tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকপোল্যান্ডের পর্যটনকেন্দ্রে বন্দুকধারীর তাণ্ডব, নিহত ৬

পোল্যান্ডের পর্যটনকেন্দ্রে বন্দুকধারীর তাণ্ডব, নিহত ৬

পোল্যান্ডের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ক্রাকোর জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে বন্দুকধারীর এলোপাতাড়ি গুলিতে ছয়জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৫ জন। হামলাকারী উগ্র ডানপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন বলে ধারণা করছে দেশটির সরকার। এদিকে হামলাকারীর বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে আরও তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। খবর বিবিসির।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার বিকেলে ক্রাকোর ঐতিহাসিক মেইন মার্কেট স্কয়ারে এ হামলার ঘটনা ঘটে। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মতো পোশাক পরা এবং অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এক ব্যক্তি গাড়ি নিয়ে পর্যটক ও সাধারণ মানুষের ভিড়ে প্রবেশ করেন। এরপর সেখানে উপস্থিত লোকজনকে লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য এবং হামলার ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, গুলির শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে প্রাণ বাঁচাতে দিগ্বিদিক ছুটতে থাকেন মানুষ। বন্দুকধারীর গাড়িটি দ্রুতগতিতে চত্বরের মধ্য দিয়ে চলাচল করে। এ সময় গুলিতে আশপাশের বিভিন্ন দোকানের কাচ ভেঙে যায়। একটি ট্রাম লক্ষ্য করেও গুলি চালানো হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, প্রায় তিন মিনিট ধরে চলে এই হামলা। পরে পুলিশ সদস্যরা বন্দুকধারীর গাড়ি ধাওয়া করেন। একপর্যায়ে গাড়িটি দুর্ঘটনার কবলে পড়লে পুলিশের সঙ্গে তার গুলিবিনিময় হয়। এতে হামলাকারী আহত হন। পরে ২৫ বছর বয়সী ওই পোলিশ নাগরিককে অস্ত্রোপচারের জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়। তার নাম প্রকাশ করেনি কর্তৃপক্ষ।

পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক জানান, ক্রাকো থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে হামলাকারীর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে আরও তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে দুজন নারী ও একজন পুরুষ। তারা হামলাকারীর নিকটাত্মীয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

টাস্ক বলেন, ‘এখন পর্যন্ত পোল্যান্ডে এ ধরনের ভয়াবহ সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেনি। ক্রাকোয় মানুষের প্রাণের ওপর চালানো এই নৃশংস হামলাকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডই বলতে হবে।’

মেইন মার্কেট স্কয়ারে নিহত ছয়জনের মধ্যে চারজন নারী ও দুজন পুরুষ। তাদের মধ্যে তিনজন পোলিশ এবং একজন ব্রিটিশ নাগরিক। বাকি দুজনের পরিচয় এখনো শনাক্ত করা যায়নি।

হামলায় আহত ১৫ জনের মধ্যে দুজন পুলিশ সদস্য এবং পাঁচজন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আহত বিদেশিদের মধ্যে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রিয়া, রাশিয়া, জার্মানি ও পর্তুগালের নাগরিক রয়েছেন।

পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত দুই সদস্যের অবস্থার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী টাস্ক জানান, তাদের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। অন্যজন তুলনামূলক কম আহত হয়েছেন এবং সুস্থ হয়ে উঠবেন বলে আশা করা হচ্ছে। আহত পুলিশ সদস্যরা হলেন সিনিয়র কনস্টেবল ইয়াকুব কুলিক ও সিনিয়র কনস্টেবল আরতুর মোরানস্কি। তাদের সাহসিকতার প্রশংসা করে টাস্ক বলেন, নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে তারা অনেক মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছেন।

হামলার সময় বন্দুকধারীর পরনে ছিল সামরিক কায়দার কৌশলগত পোশাক। তার কাছে সামরিক মানের আগ্নেয়াস্ত্র ছিল বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে তিনি পোলিশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য ছিলেন না। হামলায় ব্যবহৃত গাড়ি থেকে আরও অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে।

পোল্যান্ডের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মারচিন কিয়েরভিনস্কি বলেন, প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য-প্রমাণে ধারণা করা হচ্ছে, হামলাকারী উগ্র ডানপন্থী মতাদর্শে আকৃষ্ট ছিলেন। তার মধ্যে চরম জাতীয়তাবাদী মনোভাবও ছিল।

প্রধানমন্ত্রী টাস্ক জানিয়েছেন, হামলার সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। হামলাকারীর সম্ভাব্য সহযোগীদের শনাক্ত করতে তিনি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তথ্য চেয়েছেন।

ঘটনার পর শনিবার সন্ধ্যায় ক্রাকো শহরজুড়ে বিপুলসংখ্যক সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন করা হয়। রাজধানী ওয়ারশসহ দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকাতেও নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

এদিকে হামলার ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম। তিনি বলেন, ক্রাকোর ভয়াবহ গুলির ঘটনায় তিনি মর্মাহত ও শোকাহত। নিহতদের পরিবারের সদস্য, আহত ব্যক্তি এবং সহিংসতার শিকার সবার প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, এই কঠিন সময়ে পোল্যান্ডের জনগণের পাশে রয়েছে যুক্তরাজ্য।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস এ ঘটনাকে গভীরভাবে মর্মান্তিক আখ্যা দিয়ে বলেছেন, এর প্রভাব শুধু পোল্যান্ডেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় নিহতদের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন।

হামলার পর পোল্যান্ড ভ্রমণসংক্রান্ত নির্দেশনা হালনাগাদ করেছে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর। এতে ক্রাকোয় অবস্থানরত ব্রিটিশ নাগরিকদের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ভয়াবহ এ হামলার ঘটনায় শোক পালনের অংশ হিসেবে আগামী ১১ নভেম্বর পর্যন্ত ক্রাকো শহরে শোক ঘোষণা করা হয়েছে।