tanaka

নিরাপত্তা পরিষদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন, দ্রুত সংস্কারের আহ্বান জি-৪-এর

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বর্তমান কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলে দ্রুত সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে জি-৪ জোট। ভারত, ব্রাজিল, জার্মানি ও জাপান নিয়ে গঠিত এই জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা...
প্রচ্ছদজাতীয়লাগামহীন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা: নিয়ন্ত্রণের বাইরে এক নগর বাস্তবতা

লাগামহীন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা: নিয়ন্ত্রণের বাইরে এক নগর বাস্তবতা

ফিটনেস নেই, চালকদের লাইসেন্স নেই—তবুও রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি, সর্বত্র দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। বেপরোয়া গতি ও অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের কারণে প্রতিনিয়ত বাড়ছে দুর্ঘটনা। গত দেড় দশকে এই যানবাহনের সংখ্যা গাণিতিক হারে বেড়ে এখন তা কার্যত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

সরকার একাধিকবার নিয়ন্ত্রণ নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। কারণ, এই খাতের সঙ্গে জড়িত লাখ লাখ নিম্নআয়ের মানুষের জীবিকা। ফলে হঠাৎ করে এগুলো বন্ধ করাও সম্ভব হচ্ছে না। এ অবস্থায় বিকল্প হিসেবে নিরাপদ ই-রিকশা চালুর কথা ভাবা হলেও বাজেট সংকটে তা থমকে আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আধুনিক ও নিরাপদ যানবাহন চালুর পাশাপাশি চালকদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা জরুরি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। নিয়ন্ত্রণহীনভাবে নতুন নতুন অটোরিকশা তৈরি হয়ে সড়কে নামতে থাকে। অলিগলি ছাড়িয়ে প্রধান সড়কেও দাপট বাড়ে। সরকার স্বীকার করে, এত বিপুল সংখ্যক অটোরিকশা একসঙ্গে সরানো সম্ভব নয়। ফলে কঠোর পদক্ষেপের বদলে বিকল্প পরিকল্পনার দিকে ঝুঁকে পড়ে প্রশাসন।

বর্তমানে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)—কেউই এ খাতের পূর্ণ দায়িত্ব নিতে আগ্রহী নয়। কারণ, অটোরিকশা মোটরযানের সংজ্ঞায় পড়ে কি না—এ নিয়েই রয়েছে দ্বিধা। ফলে কার্যত এই যানবাহন নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় চলছে। হাইকোর্ট একাধিকবার বন্ধের নির্দেশ দিলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।

এদিকে, অটোরিকশা চালকরাও লাইসেন্সের দাবি জানাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, নিয়মিত অভিযানে জরিমানা দিতে গিয়ে তাদের দৈনিক আয় নষ্ট হচ্ছে। তারা বলছেন, চালকদের শাস্তি না দিয়ে বরং অবৈধভাবে এসব যান তৈরি হয় যেখানে—সেসব ওয়ার্কশপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

বিকল্প হিসেবে ই-রিকশা চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়। ঢাকার আফতাবনগর, বাড্ডা-রামপুরা, ধানমণ্ডি ও মতিঝিল এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ই-রিকশা চালু করা হয়। নির্ধারিত রুট, নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ ও বৈধ চার্জিং ব্যবস্থার পরিকল্পনাও ছিল। তবে সীমিত উদ্যোগ বড় সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। বাজেট শেষ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে প্রকল্পটি স্থগিত রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নতুন নকশার ই-রিকশা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে এবং চালকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি কোম্পানিকে উৎপাদনের অনুমতিও দেয়া হয়েছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে চালু করতে এখনো মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে শত শত অটোরিকশা। মোহাম্মদপুর, বসিলা, কেরানীগঞ্জসহ নানা স্থানে ছোট-বড় ওয়ার্কশপে দেশীয়ভাবে এসব যান তৈরি হচ্ছে। চীন থেকে আমদানি করা ব্যাটারি ও মোটরের সঙ্গে স্থানীয় উপকরণ যুক্ত করে প্রতিটি অটোরিকশা তৈরি করতে খরচ পড়ছে প্রায় ৭০ থেকে ৭২ হাজার টাকা। কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা মান যাচাই ছাড়াই এসব যান সড়কে নামছে।

গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২০ লাখ শুধু রাজধানীতে। প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ এসব যান ব্যবহার করছে। তবে এর সঙ্গে বাড়ছে দুর্ঘটনা, বিশৃঙ্খলা ও বিদ্যুতের ওপর চাপ। অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দিতে দেশের মোট বিদ্যুতের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ খাতকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে সুস্পষ্ট নীতিমালা, নিবন্ধন, লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট এলাকায় চলাচল সীমাবদ্ধ করা এবং মহাসড়কে নিষিদ্ধ করার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

অন্যদিকে, পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে ছোট যানবাহনের পরিবর্তে বাসভিত্তিক গণপরিবহন ব্যবস্থা জোরদার করাই টেকসই সমাধান। ধাপে ধাপে অটোরিকশা তুলে দিয়ে চালকদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি না করলে এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।