দেশে কৃষক পর্যায় থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত দীর্ঘ সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে চালসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। উৎপাদক থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর পথে মধ্যস্বত্বভোগী, কমিশন এজেন্ট এবং বাজারে অসুস্থ প্রতিযোগিতার প্রভাব মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে প্রকাশিত ‘খাদ্যের মূল্যশৃঙ্খল: বাংলাদেশের বাজারব্যবস্থা, মুনাফা ও মধ্যস্বত্বভোগী’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, কৃষি অর্থনীতিবিদ এম এ সাত্তার মণ্ডল, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
গবেষণায় দেখা যায়, কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি পাইজাম চালের গড় দাম ৩০ টাকা ৬৫ পয়সা হলেও ব্যাপারী, মিলার, আড়তদার ও অন্যান্য ধাপ পেরিয়ে খুচরা বাজারে একই চাল বিক্রি হয় ৫৯ টাকা ৬৯ পয়সায়। অর্থাৎ উৎপাদক থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে চালের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।
সিপিডির তথ্যমতে, দেশের ৬০ শতাংশের বেশি পরিবার তাদের মোট আয়ের অন্তত অর্ধেক খাদ্য কেনার পেছনে ব্যয় করে। সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এ ব্যয় প্রায় ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। ফলে মূল্যস্ফীতির চাপে অনেক পরিবার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধিকে শুধু উৎপাদন ব্যয় দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। দীর্ঘ সরবরাহ ব্যবস্থা, মধ্যস্বত্বভোগী, কমিশন এজেন্ট, মজুতদারি এবং বাজারে অনানুষ্ঠানিক সমঝোতা বা সিন্ডিকেটের কারণে প্রতিযোগিতা কমে যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে অসাধু ব্যবসায়ীরা নিজেদের সুবিধামতো দাম নির্ধারণের সুযোগ পান।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, উৎপাদক থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে মসুর ডালের দাম ৭৮ শতাংশ, পেঁয়াজ ৮৭ শতাংশ, আলু ৫০ শতাংশ, কাঁচা মরিচ ১১৬ শতাংশ, বেগুন ৭২ শতাংশ, ডিম ২৫ শতাংশ, গরুর মাংস ১৩ শতাংশ, মাছ ১০ শতাংশ এবং ব্রয়লার মুরগির দাম ২২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
গবেষণার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দিন আল কবীর। তিনি বলেন, উৎপাদন ব্যয়ের পাশাপাশি বাজার কাঠামো, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, মজুতদারি ও বাজারে আধিপত্য খাদ্য মূল্যস্ফীতির বড় কারণ। বর্তমানে দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত আয় প্রত্যাশিত হারে না বাড়ায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে, ফলে অনেকেই সঞ্চয় ভাঙতে বা ঋণের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।
তিনি আরও জানান, সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবার তাদের মোট ব্যয়ের ৫৯ দশমিক ৮ শতাংশ খাদ্যে ব্যয় করে, যেখানে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে এ হার ২৮ দশমিক ৯ শতাংশ। ফলে মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় চাপ নিম্ন আয়ের মানুষের ওপরই পড়ছে।
সিপিডির গবেষণায় ১০টি নিত্যপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এর মধ্যে ছয়টি পণ্যের খুচরা বিক্রেতারা মূলত আড়তদারদের ওপর নির্ভরশীল। এতে বাজারে একচেটিয়া প্রভাব ও মূল্য অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়ে। চালের ক্ষেত্রে উৎপাদক, ব্যাপারী, অটো রাইস মিলার, শহুরে আড়তদার ও খুচরা বিক্রেতা—এই দীর্ঘ শৃঙ্খলে মিলার পর্যায়েই মূল্যবৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি।
তবে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, সরবরাহ ব্যবস্থা দীর্ঘ হলেই সব মূল্যবৃদ্ধির জন্য শুধু মধ্যস্বত্বভোগীদের দায়ী করা যায় না। প্রতিটি স্তর যদি দক্ষ, স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলকভাবে পরিচালিত হয়, তাহলে এসব স্তরেরও প্রয়োজনীয় ভূমিকা রয়েছে।
অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বিশ্বের অনেক দেশে কোভিড-১৯–পরবর্তী মূল্যস্ফীতি কমে এলেও বাংলাদেশে এখনো ৯ থেকে সাড়ে ৯ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এর একটি বড় কারণ উচ্চ লজিস্টিক ব্যয়। বিশ্বে যেখানে লজিস্টিক ব্যয় গড়ে জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে তা প্রায় ১৬ শতাংশ।
তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কোথায় অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হচ্ছে তা চিহ্নিত করে লজিস্টিক ও আমদানি ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, গত চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। মাঠপর্যায়ের গবেষণায় দেখা গেছে, উৎপাদন ব্যয়, বাজারজাতকরণ, সরবরাহ ব্যবস্থা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মজুতদারি, বাজারের অদক্ষতা ও প্রতিযোগিতার অভাব—সব মিলিয়েই খাদ্যের দাম বাড়ছে। কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে বিভিন্ন অংশীজন যুক্ত থাকায় প্রতিটি স্তরেই দামের বৃদ্ধি ঘটছে।



