শেষ হয়নি প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি-৪ (পিইডিপি-৪)। বিপুল বাজেটের এই প্রকল্প থেকেও দৃশ্যমান অগ্রগতি না আসায় প্রশ্ন উঠেছে নানা মহলে। এর মধ্যেই অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে অনুমোদন পেয়েছে নতুন কর্মসূচি—পিইডিপি-৫। এ প্রকল্পের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট, যা ইতোমধ্যেই সমালোচকদের কাছে “অপচয়ের প্রকল্প” হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।
এই বাজেটের মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা আসবে সরকারি তহবিল থেকে, আর বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান। উল্লেখ্য, পিইডিপি-৪-এর বাজেট ছিল প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা—কিন্তু এত বড় ব্যয়ের পরও শিক্ষার্থীদের শেখার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত উন্নতি দেখা যায়নি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, একই ধাঁচের আরেকটি প্রকল্পে নতুন করে এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে।
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে তড়িঘড়ি করে নেয়া এই প্রকল্প ঘিরে সংশয় আরও বেড়েছে। শুধু পিইডিপি-৪ নয়, আগের চারটি প্রকল্প নিয়েও রয়েছে একই ধরনের প্রশ্ন। যথাযথ ও বাস্তবসম্মত সম্ভাব্যতা যাচাই (ফিজিবিলিটি স্টাডি) ছাড়াই প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নতুন প্রকল্পের লক্ষ্য অবশ্য উচ্চাভিলাষী—অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায্য, টেকসই ও মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি শিশুকে শক্ত ভিত্তিগত সাক্ষরতা ও গণিত দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করা হবে। শতভাগ শিশুকে স্কুলে আনা এবং অন্তত ৯০ শতাংশ শিশুকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ধরে রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ঝরে পড়া অন্তত ২ লাখ শিশুকে পুনরায় বিদ্যালয়ে ফেরানোর কথাও বলা হয়েছে। পাশাপাশি তৃতীয় ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা ও গণিতে দক্ষতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে একই ধরনের লক্ষ্য আগের প্রকল্পগুলোতেও ছিল, যা বাস্তবে সফল হয়নি।
বিভিন্ন গবেষণার তথ্যেও সেই ব্যর্থতার প্রতিফলন দেখা যায়। বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫ অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরের মাত্র ২৪ শতাংশ শিক্ষার্থীর পাঠ দক্ষতা রয়েছে। পূর্ণাঙ্গভাবে বাংলা পড়তে পারে ৪০ শতাংশ, মৌলিক ও বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে ৩০ শতাংশ শিশু। গণিতে আরও দুরবস্থা—মাত্র ১৮ শতাংশ শিক্ষার্থীর মৌলিক সংখ্যাজ্ঞান রয়েছে; ৩৬ শতাংশ যোগ-বিয়োগ করতে পারে এবং ৩১ শতাংশ সংখ্যা চিনতে পারে।
শিক্ষার মানোন্নয়ন না হলেও অবকাঠামো খাতে বিপুল অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার, অসম্পূর্ণ কাজ, উদ্বোধনের আগেই ভবন নষ্ট হয়ে যাওয়া, এমনকি কাজ না করেই বিল উত্তোলনের মতো অভিযোগও উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এ এ ধরনের নানা অভিযোগ জমা পড়েছে।
জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের একটি প্রকল্পে ১,৩৫৬ জন শিক্ষার্থী দেখানো হলেও তদন্তে পাওয়া গেছে মাত্র ১১ জন। তবুও প্রকল্পটি সন্তোষজনক বলে প্রতিবেদন দেয়া হয়েছিল। মাদারীপুরে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মসূচিতে ঘুষ, বদলি বাণিজ্য ও শিক্ষকদের বেতন আত্মসাতের অভিযোগে অভিযানও পরিচালিত হয়েছে।
এসব অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও চলতি বছরের জানুয়ারিতে পিইডিপি-৫ অনুমোদন পায়, যার মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে জুন পর্যন্ত।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি একেবারে শেষ সময়ে এসে দ্রুততার সঙ্গে অনুমোদন দেয়া হয়। তৎকালীন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দীন মাহমুদও সে সময় মন্তব্য করেছিলেন—পিইডিপি-৫-এ সুস্পষ্ট পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে, যা এত বড় বাজেটের প্রকল্পের জন্য উদ্বেগজনক।
মাঠপর্যায়ের শিক্ষকরা বলছেন, কাগজে-কলমে উন্নয়ন দেখানো হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। রংপুরের পীরগাছার এক প্রধান শিক্ষক জানান, নতুন ভবন নির্মাণ হলেও অনেক ক্ষেত্রেই কাজের মান খারাপ, অল্প সময়েই ফাটল দেখা দেয়। অনেক কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই ঠিকাদার চলে যান, অথচ বিল তুলে নেয়া হয় পুরোপুরি।
গাইবান্ধার চরাঞ্চলের শিক্ষক আমিনুর রশিদ বলেন, “লক্ষ্যগুলো ভালো শোনালেও শিক্ষার্থীদের শেখার বাস্তব উন্নতি খুবই সীমিত। অনেক শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণিতে উঠেও ঠিকমতো পড়তে পারে না, সহজ গণিতেও দুর্বল।” তিনি আরও বলেন, শিক্ষকরা অতিরিক্ত কাগজপত্র ও রিপোর্টিংয়ের চাপে থাকেন, ফলে পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি হয় না।
তিনি মনে করেন, শিক্ষার্থীদের পরিবারে আর্থিক স্থিতিশীলতা না থাকলে স্কুলে উপস্থিতি বাড়ানো কঠিন। তাই মিড-ডে মিল চালুর মতো উদ্যোগ গ্রামীণ এলাকায় কার্যকর হতে পারে।
নবনিযুক্ত শিক্ষক শরীফুল আমিন বলেন, অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট তীব্র। আগে শূন্যপদ পূরণ জরুরি। পাশাপাশি বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। অনেক প্রশিক্ষণ কার্যত নামকাওয়াস্তে, যা সময়ের অপচয় ছাড়া কিছু নয়। প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বৈষম্য রয়েছে—পুরোনো শিক্ষকরা অনেক সময় ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করতে পারেন না, আবার তরুণদেরও সবসময় সুযোগ দেয়া হয় না।
সব মিলিয়ে শিক্ষকদের অভিমত—শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। অথচ পিইডিপি-৫-এও বড় অংশের ব্যয় ধরা হয়েছে অবকাঠামো ও প্রশাসনিক খাতে। সারা দেশে প্রায় ২৫ হাজার একক শিফট স্কুলে রূপান্তরের লক্ষ্য নেয়া হয়েছে, যেখানে শুধু ভবন নির্মাণেই ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।
এ ছাড়া ওয়াশ সুবিধা, নিরাপদ পানি, বাউন্ডারি ওয়ালসহ অন্যান্য খাতেও বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আগের প্রকল্পেও প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যয় ছিল অবকাঠামো খাতে।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী বলেন, “প্রকল্প নেওয়ার আগে বাস্তবতা যাচাই জরুরি। আগের প্রকল্প থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুনভাবে মূল্যায়ন ও কঠোর তদারকি প্রয়োজন।”
তবে নতুন সরকার এ প্রকল্প বাস্তবায়নে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, দুর্নীতির ক্ষেত্রে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হবে এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে প্রকল্পের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।



