কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের মিরারচর ও আকবরনগর গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে আবারও ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত দুইজন নিহত হয়েছেন এবং ৭০ থেকে ৮০ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
সোমবার (২৭ জুলাই) সংঘর্ষের এ ঘটনা ঘটে। উল্লেখ্য, এর আগের দিন স্থানীয় সাংসদ ও পাট-বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম দুই গ্রামের বাসিন্দাদের নিয়ে শান্তি বৈঠক করে বিরোধ মিটিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে তার একদিন পরই নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
নিহতরা হলেন, মিরারচর গ্রামের খাইলসা বাড়ির আসাদ মিয়ার ছেলে মাসুদ মিয়া (৩৫) এবং মোল্লা বাড়ির মৃত ফজলু মিয়ার ছেলে হিরণ মিয়া (৩০)। গুরুতর আহত অবস্থায় তাদের ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল (পঙ্গু হাসপাতাল), কিশোরগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছে।
সংঘর্ষ চলাকালে পুরো এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে কয়েকটি বাড়িঘরে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরে ভৈরব ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা অন্তত আটটি বাড়ির আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রথমে ভৈরব উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ এইচ এম আজিমুল হকের নেতৃত্বে প্রশাসন, পুলিশ, র্যাব-১৪ ভৈরব ক্যাম্প এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও শুরুতে সংঘর্ষ থামানো সম্ভব হয়নি।
পরে কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব খানের নেতৃত্বে জেলা পুলিশ লাইন্স থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে এসে যৌথ অভিযান পরিচালনা করলে দুপুর দেড়টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং টহল জোরদার করা হয়েছে।
এদিকে সংঘর্ষের কারণে প্রায় ছয় ঘণ্টা ভৈরব-ময়মনসিংহ সড়ক ও রেল যোগাযোগ বন্ধ ছিল। এতে যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, একটি বাজার ও বাসস্ট্যান্ডের নামকরণকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে মিরারচর ও আকবরনগর গ্রামের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। অতীতেও এই বিরোধকে কেন্দ্র করে একাধিক সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন নিহত হয়েছেন। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে স্বাভাবিক হলেও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় বিরোধ বারবার সহিংস রূপ নিচ্ছে।
তবে স্থানীয় একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেছে, বিরোধের পেছনে শুধু নামকরণের বিষয় নয়, ভৈরব-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দুই পাশে সড়ক ও জনপথ বিভাগের জমিতে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা প্রায় দুই শতাধিক দোকান থেকে অর্থ আদায়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও দ্বন্দ্ব থাকতে পারে। যদিও এ দাবির বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভৈরব উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ এইচ এম আজিমুল হক জানান, এখন পর্যন্ত দুইজন নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। দুপুরের পর থেকে পরিস্থিতি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এলাকায় নিরাপত্তা চৌকি বসানো হয়েছে এবং জেলা পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব খান বলেন, বর্তমানে এলাকায় শান্ত পরিবেশ বিরাজ করছে। নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিহতদের মরদেহ ভৈরব থানা হেফাজতে রাখা হয়েছে। প্রাথমিক সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
এদিকে বিকেলে মিরারচর ও আকবরনগর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, নতুন করে সংঘর্ষের আশঙ্কায় অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় মালামাল নিয়ে নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছেন। স্থানীয়দের মধ্যে এখনও আতঙ্ক বিরাজ করছে।



