ইরানে ভূপাতিত একটি মার্কিন যুদ্ধবিমানের নিখোঁজ পাইলটদের ভাগ্য চলমান সংঘাতের গতিপথে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। শুক্রবার মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, দুই পাইলটের একজনকে ইরানের অভ্যন্তরে গভীরে পরিচালিত এক অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে। অপর পাইলটকেও উদ্ধার করা গেলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে একই সঙ্গে এটি ওয়াশিংটনকে আরও আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে স্থল অভিযান বিবেচনা করছেন। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের আকাশসীমায় তুলনামূলক কম প্রতিরোধের মুখে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে তা সামরিক পরিকল্পনাকারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারে। এফ-১৫ যুদ্ধবিমানটি ভূপাতিত হওয়ার পর ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারগুলোকে পাহাড়ি উপত্যকার ওপর নিচু দিয়ে চক্কর দিতে দেখা গেছে। পাশাপাশি সি-১৩০ পরিবহন বিমান ও নজরদারি ড্রোনও অভিযানে অংশ নেয়। যদিও একটি হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
প্রথম পাইলটকে উদ্ধারের অভিযান অতিরিক্ত কোনো মার্কিন হতাহতের ঘটনা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে দ্বিতীয় পাইলট যদি ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বা স্থানীয় মিলিশিয়াদের হাতে আটক হয়ে থাকেন, তাহলে পরিস্থিতি জটিল আকার নিতে পারে। ১৯৭৯ সালের জিম্মি সংকট এ ক্ষেত্রে একটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ। ৪৪৪ দিন ধরে তেহরানে আটক মার্কিন কূটনীতিকদের ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের জনমত ও রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের নির্বাচনী পরাজয়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
যদি আটক পাইলটের ভিডিও প্রকাশ করা হয়, তাহলে ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেস, সামরিক পরিবার, ভেটেরান সংগঠন এবং সাধারণ জনগণের চাপের মুখে পড়তে পারে—যুদ্ধ বন্ধ করে আলোচনার মাধ্যমে তাকে ফিরিয়ে আনার দাবিতে। এতে ইরানে বিমান হামলা অব্যাহত রাখা রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে উঠতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র কম অনুকূল শর্তে যুদ্ধবিরতিতে যেতে বাধ্য হতে পারে।
আলোচনার মাধ্যমে মুক্তির সম্ভাবনা
আরেকটি সম্ভাবনা হলো, ইরান পাইলটকে আটক করলেও তা প্রকাশ না করে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে পারে। একজন আটক পাইলট যুদ্ধবিরতির পাশাপাশি বৃহত্তর দরকষাকষির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারেন। ইরান তখন একসঙ্গে একাধিক দাবি উত্থাপন করতে পারে—যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ও টোল আরোপ, ভবিষ্যতে মার্কিন সামরিক কার্যক্রম সীমিত করা এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা প্রত্যাহার।
দীর্ঘদিন ধরেই ইরান যুদ্ধকালীন হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে শান্তিকালেও কার্যকর রাখতে আগ্রহী। এ সপ্তাহে দেশটির পার্লামেন্ট এ বিষয়ে আইনগত কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। একজন মার্কিন পাইলট আটক থাকলে তেহরানের দরকষাকষির সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এতে ট্রাম্প প্রশাসনকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে—ইরানের শর্ত মেনে নেওয়া, নাকি দীর্ঘমেয়াদি জিম্মি পরিস্থিতি মোকাবিলা করা।
এই প্রক্রিয়া নীরবভাবেও ঘটতে পারে—কোনো প্রচার বা ভিডিও প্রকাশ ছাড়াই। শুধু ইরান জানাতে পারে যে তাদের কাছে একজন মার্কিন পাইলট রয়েছে এবং তারা আলোচনায় আগ্রহী। এ ধরনের পরিস্থিতি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য একটি সম্ভাব্য ‘সম্মানজনক প্রস্থান’ হিসেবেও উপস্থাপন করা হতে পারে—যেখানে সেনা সদস্যকে ফিরিয়ে আনা, ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর দাবি করা যাবে।
মৃত্যু বা ব্যর্থতা সংঘাত বাড়াতে পারে
অন্যদিকে, যদি পাইলট আটক অবস্থায় নিহত হন বা উদ্ধার অভিযান ব্যর্থ হয়, তাহলে সংঘাত নতুন মাত্রা পেতে পারে। এমন পরিস্থিতি স্থল আক্রমণের পথও উন্মুক্ত করে দিতে পারে। যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে ইরানি বাহিনী তাকে হত্যা করেছে, অথবা উদ্ধার অভিযানে মার্কিন হতাহতের ঘটনা ঘটে, তাহলে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানোর চাপ বহুগুণে বেড়ে যাবে।
সামরিক পরিবার, ভেটেরান সংগঠন এবং রিপাবলিকান নেতারা তখন শুধু বিমান হামলা নয়, আরও বড় সামরিক পদক্ষেপের দাবি তুলতে পারেন। ট্রাম্প ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র শিগগিরই ইরানের ওপর কঠোর আঘাত হানতে পারে, যার লক্ষ্য হতে পারে বিদ্যুৎ অবকাঠামোসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা।
তবে ইরানের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে নির্দিষ্ট এলাকা দখল বা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া কেবল কৌশলগত লক্ষ্য দিয়ে সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন শক্ত রাজনৈতিক ও সামরিক ভিত্তি। যদিও দুর্বল বলে বিবেচিত, তবুও ইরানের সেনাবাহিনী স্থলযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
জাগরোস পর্বতমালা প্রায় ১,০০০ মাইলজুড়ে বিস্তৃত—যেখানে ১৪,০০০ ফুটের বেশি উচ্চতার শৃঙ্গ, সরু উপত্যকা এবং এমন পথ রয়েছে, যেখানে অল্পসংখ্যক প্রতিরক্ষাকারীও বড় বাহিনীকে আটকে দিতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের প্রতিরোধও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন এলাকায় নিহত বা আটক মার্কিন সেনাদের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে এবং উপজাতীয় গোষ্ঠীগুলো প্রতিরোধে যুক্ত হয়েছে। ভূখণ্ড সম্পর্কে তাদের গভীর জ্ঞান যেকোনো আগ্রাসী বাহিনীর জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এই পরিস্থিতি ১৯৯৩ সালের সোমালিয়ার মোগাদিশুতে সংঘটিত ‘ব্ল্যাক হক ডাউন’ ঘটনার সঙ্গে তুলনীয়। সেখানে একটি সীমিত অভিযান হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার পর দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। প্রায় ১৮ ঘণ্টার সেই যুদ্ধে ১৮ জন মার্কিন সেনা এবং শতাধিক সোমালি নিহত হন।
শুক্রবারের আগে পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন সংঘাতের সময়সীমা ও পরিসর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছিল। তবে এখন সেই নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই নির্ভর করছে নিখোঁজ পাইলটের ভাগ্যের ওপর।



