ডিপমাইন্ড (Deep-mind) হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার একটি অত্যন্ত উন্নত ধরন বা অ্যাপ্লিকেশন, যা রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিংয়ের (reinforcement learning) মাধ্যমে শেখে ও উন্নত হয়। এটি আরও অভিযোজনযোগ্য এআই বা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার সিস্টেম তৈরিতে তাদের অগ্রগতির সাম্প্রতিক উন্নয়নগুলো অন্বেষণ করে।
ডিপমাইন্ড প্রতিষ্ঠা করেন ডেমিস হাসাবিস, শেন লেগ এবং মুস্তফা সুলেমান। তাদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা সিস্টেম বা প্লাটফর্ম তৈরি করা, যা মানুষের মতো শেখার ক্ষমতা অর্জন করতে পারে। শেখার সাথে সাথে যেকোনো সম্পূরক বা অসম্পূর্ক সমস্যার সমাধানের ক্ষমতা অনুকরণ করতে পারে। গুগলের একটি সহায়ক প্রতিষ্ঠান গুগল ডিপমাইন্ড হলো একটি ব্রিটিশ-আমেরিকান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণাগার। ২০১০ সালে এটি যুক্তরাজ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০১৪ সালে গুগল এটিকে অধিগ্রহণ করে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে এটি গুগলের এআই বিভাগ Google Brain-এর সাথে একীভূত হয়ে Google Deep-mind হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
ডিপমাইন্ড নিউরাল নেটওয়ার্ক নামের এক ধরণের মেশিন লার্নিং মেথডকে ব্যবহার করে থাকে। এটি এক ধরনের কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা, যা মানুষের মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াকরণের পদ্ধতিকে অনুকরণ ও ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে । ডিপমাইন্ড এর মধ্যে এই নিউরাল নেটওয়ার্কগুলো বিভিন্ন স্তরে সাজানো থাকে এবং প্রচুর ডেটা থেকে শিখতে সক্ষম হয়, যার ফলে সময়ের সাথে সাথে এর কার্যকারিতা উন্নত এবং গ্রহণযোগ্য করা হয়ে থাকে। গুগলের এআই বিভাগ মনে করে যে, ডিপমাইন্ড প্লাটফর্মের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানবজাতির সবচেয়ে দরকারী আবিষ্কারগুলোর মধ্যে অন্যতম হতে যাচ্ছে। তারা নিরাপদ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা এবং বিভিন্ন এপ্লিকেশন তৈরির উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ডিপমাইন্ড প্রজেক্টে কাজ করছে। তাদের বিশালতা এবং ব্যাপ্তি ক্রমাগত অনুসন্ধান এবং গবেষণার মাধ্যমে আরো বড়ো তথ্যভান্ডার সমৃদ্ধ পৃথিবীকে ধারণ করছে। তারা তথ্য বিজ্ঞানের অগ্রগতির এই জগতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সমাধান আবিষ্কারকল্পে তাদের প্রতিশ্রুতি বারবার প্রমান করে চলছে।
২০১৪ সালে গুগলের অধিগ্রহণের পর, Google Deep-mind একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতিশাস্ত্র বোর্ড (artificial intelligence ethics board) গঠন করেছিল। এই বোর্ডটি এআই গবেষণার জন্য নীতিশাস্ত্রটি ব্যবহার করতে চাইলে, গুগল এবং ডিপমাইন্ড উভয়ই বোর্ডের সদস্য কারা তা প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তখন Google Deep-mind একটি নতুন ইউনিট খুলেছে যার নাম দেয়া হয়, Deep-mind Ethics and Society। এই ইউনিটটি আমাদের এই অত্যাধুনিক যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা উত্থাপিত নৈতিক এবং সামাজিক প্রশ্নগুলোর উপর মনোযোগ দিতে সক্ষমতা দেখিয়েছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে, মুস্তফা সুলেমান ঘোষণা করেন যে তিনি Google এ একটি নীতিগত ভূমিকায় কাজ করার জন্য ডিপমাইন্ড ছেড়ে চলে যাবেন। