দুপুরের খাবারের বিরতির পর নারায়ণগঞ্জের আদমজী ইপিজেডের অনন্ত গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সেল ম্যানসওয়্যারে স্বাভাবিকভাবেই কাজ চলছিল। হঠাৎ তৃতীয় তলার এক নারী শ্রমিক ‘ভূত’ বলে চিৎকার করে অচেতন হয়ে পড়েন। মুহূর্তেই কারখানাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। একে একে দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার আরও অর্ধশতাধিক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেদিন কারখানা ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
পরদিন সকালেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে সেদিনও কারখানা বন্ধ রাখতে হয়।
গত ২২ আগস্টের এই ঘটনা পোশাকশিল্পে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। গত এক দশকে দেশের বিভিন্ন তৈরি পোশাক কারখানায় ‘ভূত’ বা ‘জিন’ আতঙ্ক ছড়িয়ে শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার অন্তত ১১টি ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়। এর আগে ২০০৮ সালেও একাধিক কারখানায় একই ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল।
ভূতের গুজব, অসুস্থ হয়ে পড়েন শ্রমিকেরা
শিল্পসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোনো কারখানায় বাথরুমে ভূত দেখার গুজব ছড়িয়েছে, কোথাও আবার ‘জিনে ধরেছে’ বলে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। অনেক ঘটনায় প্রথমে একজন শ্রমিক অসুস্থ বা অচেতন হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে আরও কয়েকজন একই ধরনের উপসর্গে আক্রান্ত হন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, গত এক দশকে এ ধরনের যেসব ঘটনা ঘটেছে, তার বেশির ভাগই তুলনামূলক বড় কারখানায়। এসব প্রতিষ্ঠানে বিদেশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা নিয়মিত কর্মপরিবেশ ও বিভিন্ন বিষয় তদারক করেন।
সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি নাজমা আক্তারের মতে, নারী পোশাকশ্রমিকদের একটি অংশ শারীরিক ও মানসিক নানা সমস্যায় ভোগেন। কম আয়ের কারণে পুষ্টিকর খাবারের ঘাটতি, পারিবারিক সংকট, মানসিক চাপ এবং অসুস্থ অবস্থায় কাজ করার মতো বিষয়ও তাঁদের অসুস্থতার কারণ হতে পারে। তাঁর ভাষ্য, এ ধরনের পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ আতঙ্ক ছড়াতে পারেন।
এক দশকে যেসব ঘটনা
২০১৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সাভারের রাজফুলবাড়িয়া এলাকায় একেএইচ ডায়িং অ্যান্ড নিটিং কারখানার সম্প্রসারিত ভবনটি শ্মশানের জায়গায় নির্মিত হয়েছে—এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এতে অর্ধশত নারী শ্রমিক মাথাব্যথা, বুকব্যথা ও বমি ভাব নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁদের হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে সেদিন কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।
২০১৬ সালের আগস্টে আশুলিয়ার নরসিংহপুরের ডেকো ডিজাইন কারখানায় কয়েকজন শ্রমিক দুপুরের খাবারের পর বাথরুমে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে ছয়তলা কারখানা ভবনের বিভিন্ন তলায় ‘ভূত’ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এতে আরও শ্রমিক অসুস্থ হন। ৪৯ জন শ্রমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। পরদিনও কয়েকজন শ্রমিক একই ধরনের আতঙ্কে অসুস্থ হন।
