ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা ঘিরে আবারও আলোচনায় এসেছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক। ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। সম্প্রতি দিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানান।
তার এই বক্তব্যের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে—তিনি কি সত্যিই দেশে ফিরতে পারবেন? ফিরলে কোন পথে ফিরবেন? আর দেশে ফেরার পর তার বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর কী হবে?
স্বেচ্ছায় ফেরা নাকি প্রত্যর্পণ?
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, বাংলাদেশের সরকার তার পাসপোর্ট বাতিল করেছে। দ্বিতীয়ত, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।
তবে এসব বিষয় তার দেশে ফেরার পথ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় না। মূল প্রশ্ন হলো—তিনি নিজে দেশে ফেরার উদ্যোগ নেবেন কি না এবং বাংলাদেশ সরকার তাকে কীভাবে গ্রহণ করবে।
সাবেক কূটনীতিক ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি এম হুমায়ুন কবীরের মতে, একজন বাংলাদেশি নাগরিক নিজ দেশে ফিরতে চাইলে তার সেই অধিকার রয়েছে। বৈধ পাসপোর্ট না থাকলে তিনি ট্রাভেল পারমিটের জন্য আবেদন করতে পারেন। সরকার সেই আবেদনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
অন্যদিকে, শেখ হাসিনা নিজে দেশে না ফিরলে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় তাকে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তবে চুক্তিতে কিছু ব্যতিক্রম ও আইনি সুযোগ থাকায় প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় নয়।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
দেশে ফিরলে কী হতে পারে?
শেখ হাসিনা যদি কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া দেশে ফেরেন, তাহলে তাকে গ্রেপ্তার বা আদালতের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হতে পারে। কারণ তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ইতোমধ্যে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এলিনা খানের মতে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অর্থাৎ দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলেই তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি ফিরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
তাহলে ফেরার ঘোষণা কেন?
শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটিই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, এর সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও জড়িত।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয়েছে এবং দলটির বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। এমন পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা দলটির রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রশ্নের সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ঘোষণা অনুযায়ী তার দেশে ফিরে এসে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি নয়।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাঈদ ফেরদৌস মনে করেন, শেখ হাসিনার সামনে দেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন।
শুধু শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তেই কি ফেরা সম্ভব?
বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শুধু শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে না। এর সঙ্গে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, জনমত এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক—সবকিছুই জড়িত।
সাবেক কূটনীতিক এম হুমায়ুন কবীরের মতে, শেখ হাসিনা একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তার দেশে ফেরার সিদ্ধান্তের সঙ্গে বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব তৈরি হতে পারে। তাই বিষয়টি একক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা কম।
তার মতে, ভারত যদি শেখ হাসিনার অবস্থানকে বাংলাদেশের সঙ্গে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, সেটি দুই দেশের সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক নাও হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত কী হবে?
শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে সত্যিই বাংলাদেশে ফিরবেন কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। তার হাতে স্বেচ্ছায় ফেরার কিছু আইনি পথ থাকলেও বাস্তবে দেশে ফিরলে তাকে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।
অন্যদিকে, ভারত থেকে প্রত্যর্পণের বিষয়টিও দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল।
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাবর্তনের প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের রাজনীতি, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নতুন সমীকরণ।
ঘোষণা দেওয়ার পর তিনি যদি শেষ পর্যন্ত দেশে না ফেরেন, সেটিও তার রাজনৈতিক অবস্থান ও আওয়ামী লীগের ভবিষ্যতের জন্য নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।