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে, Open-AI- চ্যাটজিপিটি (Chat GPT)-এর প্রতিক্রিয়ায় Google Deep-mind আরোও নতুনত্ব নিয়ে আসার জন্য কাজ শুরু করে দেয়। তাদের চলমান প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে Google Deep-mind এআই বিভাগ Google Brain-এর সাথে একীভূত হয়ে Google Deep-mind গঠন করে, যা কিনা অনেক নতুন নতুন ডিপমাইন্ড প্লাটফর্ম তৈরির কাজ করে চলছে। এখানে অনেক বিশ্বমানের প্রতিভাবানরা বর্তমান কম্পিউটিং অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে গবেষণার পরবর্তী যুগান্তকারী অগ্রগতি এবং রূপান্তরমূলক Deep-mind প্লাটফর্ম বা পণ্য তৈরি করে চলছে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি দ্বারা পরিচালিত এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ ও নাগরিকদের সামগ্রিক সুরক্ষার কথা চিন্তা করে এইসব Minded প্লাটফর্মগুলো এমনভাবে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা সেবাগুলো তৈরী করছে যাতে এগুলো সবার উপকারে আসে এবং মানবজাতির সবচেয়ে বড় জানা এবং আবিষ্কারের চ্যালেঞ্জগুলোকে সমাধান সম্ভব।
Deep-mind এর একটি অত্যন্ত পরিচিত অ্যাপ্লিকেশনের নাম হচ্ছে জেমিনি (Gemini)। জেমিনি শুরু থেকেই মাল্টিমোডাল (multi-modal) হিসেবে তৈরি করা হয়েছে, যা টেক্সট, ছবি, অডিও, ভিডিও এবং কোড জুড়ে বিষয়বস্তুকে নিজস্বভাবে বুঝতে এবং তৈরি করতে সক্ষম । Google Deep-mind ইতিমধ্যেই এই মডেলগুলো ব্যবহার করে বিশ্বব্যাপী ব্যবহারকারীদের কাছে, অসংখ্য পণ্য, প্রোটোটাইপ এবং ভাষায় অডিও নিয়ে এসেছে। উল্লেখযোগ্য এজন্য বলছি যে, নোটবুকএলএম (Notebook)-এর অডিও ওভারভিউ (Notebook’s Audio Overviews) এবং প্রজেক্ট অ্যাস্ট্রা (Project Astra) হলো এর দুটি উদাহরণ।
Google Deep-mind এর এই রিয়েল-টাইম অডিও ডায়ালগ এপ্লিকেশন এ মানুষের কথোপকথন এতটাই সমৃদ্ধ এবং সূক্ষ্ম যে, যার অর্থ কেবল কী বলা হয় তা দিয়ে নয়, বরং কীভাবে বলা হয় যেমন স্বর, উচ্চারণ এবং এমনকি হাসি বা নন-স্পিচ ভোক্যালাইজেশন (non-speech vocalizations)- এগুলোও এনালাইসিস করে থাকে। এই এপ্লিকেশন এর মাধ্যমে আমরা বলতে পারি যে, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার-এর সাথে মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হবে কথোপকথন। এই কারণেই জেমিনি নিজস্বভাবে অডিওতে যুক্তি ও বক্তৃতা তৈরি করে, যা কার্যকরীভাবে রিয়েল-টাইম যোগাযোগের একুরেসি বা নির্ভুলতা বাড়িয়ে দেয়।