ওই বছরের ২৪ ডিসেম্বর গাজীপুরের ইউটাহ নিটিং অ্যান্ড ডায়িং কারখানায় একজন শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার পর তাঁকে ‘জিনে ধরেছে’ বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। পরে আরও কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁদের পেটে ব্যথা, বমি ও মুখ দিয়ে লালা ঝরার মতো উপসর্গ দেখা যায়। ২৫ জন শ্রমিককে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়।
গত বছরের ১৩ মার্চ গাজীপুরের এসপি গার্মেন্টস অ্যান্ড ওয়াশিং কারখানার বাথরুমে ‘ভূত’ রয়েছে—এমন আতঙ্ক ছড়িয়ে ১০ থেকে ১৫ জন শ্রমিক অসুস্থ হন। পরিস্থিতির কারণে সকাল ১১টার দিকে কারখানা ছুটি দেওয়া হয়। চার দিন পর আবার ‘জিন আতঙ্কে’ ১৩ জন শ্রমিক অসুস্থ হন। তাঁদের স্থানীয় চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা দিয়ে বাড়ি পাঠানো হয়।
গত বছরের ১৯ মার্চ গাজীপুরের গোল্ডেন রিফিট গার্মেন্টসেও ‘জিন আতঙ্কে’ প্রায় ৫০ শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার ঘটনা ঘটে।
চলতি বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরের নর্থ হেয়ার প্রোডাক্ট কারখানায় ‘ভূত’ আতঙ্কে নয়জন শ্রমিক অসুস্থ হন। তাঁদের দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
টঙ্গীর গাজীপুরা এলাকার হপলুন অ্যাপারেলস কারখানায় গত জুলাইয়ে একই ধরনের আতঙ্কে প্রায় ৬০ শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কর্তৃপক্ষ মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করে। এ ঘটনায় দুই দিন কারখানা বন্ধ ছিল।
এর আগে গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে নিউএইজ গ্রুপের একটি কারখানার বাথরুমে দুই নারী শ্রমিক অজ্ঞান হয়ে পড়ার পর ‘জিন আতঙ্ক’ ছড়িয়ে পড়ে। পরে আরও কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হন। কয়েক দিন ধরে পরিস্থিতি চলতে থাকে। একপর্যায়ে কর্তৃপক্ষ মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করে এবং পরে তান্ত্রিক এনে ঝাড়ফুঁকও করানো হয়।
সব মিলিয়ে ওই কারখানার ১৭২ জন শ্রমিক দুর্বলতা, চোখে ঝাপসা দেখা ও মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। তাঁদের কয়েক দিন ছুটিতে রাখা হয় এবং কারখানাও দুই দিন বন্ধ ছিল।
নিউএইজ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহিম জানান, ওই ঘটনায় তাঁদের কারখানার উৎপাদন মোট ৬ থেকে ৭ দিন ব্যাহত হয়েছিল।
‘ভূত’ কি শুধু বাথরুমেই?
‘ভূত’ বা ‘জিন’ আতঙ্কে শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার অনেক ঘটনার সূচনা বাথরুম থেকে। প্রথমে একজন শ্রমিক অসুস্থ বা অচেতন হন। এরপর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ভূত বা জিনে ধরার গুজব। পর্যায়ক্রমে আরও কয়েকজন শ্রমিক একই ধরনের উপসর্গে আক্রান্ত হন। তবে চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার পর প্রাথমিক চিকিৎসাতেই অনেকেই সুস্থ হয়ে ওঠেন।
নিউএইজ গ্রুপের কারখানার ঘটনায় প্রথম অসুস্থ হওয়া দুই নারী শ্রমিকের একজনকে হাসপাতালে পরীক্ষা করে রক্তে উচ্চমাত্রার সুগার পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ কারণেই তিনি অচেতন হয়ে পড়েছিলেন। অপর শ্রমিকও আগে থেকেই অসুস্থ ছিলেন।
অন্যদিকে ইউনিভার্সেল ম্যানসওয়্যারের ঘটনায় বাথরুম থেকে আতঙ্কের সূত্রপাত হয়নি। কারখানার মহাব্যবস্থাপক বিল্লাল হোসেন জানান, অসুস্থ ৮ থেকে ৯ জন শ্রমিককে বেপজা হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁরা প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যেই সুস্থ হয়ে ওঠেন।
ভূতের আড়ালে কী?
