যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যে ইরান ইস্যুতে পরস্পরবিরোধী অবস্থান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে তেহরানকে কঠোর সামরিক পরিণতির হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন তিনি, অন্যদিকে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে সামরিক অভিযান চালাবে, নাকি আলোচনার পথেই সমাধান খুঁজবে—তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
সম্প্রতি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপে আবারও সামরিক অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, নিজেদের বিমান ও নৌবহরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংসের লক্ষ্যেই এ হামলা চালানো হয়েছে। তবে তেহরানের দাবি, কেশম দ্বীপের আকাশে একটি মার্কিন ড্রোন গুলি করে ভূপাতিত করেছে তাদের বাহিনী।
ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য নতুন সামরিক পদক্ষেপের আশঙ্কায় ইরানও সতর্কতামূলক প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশটির পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর আশপাশে বসবাসকারী সাধারণ মানুষের মধ্যে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব মোকাবিলায় আয়োডিন ট্যাবলেট বিতরণ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বুশেহর এবং পিকঅ্যাক্স পর্বতের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনার কাছাকাছি এলাকায় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি-সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহের বিনিময়ে দুই কোটি ডলার পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন সরকার।
অন্যদিকে নির্বাচনে নিজ দলের পরাজয়ের পর দেশের অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন ট্রাম্প। নাগরিকদের অসন্তোষ সামাল দেওয়ার পাশাপাশি ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হচ্ছে তাকে। তবে তেহরানের দেওয়া শর্ত—বিশেষ করে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দ করা সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি—মেনে নিতে রাজি নয় ওয়াশিংটন।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের কৌশলগত অবস্থান এবং সম্ভাব্য পাল্টা হামলার ঝুঁকি যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে জটিল করে তুলেছে। সীমিত পরিসরে সামরিক অভিযান শুরু করলেও সংঘাত শেষ পর্যন্ত কতটা বিস্তৃত হতে পারে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে নতুন করে হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনকে সামরিক ও রাজনৈতিক—দুই দিকই বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।
তবে সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় তেহরান নতুন একটি শান্তি প্রস্তাব ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে পাঠিয়েছে, যা বর্তমানে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
একদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনী নির্দেশ পেলেই বড় ধরনের অভিযান শুরু করার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে, অন্যদিকে ইরানও নিজেদের অবস্থানে অনড়। তেহরানের হুঁশিয়ারি, দেশটির ওপর নতুন করে হামলা চালানো হলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ব্যাপক পাল্টা আক্রমণ চালানো হবে।
সব মিলিয়ে ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এখন দুটি পথ—সামরিক সংঘাত আরও বাড়ানো, অথবা কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানো। শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন কোন পথে এগোয়, তার ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ।



