tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকওমান হয়ে এশিয়ায় বাড়তি তেল পাঠানোর প্রস্তাব সৌদির

ওমান হয়ে এশিয়ায় বাড়তি তেল পাঠানোর প্রস্তাব সৌদির

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে এশিয়ার দেশগুলোতে ওমানের মাধ্যমে বাড়তি অপরিশোধিত তেল সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে সৌদি আরব। এ খবর প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমেছে। এতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বৈশ্বিক বাজারে তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্নের আশঙ্কাও কিছুটা কমেছে।

একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুত বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসের তুলনায় কম হারে কমায় বাজারে তেলের দামের ওপর নিম্নমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।

বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ ডলার ৯২ সেন্ট বা ২ দশমিক ৭ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলার ৮৩ সেন্টে নেমে আসে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ক্রুডের দাম কমে ৩ ডলার ৪০ সেন্ট বা ৩ দশমিক ২ শতাংশ। দিন শেষে প্রতি ব্যারেলের দাম দাঁড়ায় ১০২ ডলার ৪৩ সেন্টে।

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, সৌদি আরব ওমানের সোহার বন্দরের কাছে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের মাধ্যমে এশিয়ার বিভিন্ন শোধনাগারে বাড়তি অপরিশোধিত তেল পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এর ফলে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলার কারণে বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব কিছুটা প্রশমিত হতে পারে।

ইউবিএসের বিশ্লেষক জিওভান্নি স্তাউনোভো বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখার খবর পাওয়ায় বাজারে বড় ধরনের সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কা কমেছে।

এর আগে মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ৩ ডলারের বেশি বেড়েছিল। সৌদি আরবের লোহিত সাগরীয় বন্দর ইয়ানবু থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ইউরোপের কয়েকজন ক্রেতার কাছে তেল পাঠানোর সিদ্ধান্ত বাতিলের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দাম বাড়ে। সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চল থেকে ইয়ানবু বন্দরে তেল পরিবহনের প্রধান মাধ্যম ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলার পর এ পরিস্থিতি তৈরি হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় ইয়ানবু সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি পথ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।

বুধবার প্রকাশিত প্রাথমিক নৌ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র চারটি জাহাজ চলাচল করেছে। এর আগের দিন এ সংখ্যা ছিল সাতটি। অথচ গত ১০ দিনে প্রণালিটি দিয়ে গড়ে ১৮টি জাহাজ চলাচল করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে তেলের মজুত কমেছে প্রত্যাশার চেয়ে কম

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসন (ইআইএ) বুধবার জানিয়েছে, গত সপ্তাহে দেশটির অপরিশোধিত তেলের মজুত প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল কমেছে। তবে রয়টার্সের জরিপে বিশ্লেষকেরা মজুত ১৬ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল কমার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। অর্থাৎ প্রকৃত মজুত কমার পরিমাণ প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম হয়েছে।

এদিকে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রল ও ডিজেলের মজুত বেড়েছে। ডিজেলের মজুত বৃদ্ধির পরিমাণও ছিল বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি। পেট্রলের মজুত কমবে বলে ধারণা করা হলেও বাস্তবে তা বেড়েছে।

এগেইন ক্যাপিটালের অংশীদার জন কিলডাফ বলেন, পরিশোধিত জ্বালানির মজুত স্থিতিশীল রয়েছে এবং কিছুটা বাড়ছেও। একই সময়ে অপরিশোধিত তেলের মজুত কমার গতি থেমে আসছে। বাজারের জন্য এটি নেতিবাচক সংকেত।

তবে কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সহিংসতা অব্যাহত থাকায় তেলের বাজারে অস্থিরতা এখনো রয়েছে। রিটারবুশ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের এক নোটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বাজারতথ্য তেলের দীর্ঘমেয়াদি ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতাকে বদলে দেয়নি। বড় ধরনের দরপতন হলে বাজারে তেল কেনার প্রবণতা বাড়তে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা, বাড়ছে ডিজেলের উদ্বেগ

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনাও অব্যাহত রয়েছে। সৌদি যুদ্ধবিমান ইয়েমেনে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইরান-সমর্থিত হুথি যোদ্ধারা সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। হুথিরা জানিয়েছে, তারা ইয়ানবু বন্দরে নতুন করে হামলা চালিয়েছে।

সিটি ব্যাংকের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা সামনের দিনগুলোতে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির দাম বাড়িয়ে রাখতে পারে। ব্যাংকটির ধারণা, আঞ্চলিক কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে ২০২৬ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হতে পারে।

এদিকে সাম্প্রতিক উত্তেজনায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ডিজেল সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্য ডিজেল এবং ডিজেল উৎপাদনে ব্যবহৃত অপরিশোধিত তেলের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী। একই সময়ে ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি তেল শোধনাগারের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। এতে বাজারে ডিজেলের সরবরাহ আরও কমেছে এবং দাম রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছে।

মঙ্গলবার ইউরোপে গ্যাসঅয়েল বা ডিজেলের দাম নির্ধারণকারী চুক্তির মূল্য রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রে অতি কম সালফারযুক্ত ডিজেলের দামও রেকর্ড উচ্চতায় ওঠে।

নাগা ডটকমের বাজার বিশ্লেষক ফ্রাংক ওয়ালবম বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপে ডিজেল ও জেট জ্বালানির সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সময়ে পূর্ব ইউরোপের উত্তেজনায় রাশিয়ার কয়েকটি বড় শোধনাগারের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। মস্কোও জ্বালানি রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

রুশ সংবাদপত্র ভেদোমস্তি মঙ্গলবার রাতে অজ্ঞাত দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, রাশিয়ার জ্বালানি উৎপাদনকারীদের জন্য ডিজেল রপ্তানিতে বিদ্যমান বিধিনিষেধ অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ইউবিএসের বিশ্লেষক জিওভান্নি স্তাউনোভোর মতে, রাশিয়ায় শান্তিচুক্তি না হলে বা পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটলে ডিজেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী অবস্থায় থাকতে পারে।

সূত্র: রয়টার্স, শাফাক নিউজ