জেমিনি কথোপকথনের সাথে প্রসঙ্গ সচেতনতা নিয়ে আসতে সক্ষম। এটি যেকোনো সিস্টেমস এর ব্যাকগ্রাউন্ডের কথা বা আশেপাশের কথোপকথন এবং অন্যান্য অপ্রাসঙ্গিক অডিওকে চিহ্নিত করতে এবং উপেক্ষা করতে প্রশিক্ষিত হয়ে থাকে। এবং জেমিনি এপ্লিকেশন এর মাধ্যমে উপযুক্ত সময়ে প্রতিক্রিয়া জানানো এবং এটি কখন কথা বলতে হবে না তাও বুঝতে পারে। জেমিনি স্ট্রিমিং অডিও এবং ভিডিও থেকে নিজস্ব সমর্থন, স্ক্রিন শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে যা দেখছে তা নিয়ে ব্যবহারকারীর সাথে কথোপকথন করতে পারে। জেমিনি ব্যবহারকারীর কথার টোনের প্রতি সাড়া দেয়, এবং এটি বুঝতে পারে যে একই শব্দ ভিন্নভাবে বলা হলে কথোপকথন ভিন্ন হতে পারে। সর্বপরি, জেমিনির যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য তৈরির ক্ষমতা এর কথোপকথনকে উন্নতভাবে প্রকাশ করতে পারে, যা সমস্ত বৈশিষ্ট্যে সামগ্রিকভাবে আরও ভালো পারফরম্যান্স দিতে সক্ষম।
ডেভেলপারদের জন্য তৈরী Google AI Studio তে জেমিনি এপিআই-এর (Gemini API) মাধ্যমে অনেক ইন্টারেক্টিভ ইউসার ইন্টারফেস তৈরী করতে সক্ষম । অনুসন্ধান শুরু করার জন্য, ডেভেলপাররা Google AI Studio-এর স্ট্রিম ট্যাব (stream tab)-এ জেমিনি ফ্ল্যাশ প্রিভিউ-এর সাথে নিজস্ব অডিও ডায়ালগও করতে পারে। এধরনের মডার্ন কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার এপ্লিকেশন বাংলাদেশের তরুণ সমাজকে নতুন নতুন এআই এপ্লিকেশন ডিজাইনের ধারণা দিতে পারে। জেমিনির মাধ্যমে নতুন নতুন এপ্লিকেশন তৈরির ধারণার উদ্ভাবন এবং সাথে সাথে প্রোটোটাইপ তৈরির মাধ্যমে বাজারে নতুন কার্যকরী এআই সফটওয়্যার পণ্য হিসেবে নিয়ে আসা সম্ভব। এখন তরুণ প্রজন্মের জন্য দরকার হচ্ছে প্রয়োজনীয় জ্ঞান এবং নতুন নতুন সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্র আবিষ্কার, শেখার ধৈর্য এবং যথাযথ এপ্লিকেশন ডিজাইনের পরিকল্পনা।
উপসংহারে বলতে পারি যে, আগামী বছরগুলোতে, আমরা দেখতে পাবো যে, কৃত্রিম সাধারণ বুদ্ধিমত্তা বা Artificial General Intelligence (AGI), মনুষ্য সমাজের ইতিহাসে অন্যতম সেরা রূপান্তর ঘটাতে সক্ষম। এই মুহূর্তে সারা বিশ্বে বিজ্ঞানীরা, তথ্য প্রকৌশলীরা, নীতিবিদরা এবং আরও অনেকে মিলে কাজ করে চলছে যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি দায়িত্বশীল কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা তৈরির সিস্টেমস আবিষ্কার করা যায়। আমাদের সবার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে এখানে, বৈজ্ঞানিক এবং প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ সমাধান করার মাধ্যমে একটি যুগোপযুগী প্রযুক্তি তৈরি করা যা তথ্য বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিতে পারে, যেকোনো কাজকে সহজসাধ্য করতে পারে, বিভিন্ন সম্প্রদায়কে যথাযথ পরিষেবা দিতে পারে এবং সর্বোপরি কোটি কোটি মানুষের জীবনের উন্নতি ঘটাতে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে।
লেখক: প্রফেসর ড. শাহ জে মিয়া, প্রফেসর অফ বিজনেস এনালিটিক্স এন্ড অ্যাপ্লাইড এআই
উপপরিচালক, সেন্টার ফর অ্যাপ্লাইড এন্ড রেস্পন্সিবল এআই, নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটি, নিউ সাউথ ওয়েলস, অস্ট্রেলিয়া



