বর্ষা মৌসুম ও আবহাওয়া পরিবর্তনের সময়ে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে দেখা যায়। এডিস মশার কামড়ে ছড়ানো ভাইরাসজনিত এই রোগ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কয়েক দিনের মধ্যে সেরে উঠলেও কিছু রোগীর ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই সময়মতো লক্ষণ শনাক্ত, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা জরুরি।
ডেঙ্গু কী এবং কীভাবে ছড়ায়?
ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ, যা প্রধানত সংক্রমিত এডিস মশার কামড়ে ছড়ায়। এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলায় বেশি সক্রিয় থাকে এবং বাসাবাড়ি, অফিস ও আশপাশের জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে বংশবিস্তার করে। ফুলের টব, ড্রাম, পরিত্যক্ত টায়ার, বিভিন্ন পাত্র ও ছাদে জমে থাকা পানি এ মশার প্রজননস্থল হতে পারে।
ডেঙ্গুর প্রধান লক্ষণ
ডেঙ্গুর উপসর্গ সাধারণত মশার কামড়ের কয়েক দিন পর দেখা দেয়। প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- হঠাৎ উচ্চমাত্রার জ্বর
- তীব্র মাথাব্যথা
- চোখের পেছনে ব্যথা
- পেশি, হাড় ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা
- বমি বমি ভাব বা বমি
- শরীরে র্যাশ বা লালচে দাগ
- দুর্বলতা ও শরীর খারাপ লাগা
তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে একই ধরনের উপসর্গ দেখা যায় না। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার সময়ও রোগীর শারীরিক অবস্থা খারাপ হতে পারে।
কখন দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে?
ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর মধ্যে কিছু সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে বা চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে। যেমন—
- তীব্র পেটব্যথা বা পেটে চাপ দিলে ব্যথা
- বারবার বমি
- নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত
- বমি বা পায়খানার সঙ্গে রক্ত
- অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্থিরতা বা ঘুমঘুম ভাব
- শ্বাসকষ্ট
- শরীর ঠান্ডা হয়ে আসা
- প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া
বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পর এসব লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা করা উচিত নয়।
ডেঙ্গু শনাক্ত করতে কী পরীক্ষা করা হয়?
ডেঙ্গু সন্দেহ হলে চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ ও রোগের সময়কাল বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা দিতে পারেন। সাধারণত—
১. NS1 অ্যান্টিজেন পরীক্ষা:
জ্বরের প্রথম কয়েক দিনে ডেঙ্গু শনাক্ত করতে এই পরীক্ষা ব্যবহার করা হয়।
২. CBC বা Complete Blood Count:
রক্তের বিভিন্ন উপাদান, বিশেষ করে প্লেটলেট ও শ্বেত রক্তকণিকার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণে CBC করা হতে পারে। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসক একাধিকবার পরীক্ষা করতে পারেন।
৩. IgM/IgG অ্যান্টিবডি পরীক্ষা:
রোগের পরবর্তী পর্যায়ে অ্যান্টিবডি পরীক্ষা ডেঙ্গু সংক্রমণের বিষয়ে তথ্য দিতে পারে। কোন পরীক্ষা কখন করা হবে, তা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।
শুধু প্লেটলেটের সংখ্যা দেখে রোগীর অবস্থা নির্ধারণ করা ঠিক নয়। রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য পরীক্ষার ফলও গুরুত্বপূর্ণ।
ডেঙ্গু হলে চিকিৎসা কী?
ডেঙ্গুর জন্য সাধারণভাবে নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, তরল গ্রহণ এবং উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসার মাধ্যমে রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন।
পর্যাপ্ত বিশ্রাম:
শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে।
পর্যাপ্ত তরল পান:
পানি, ওরস্যালাইন, স্যুপসহ উপযুক্ত তরল গ্রহণ করতে হবে। বমি বা অন্য কারণে পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ সম্ভব না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
জ্বর ও ব্যথায় ওষুধ:
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে। অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন বা অন্যান্য NSAID জাতীয় ওষুধ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গ্রহণ করা উচিত নয়, কারণ এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয়
ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা এবং মশার কামড় থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা।
১. বাড়ি ও কর্মস্থলের আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করুন।
২. ফুলের টব, পানির পাত্র, ড্রাম, টায়ারসহ যেসব স্থানে পানি জমতে পারে সেগুলো পরিষ্কার রাখুন।
৩. দিনের বেলাতেও মশার কামড় থেকে বাঁচতে শরীর ঢাকা পোশাক পরুন।
৪. প্রয়োজন অনুযায়ী মশানিরোধক ব্যবহার করুন।
৫. ঘরের দরজা-জানালায় নেট বা জালি ব্যবহার করুন এবং ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করুন।
৬. আশপাশের সবাইকে নিয়ে নিয়মিতভাবে মশার প্রজননস্থল পরিষ্কার করুন।
সচেতন থাকুন
ডেঙ্গু হলে আতঙ্কিত না হয়ে রোগীর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পর রোগীর অবস্থা খারাপ হচ্ছে কি না, তা সতর্কতার সঙ্গে লক্ষ্য করতে হবে। গুরুতর কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে।



