা, যেখানে মানুষকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হবে, কোনো বৈষম্য থাকবে না। পনেরোটি বছর ধরে বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ যে রাষ্ট্র গঠনের জন্য জেল, জুলুম, নিপীড়ন, নির্যাতন, খুন, গুম সহ্য করেছে সেই বাংলাদেশ গড়ার চিন্তাই তারেক রহমানের রাষ্ট্র চিন্তা। বাংলাদেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বপ্নকে ধারণ করে আগামীদিনে নতুন প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়াই তাঁর রাজনীতির মূল লক্ষ্য।
তারেক রহমানের আচরণ, কাজ আর মনের গভীরের ভালোবাসা প্রতিনিয়ত প্রমাণ করছে রাজনীতি মানে শুধু ক্ষমতা নয়, রাজনীতি হলো মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থাকা। সেই পথ ধরেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলÑ বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাচনি জনসভায় দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগে বিভিন্ন বিষয়ে জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের কথা বলেছেন। এবার বিএনপির নির্বাচনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। এটিকে সামনে রেখেই বিএনপির চেয়ারম্যান জনগণের কাছে তাঁর ভবিষ্যত দেশ গঠনের নানা পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন, যা মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। তিনি আগামী ১২ তারিখ নির্বাচনের পর ১৩ তারিখ থেকে দেশ গঠনের যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশা ব্যক্ত করেছেন। সেই যুদ্ধে সবাইকে বিএনপির পাশে থাকার আহ্বানও জানিয়েছেন এবং ভোটদানে সঠিক ব্যক্তি নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের সতর্ক থাকারও পরামর্শ দেন। ‘একটি মহল ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে, কীভাবে নির্বাচনকে বানচাল করা যায়, নির্বাচনকে বিতর্কিত করা যায়।’ ‘পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় নজর রাখতে হবে, যাতে এসব “গুপ্তরা” মানুষকে বিভ্রান্ত করতে না পারে।’ তিনি আরও বলেন ‘এই দেশকে আমাদেরই পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে এই দেশের সন্তানরা ভবিষ্যতে সঠিক শিক্ষা পায়।’ ‘দেশের যুবকরা যাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়, মা-বোনেরা যাতে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে সে জন্য ফ্যামিলি কার্ডের ব্যবস্থা করবেন।’
গত ৬ ফেব্রুয়ারি দলটি ইশতেহারে নয়টি প্রধান কর্মসূচি তুলে ধরেছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফ্যামিলি কার্ড, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রফতানি এবং ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন।
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিগুলোর মধ্যেÑ প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে সুরক্ষা দিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। অর্থ সেবার এই পরিমাণ পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হবে।
১. কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে ভর্তুকি, সহজ ঋণ, কৃষি বিমা এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বাজারজাতকরণ জোরদার করা হবে। মৎস্যচাষি, পশুপালনকারী খামারি ও কৃষি খাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও এই সুবিধা পাবেন।
২. দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে দেশব্যাপী এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, জেলা ও মহানগর পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসা, মা ও শিশুর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা এবং রোগ প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে।
৩.আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তব দক্ষতা ও মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষানীতি প্রণয়ন, প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বাধিক গুরুত্ব, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি সহায়তা এবং ‘মিড-ডে মিল’ চালু করা হবে।
৪. তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্তকরণ এবং মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে।
৫. ক্রীড়াকে পেশা ও জীবিকার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হবে।
৬. পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল খনন ও পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে।
৭. ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি সুদৃঢ় করতে সব ধর্মের উপাসনালয়ের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দের জন্য সম্মানী ও প্রশিক্ষণভিত্তিক কল্যাণ ব্যবস্থা চালু করা হবে।
৮. ডিজিটাল অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সংযোগ বাড়াতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম (পেপাল) চালু, ই-কমার্সের আঞ্চলিক হাব স্থাপন এবং ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের রফতানি সম্প্রসারণ করা হবে।
স¦দেশ প্রত্যাবর্তনের জনসভাতেও তারেক রহমান সকলের জন্য নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘তরুণ প্রজন্মকেই আগামীতে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব নিতে হবে। এদেশে পাহাড়ের মানুষ আছে, সমতলের মানুষ আছে, সব ধর্মের মানুষ মিলে একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই।’
দেশের জনগণের ভালোবাসায় তারেক রহমানের দেশ গঠনে জীবনমুখী বাস্তব চিন্তাই কল্যাণ বয়ে আনবে, ফিরে আসবে শান্তি, শৃঙ্খলা। উন্নয়ন, সমৃদ্ধি, সফলতার আধুনিক ও সময়োপযোগি বাংলাদেশ গড়তেই ধানের শীষে ভোট দেয়া উচিৎ।
লেথক: ম. হামিদুল হক মানিক, শিল্পী ও কলাম লেখক।



