tanaka
প্রচ্ছদসারাদেশমৃত্যুর ছয় দিনেও দাফন হয়নি শুভর, ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে মা-বাবার বিরোধ

মৃত্যুর ছয় দিনেও দাফন হয়নি শুভর, ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে মা-বাবার বিরোধ

নারায়ণগঞ্জে গুলিতে নিহত শুভ চন্দ্র দাস ওরফে মো. বিল্লালের মরদেহ ছয় দিন ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে রয়েছে। মৃত্যুর পর তার শেষকৃত্য কোন ধর্মীয় রীতিতে হবে, তা নিয়ে মা ও বাবার মধ্যে বিরোধ তৈরি হওয়ায় দাফন কিংবা দাহ—কোনোটিই করা সম্ভব হয়নি।

পরিবারের একাংশ শুভকে ইসলামি রীতিতে দাফনের দাবি জানালেও তার বাবা হিন্দু ধর্মীয় রীতিতে ছেলের শেষকৃত্য করতে চান। এ নিয়ে জটিলতা তৈরি হলে বিষয়টি গড়ায় আদালতে। পরে বৃহস্পতিবার হাইকোর্ট ইসলামি রীতি অনুযায়ী শুভর মরদেহ দাফনের নির্দেশ দেন।

নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অপারেশন) তারেক আল মেহেদী জানান, মরদেহ দাফন নিয়ে শুভর মা ও বাবার মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ানোর পর মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের হিমঘরে রাখা হয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এর আগে গত ৫ সেপ্টেম্বর রাত সোয়া ১টার দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া হকার্স মার্কেটের পেছনের সড়কে শুভকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, শুভর মা পার্বতী রানী দাস ও বাবা হরি চন্দ্র দাসের সংসারে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। ২০০৩ সালে পার্বতী রানী তার দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। এরপর তার নাম রাখা হয় আয়েশা বেগম। একই সঙ্গে দুই ছেলের নামও পরিবর্তন করা হয়। শুভ চন্দ্র দাসের নাম হয় মো. বিল্লাল এবং তার ছোট ভাই সুজনের নাম রাখা হয় ইব্রাহিম। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রে শুভর নাম পরিবর্তন করা হয়নি।

শুভর ভাই ইব্রাহিমের দাবি, ধর্মান্তরের পর থেকে তারা মুসলিম পরিচয়েই জীবনযাপন করে আসছেন। শৈশবে শুভ মাদ্রাসায়ও পড়াশোনা করেছেন। তার ভাষ্য, এতদিন মুসলিম হিসেবে জীবন কাটানোর পর মৃত্যুর পর বাবার পক্ষ থেকে তাকে হিন্দু ধর্মীয় রীতিতে শেষকৃত্য করার দাবি তোলা হয়েছে।

পরিবারের দাবি, শুভ নিজেও মুসলিম পরিচয়েই বড় হয়েছেন। প্রায় আট বছর আগে, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে জ্যোতি আক্তার নামে এক মুসলিম তরুণীকে কাবিননামার মাধ্যমে বিয়ে করেন তিনি। তাদের দুই বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে, নাম সুমাইয়া আক্তার। স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে শুভ নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার ভূঁইগড় এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন।

শুভর স্ত্রী জ্যোতি আক্তার বলেন, জীবিত অবস্থায় তার স্বামী মৃত্যুর পর মুসলিম রীতিতে দাফন করার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু মৃত্যুর পর তার শ্বশুর পুলিশ পাঠিয়ে মাসদাইর কবরস্থান থেকে মরদেহ নিয়ে যান। তার অভিযোগ, মৃত্যুর পরও স্বামীর মরদেহ নিয়ে বিরোধ তৈরি হওয়ায় তিনি শান্তিতে নেই।

অন্যদিকে শুভর বাবা হরি চন্দ্র দাসের বক্তব্য, তার ছেলে হিন্দু পরিবারে জন্মেছেন। তাই তিনি হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুসারেই ছেলের শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে চান।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপপরিদর্শক মফিজুল ইসলাম জানান, শুভর মায়ের আবেদনের পর মরদেহ দাফনের জন্য কবরস্থানে নেওয়া হয়েছিল। পরে তার বাবা একজন আইনজীবীর মাধ্যমে হিন্দু ধর্মীয় রীতিতে শেষকৃত্যের জন্য মরদেহ চেয়ে আবেদন করেন। আদালতের নির্দেশে হস্তান্তরের আগপর্যন্ত মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর শুভর মা ও ভাই উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন।

বৃহস্পতিবার বিচারপতি ইকবাল কবির ও বিচারপতি সাইফুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ শুভকে ইসলামি রীতিতে দাফনের নির্দেশ দেন।

রিটকারী আইনজীবী মো. জুয়েল আজাদ জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে আদালতের আদেশ হওয়ায় সেদিন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে আদেশের কপি পাঠানো সম্ভব হয়নি। রোববার আদালতের কার্যক্রম শুরুর পর আদেশের কপি সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছানো যাবে বলে আশা করছেন তিনি।