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের বিকাশ আশির দশকের শুরু থেকে। শিল্পটির দ্রুত সম্প্রসারণের সময় থেকেই কারখানায় ‘ভূত’ আতঙ্কের মতো ঘটনাও ঘটছে বলে জানান বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার।
তাঁর মতে, শ্রমিকদের হতাশা, পুষ্টির ঘাটতি, শারীরিক দুর্বলতা, মানসিক চাপ এবং কুসংস্কার বা গুজবে বিশ্বাস করার প্রবণতা—এসব বিষয় এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। কারও অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে কোনো স্বার্থান্বেষী পক্ষ আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
বাবুল আখতার শ্রমিকদের কাউন্সেলিং, পর্যাপ্ত বিশ্রামের জন্য রেস্টরুম এবং স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে শ্রমিকদের মানসম্মত জীবনযাপনের উপযোগী মজুরি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।
বর্তমানে পোশাকশিল্পে ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর হওয়ার আগে এই হার ছিল ৮ হাজার টাকা। কম আয়ের কারণে বাড়তি উপার্জনের জন্য অনেক শ্রমিক ওভারটাইম করেন। অতিরিক্ত কাজের চাপও শারীরিক ও মানসিক সমস্যার কারণ হতে পারে।
তবে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের বক্তব্য, হেলপাররা ওভারটাইমসহ মাসে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা এবং অপারেটররা ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা আয় করেন। তাঁর মতে, ‘ভূত’ বা ‘জিন’ আতঙ্কের পেছনে বাস্তব কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি; বিষয়টি মূলত শ্রমিকদের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
পানির সমস্যা, নাকি আতঙ্কের প্রভাব?
গত ১৮ জুন গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা এলাকার ড্রেসম্যান লিমিটেড কারখানায় শতাধিক শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। কাজে যোগ দেওয়ার পর কারখানার সরবরাহ করা পানি পান করার কিছুক্ষণ পর কয়েকজনের বমি, পেটব্যথা, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা ও শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। পরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে অসুস্থ শ্রমিকের সংখ্যাও বাড়তে থাকে।
কারখানা কর্তৃপক্ষ অসুস্থদের কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে পাঠায়।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মাশেদ রুম্মান আবদুল্লাহ জানান, কারখানার পানি প্রতিষ্ঠানটির পাশাপাশি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানও পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করিয়েছে। পরীক্ষায় পানিতে কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি। তাঁর ভাষ্য, একজন শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার পর অন্যদের মধ্যেও দ্রুত একই ধরনের উপসর্গ ছড়িয়ে পড়ে।
তাঁর মতে, অতীতে অনেক কারখানায় বাথরুম থেকে ‘ভূত’ আতঙ্ক ছড়ানোর ঘটনা ঘটেছে। এ কারণে তাঁদের কারখানার বাথরুমে প্রবেশের আগে দেয়ালে আরবি ও বাংলায় দোয়া লিখে রাখা হয়েছে।
আতঙ্ক ছড়ানোর অভিযোগ
পোশাকশিল্পের কয়েকজন মালিকের ধারণা, কারখানায় ‘ভূত’ বা ‘জিন’ আতঙ্ক তৈরির পেছনে একটি চক্র কাজ করতে পারে। তাঁদের অভিযোগ, কেউ কেউ পরিকল্পিতভাবে আতঙ্ক সৃষ্টি করে কারখানায় বিশৃঙ্খলা তৈরি এবং উৎপাদন ব্যাহত করার চেষ্টা করতে পারেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, এসব ঘটনার পেছনে কারও ভূমিকা থাকতে পারে বলে তাঁরা মনে করেন, কিন্তু কারা জড়িত তা শনাক্ত করা যায়নি। এ ধরনের ঘটনায় কারখানাগুলো আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, বিষয়টি মোকাবিলায় শ্রমিকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের সাইকিয়াট্রি বিভাগের অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদের মতে, মাথা ঘোরা, বমি ভাব ও পেটব্যথার মতো উপসর্গ কখনো কখনো কনভারশন ডিজঅর্ডারের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। একই ধরনের উপসর্গ যখন একজনের পর অন্যজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেটিকে মাস সাইকোজেনিক ইলনেস বা গণমনস্তাত্ত্বিক অসুস্থতা বলা হয়। স্কুল, হোস্টেল কিংবা কারখানার মতো জায়গায় এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে।
তিনি বলেন, মানুষ ইচ্ছা করে এসব উপসর্গ তৈরি করেন না। মানসিক চাপ, পারিবারিক ও সামাজিক দ্বন্দ্বসহ বিভিন্ন কারণে এ ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া এবং কারখানায় মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
অর্থাৎ, পোশাক কারখানায় ‘ভূত’ বা ‘জিন’ আতঙ্কের ঘটনাগুলোকে শুধু কুসংস্কার বা গুজব হিসেবে দেখার পাশাপাশি শ্রমিকদের শারীরিক অসুস্থতা, কর্মপরিবেশ, মানসিক চাপ এবং গণমনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়ার বিষয়গুলোও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।



