পকেটে ইয়াবার ছোট পুঁটলি, চোখেমুখে আতঙ্ক—মাদকসহ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে দিন কাটাচ্ছেন খুচরা বাহক ও বিক্রেতারা। অথচ তাদের পেছনে থাকা মাদক সাম্রাজ্যের মূল হোতারা রয়ে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। সুদৃশ্য ড্রয়িংরুমে বসেই তারা নিয়ন্ত্রণ করছেন বিস্তৃত মাদক ব্যবসা। ফলে মাদকের ভয়াবহ বিস্তারে সমাজ যখন বিপর্যস্ত, তখন প্রশ্ন উঠছে—মাদক ব্যবসার ‘গডফাদাররা’ কেন আইনের আওতায় আসছেন না?
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অতীতে যেমন মাদক চক্রের মূল হোতারা আড়ালে থেকে গেছেন, বর্তমানেও সেই চিত্র খুব একটা বদলায়নি। ভবিষ্যতেও দ্রুত পরিবর্তনের লক্ষণ নেই। এর সঙ্গে নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যের মাদক বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা। ফলে মাদক নির্মূলের লড়াই আরও জটিল হয়ে উঠছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাও মাদক ব্যবসার ভয়াবহ বিস্তারের চিত্র সামনে এনেছে। সূত্র জানায়, ১ অক্টোবর চোরাচালান নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে আজাহার মেম্বার ও পটল গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এতে দেশীয় অস্ত্র সড়কি পেটে বিদ্ধ হয়ে টেঙ্গুর আলী নামে এক ব্যক্তি ঘটনাস্থলেই নিহত হন।
এর আগে ২৭ সেপ্টেম্বর রাজশাহীর রাজপাড়ায় মাদক ব্যবসায় বাধা দেওয়ায় আব্দুল বারী (২৫) নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এর একদিন পর ২৯ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের টঙ্গীতে মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে এক যুবককে কুপিয়ে ও পায়ের রগ কেটে হত্যা করা হয়।
মাদকের সঙ্গে সহিংসতার যোগসূত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে কুমিল্লার ১৩ বছরের স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে। ১৮ সেপ্টেম্বর বাসা থেকে নিখোঁজ হওয়ার পরদিন লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বহুল আলোচিত এ মামলার তদন্তে হত্যার নেপথ্যে স্থানীয় একটি ক্ষুব্ধ মাদক সিন্ডিকেটের ইন্ধনের বিষয়টি জোরালোভাবে সামনে আসে।
নিহতের পরিবারের দাবি, অপ্রতিমের মা একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও সাবেক প্রক্টর। এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ায় তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিল একটি চক্র। সেই ক্ষোভ থেকেই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়ে থাকতে পারে বলে পরিবারের অভিযোগ।
এ ছাড়া ২১ আগস্ট রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার নেপথ্যেও মাদক সিন্ডিকেটের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে বলে জানা গেছে।
তালিকা আছে, গ্রেপ্তার নেই
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপর্যায়ের একটি সূত্র যুগান্তরকে জানিয়েছে, সারা দেশে মাদকের গডফাদারদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তবে বাস্তবতার কারণে সেই তালিকা প্রকাশ করা যাচ্ছে না।
সূত্রটির ভাষ্য, গডফাদাররা অত্যন্ত চতুর ও প্রভাবশালী। তাদের অনেকের নামে সরাসরি মামলা নেই। তারা নিজেরা মাদক বহন বা সংরক্ষণও করেন না। ফলে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া তাদের গ্রেপ্তার করা কঠিন।
সূত্রটি আরও জানায়, গডফাদারদের বিষয়ে গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে। সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে নেপথ্যে থাকা এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা কঠিন হওয়ায় তারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
মাদকের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান
৩০ সেপ্টেম্বর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এক ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা সরকারের হাতে রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চলছে এবং এ অভিযান আরও তীব্র করা হবে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, খুন, অপহরণ, ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধের মূলে মাদক রয়েছে। তাই মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’।
ধরা পড়ছে খুচরা কারবারিরা
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মাদকসহ খুচরা বিক্রেতা ও বাহক গ্রেপ্তার হচ্ছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক বা পাইকারি আমদানিকারক, অর্থদাতা এবং মূল কারবারিদের নাগাল পাওয়া যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এর অন্যতম কারণ গডফাদারদের কৌশল। তারা সরাসরি মাদক বহন বা সংরক্ষণ না করে নিরাপদ দূরত্বে থেকে পুরো নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে মাঠপর্যায়ে বড় ধরনের অভিযান হলেও চক্রের মূল মাথারা অক্ষত থেকে যান। এতে মাদক ব্যবসা সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হলেও পুরোপুরি বন্ধ হয় না; বরং চক্রটি নতুন কৌশলে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।
মাদক ব্যবসায় পুলিশের সদস্যও
মাদক চক্রের গভীরতা বোঝাতে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাও যথেষ্ট। ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতের মাদক ধ্বংসের দায়িত্বে থাকা কনস্টেবল মো. রেজাউল করিমকে (৪৫) এক হাজার ৭৯০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। রাজধানীর সূত্রাপুর থানা এলাকায় মাদক বিক্রির সময় তাকে আটক করা হয়।
আদালতের মাধ্যমে জব্দ করা মাদক ধ্বংসের দায়িত্বে থাকা একজন পুলিশ সদস্যের মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ার ঘটনা ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
এর আগে ২৪ আগস্ট মাদক কারবারে সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পল্লবী থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. শফিকুল ইসলামসহ দুজনকে ৫ হাজার ৩১০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনা পুলিশ বিভাগেও বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা প্রায়ই হামলার শিকার হচ্ছেন। এতে মাদক নেটওয়ার্কের বিস্তার ও এর সঙ্গে জড়িত চক্রগুলোর শক্তি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
প্রমাণ পেলেই ব্যবস্থা: পুলিশ
মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশের অবস্থান তুলে ধরে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’।
তিনি জানান, এ বিষয়ে বিশেষ অভিযান চলছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হচ্ছে। প্রভাবশালী মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধেও গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক সক্রিয় রয়েছে।
তার ভাষ্য, সিন্ডিকেট যত বড় বা শক্তিশালীই হোক না কেন, মাদক সংশ্লিষ্টতার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



