নিজস্ব প্রতিবেদক: একজন সাবেক আমলার স্বেচ্ছাচারিতা, সাংগঠনিক কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ এবং বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদককে ‘হেনস্তার’ প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করেছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে গত ২ আগস্টের ঘটনায় নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সাংগঠনিক মতপার্থক্যের ক্ষেত্রে হুমকি, চাপ ও শারীরিক হামলা বন্ধের দাবি জানিয়েছে তারা। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর অল্প সময়ের মধ্যেই সংগঠনটি সারাদেশে সাংগঠনিক কার্যক্রম বিস্তৃত করে। বর্তমানে ৬২টি জেলা ও মহানগর কমিটি রয়েছে বলে দাবি করা হয়। মহানগর, জেলা, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও সংগঠনের কমিটি রয়েছে এবং দুই লাখের বেশি সক্রিয় নেতাকর্মী ও বিপুলসংখ্যক সমর্থক সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বাবুগয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের জ্যেষ্ঠ কন্যা ও বিএনপি নেত্রী অর্পণা রায় দাসকে সভাপতি এবং জগন্নাথ হল ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক, পরবর্তী সভাপতি, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সক্রিয় কর্মী ও হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি সমীর কুমার বসুকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। পরে ২০২৪ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবুগয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে প্রধান উপদেষ্টা করে পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয় বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়। জেলা-থানা-ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি গঠনের দাবি সংগঠনটির নেতারা দাবি করেন, কমিটি গঠন কোনো ব্যক্তির একক সিদ্ধান্তে হয়নি। সংশ্লিষ্ট জেলা, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের লিখিত সুপারিশের ভিত্তিতে বিভিন্ন কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সংগঠনের নিজস্ব অনুমোদিত গঠনতন্ত্র রয়েছে এবং সাধারণ সভায় আলোচনার পর তা অনুমোদন করা হয়েছে বলেও তারা জানান। তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্ট চেয়ারম্যান ও মহাসচিব পরবর্তীতে একই নামে আরেকটি কমিটি ঘোষণা করে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টকে বিতর্কিত করার এবং সনাতনী সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছেন। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট কোনোভাবেই বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টনের অঙ্গসংগঠন নয়। কারণ কল্যাণ ফ্রন্ট তিনটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সমন্বয়ে গঠিত সংগঠন, আর পূজা উদযাপন ফ্রন্ট কেবল সনাতনী সম্প্রদায়ের সংগঠন—এমন দাবি করা হয়। ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কথা তুলে ধরা সংগঠনের নেতারা জানান, ধর্মীয় পরিবেশ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা তাদের অন্যতম প্রধান কার্যক্রম। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের শারদীয় দুর্গাপূজায় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সংগঠনের নেতাকর্মীরা ভূমিকা রেখেছেন বলে দাবি করা হয়। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনায় নেতাকর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রতিবাদ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতা করেছেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়। জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণার দাবি সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কেন্দ্রীয়, জেলা-মহানগর, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা বিএনপির মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে সক্রিয়ভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন। গণসংযোগ, মতবিনিময় সভা, উঠান বৈঠক, জনসভা, সনাতনী সমাবেশ, লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণা চালানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়। কক্সবাজারের চকরিয়া, সীতাকুণ্ড, ফেনী, জামালপুর, ঝিনাইদহ, নড়াইল, ফরিদপুর এবং ঢাকার বিভিন্ন সংসদীয় আসনসহ চট্টগ্রামের কয়েকটি আসনে সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিএনপির মনোনীত প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়। সাবেক আমলার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ সংবাদ সম্মেলনে একজন সাবেক আমলার বিরুদ্ধে এর আগেও সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সমীর কুমার বসুকে সচিবালয়ে ডেকে নিয়ে ‘অপমানজনক ও কুরুচিপূর্ণ ভাষায়’ কথা বলার অভিযোগ করা হয়। এ ছাড়া সংগঠনের প্রধান উপদেষ্টা বাবুগয়েশ্বর চন্দ্র রায় সম্পর্কেও ওই সাবেক আমলা ‘ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ মন্তব্য করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, ওই সাবেক আমলা এমন মন্তব্যও করেছিলেন যে, পূজা উদযাপন ফ্রন্টের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কারণেই বাবুগয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে মন্ত্রী করা হয়নি। সংগঠনটির পক্ষ থেকে এ বক্তব্যকে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করা হয়। ২ আগস্টের ঘটনায় হামলার অভিযোগ সংবাদ সম্মেলনে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হিসেবে গত ২ আগস্টের ঘটনার কথা তুলে ধরা হয়। সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, ওই দিন বিকেল ৪টা ১১ মিনিটে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী বাবু বিজন কান্তি সরকার সংগঠনের সভাপতি অর্পণা রায় দাসের মোবাইল ফোন থেকে সাধারণ সম্পাদক সমীর কুমার বসুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট-সংক্রান্ত বিষয় নিষ্পত্তির জন্য তাকে অফিসার্স ক্লাবে নিয়ে যান। সেখানে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত দুই নেতাসহ বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান কল্যাণ ফ্রন্টনের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ জন নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন বলে সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত তরণ দে’র নেতৃত্বে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন ব্যক্তি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সমীর কুমার বসুর ওপর চড়াও হয়ে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন বলে অভিযোগ করা হয়। পরে কয়েকজন ব্যক্তি তাকে হামলাকারীদের হাত থেকে রক্ষা করে কক্ষের বাইরে নিয়ে যান বলেও দাবি করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, ঘটনার আগে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদককে উদ্দেশ করে তাকে সংগঠন করতে না দেওয়া, এমনকি সংগঠনের সদস্য থাকতে না দেওয়ার পাশাপাশি কোনো এমপি বা মন্ত্রীর কাছে যেতে দেওয়া হবে না—এ ধরনের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত মিল্টন বৈদ্যকে সাধারণ সম্পাদক করে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের চার সদস্যের একটি কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়। বহিষ্কৃত নেতাদের কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের কারণে কল্যাণ ফ্রন্টনের মহাসচিব তরণ দে, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও মাদারীপুর জেলা বিএনপির সদস্য মিল্টন বৈদ্য এবং কল্যাণ ফ্রন্টনের বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সুকেশ সাহা আনন্দ বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন। সংগঠনটির দাবি, নির্বাচনে তাদের জামানত বাজেয়াপ্ত হলেও পরবর্তী সময়ে দলীয় সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে তারা কল্যাণ ফ্রন্টনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। ছয় দফা দাবি সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে ছয় দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো— ১. গত ২ আগস্টের ঘটনার নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে। ২. ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। ৩. রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে হুমকি, চাপ ও শারীরিক হামলা বন্ধ করতে হবে। ৪. বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের অনুমোদিত গঠনতন্ত্র ও সাংগঠনিক কাঠামোর প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। ৫. বিভ্রান্তিকর বা অসত্য তথ্য প্রচার করে সনাতনী সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি থেকে বিরত থাকতে হবে। ৬. সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় স্বাধীনতা, সামাজিক নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতারা বলেন, তারা কোনো সংঘাত বা প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করেন না। সাংগঠনিক বিরোধের সমাধান আলোচনা ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে হওয়া উচিত। গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তারা বলেন, কোনো পক্ষের বক্তব্য যাচাই না করে তা প্রচার না করে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা উচিত। একই সঙ্গে সংগঠনটির সাংগঠনিক অবস্থান প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করারও আহ্বান জানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের নেতারা সংগঠনটির সাংগঠনিক কাঠামো, কার্যক্রম ও সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করার পাশাপাশি ২ আগস্টের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।