চট্টগ্রামের লোহাগাড়ার চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় নোয়াপাড়ার ১২ বছরের শিশু মো. রায়হানকে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করতে রাজধানীর একটি সংঘবদ্ধ চক্র তার পা কেটে দিয়েছে—সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন দাবি ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন তথ্য। পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, ভিক্ষাবৃত্তিতে নামানোর জন্য নয়, ঢাকায় ট্রেন দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তেই রায়হানের একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছিল।
তবে রায়হান ও তার পরিবারের সদস্যদের দেওয়া বিভিন্ন বক্তব্যে একাধিক অসঙ্গতি থাকায় পুরো ঘটনাটি নিয়ে এখনও নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে।
ঢাকা রেলওয়ে থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে আল আমিন নামের এক যুবকের সঙ্গে লাভ ভাগাভাগির ভিত্তিতে পানি বিক্রি করত রায়হান। এর পাশাপাশি সে ভিক্ষাও করত। ১১ জুন বিমানবন্দর এলাকা থেকে গোসল করে কমলাপুরে ফেরার পথে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের কর্ণফুলী এক্সপ্রেসের দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয় শিশুটি।
দুর্ঘটনার পর পুলিশ তাকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শে ২ জুলাই রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করে তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়। অস্ত্রোপচারের পর রায়হানকে আইসিইউতে রাখা হয়। মাথায় আঘাতের চিকিৎসার জন্য পরবর্তী সময়ে তাকে জাতীয় নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, অস্ত্রোপচারের পর প্রায় দেড় মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল রায়হান। এ সময় তার দেখাশোনার জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে আরেছা নামের এক আয়াকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের জরিনা নামের এক নারীর কাছে আশ্রয় নেয় সে। স্টেশনে ওই নারী ‘মালির মা’ নামে পরিচিত ছিলেন। সেখানেই পরবর্তী সময়ে ভিক্ষা করত রায়হান।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে রায়হান জানায় তার মা মারা গেছেন এবং সে বাড়িতে ফিরতে চায়। এরপর তার বন্ধু জাকির তাকে যাত্রাবাড়ীতে নিয়ে একটি বাসে তুলে দেয়। শিশুটিকে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে রেলওয়ে পুলিশের কনস্টেবল রিয়াজুল করিমও ভূমিকা রাখেন বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
এ ছাড়া মিনা নামের স্টেশনের এক নারীও রায়হানের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন বলে পুলিশের ভাষ্য। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকেও শিশুটির পা কাটার ঘটনার সঙ্গে জড়িত হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা।
ট্রেন দুর্ঘটনার পর রায়হানকে নিয়ে ধারণ করা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে হাসপাতালের মেঝেতে বসে থাকা শিশুটিকে বলতে শোনা যায়, ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে সে আহত হয়েছে। একই ভিডিওতে সে জানায়, তার মা-বাবা নেই। ভিডিওতে তার মাথা ও পেটেও আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়।
জানা গেছে, বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর প্রায় সাত মাস নিখোঁজ ছিল রায়হান। স্থানীয় একটি হেফজখানায় পড়াশোনা করত সে। ১৩ সেপ্টেম্বর ভোরে চুনতির সিরাত মাহফিলের মাঠে ভিক্ষা করার সময় স্থানীয় কয়েকজন তাকে দেখতে পান। পরে খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা সেখানে গিয়ে তাকে শনাক্ত করেন।
রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দীন পেশায় দিনমজুর। তার সঙ্গে রায়হানের মায়ের বিচ্ছেদ হয়েছে এবং বর্তমানে তারা আলাদা সংসারে থাকেন। বাড়ি ছাড়ার আগে রায়হান সৎমায়ের সঙ্গে থাকত।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রায়হানের পা কাটা অবস্থার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর অভিযোগ ওঠে, রাজধানীর কোনো সংঘবদ্ধ চক্র শিশুটিকে ধরে নিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে তার পা কেটে দিয়েছে। কিন্তু রায়হান ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এ অভিযোগের সরাসরি সমর্থন পাওয়া যায়নি।
বরং শিশুটির মা-বাবা, সৎমা এবং রায়হানের নিজের বক্তব্যেও বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষ করে রায়হানের মা মারা গেছেন—এমন তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও বাড়িতে গিয়ে তার আপন মা ও সৎমা দুজনের সঙ্গেই কথা বলার সুযোগ পাওয়া গেছে। এতে তার পারিবারিক পরিস্থিতি, বাড়ি ছাড়ার কারণ এবং ঢাকায় যাওয়ার পরের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হোসেন দাবি করেন, রায়হানের বাবা নাজিম উদ্দীনকে নিয়ে এলাকায় নানা কথা প্রচলিত রয়েছে। তার অভিযোগ, নাজিম উদ্দীন নিয়মিত মাদক সেবন করেন। ফেসবুকে ছেলের পা কাটা অবস্থার ছবি দেখার পরও তিনি রায়হানকে দেখতে যাননি বলেও দাবি করেন আবুল হোসেন।
অন্যদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে নাজিম উদ্দীন জানিয়েছেন, ছেলেকে উদ্ধারের পর পা কাটা অবস্থায় দেখেছেন এবং এর আগে এ বিষয়ে তিনি কিছু জানতেন না। স্থানীয়দের মতে, তার বক্তব্যের সঙ্গেও কিছু অসঙ্গতি রয়েছে।
রায়হানের বাবার বক্তব্যের বিভিন্ন অংশ বিশ্লেষণ করলেও সময় ও ঘটনার বর্ণনায় ভিন্নতা দেখা যায়। রায়হান কেন বাড়ি ছেড়েছিল, কার সঙ্গে ঢাকায় গিয়েছিল, সেখানে কীভাবে দিন কাটিয়েছে এবং ট্রেন দুর্ঘটনার আগে ও পরে তার সঙ্গে কী ঘটেছিল—এসব বিষয়ে পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যও এক নয়।
লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বায়েজিদ-বিন-আখন্দ বলেন, রায়হানের বিষয়ে জানার পর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে সহযোগিতা করা হয়েছে। তবে ঘটনাটি ঘিরে বিভিন্ন ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শিশুটির নিখোঁজ হওয়ার পেছনে পারিবারিক কোনো সহিংসতা ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভিক্ষাবৃত্তিতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে রায়হানের পা কেটে দেওয়ার অভিযোগের সঙ্গে ট্রেন দুর্ঘটনা ও পরবর্তী চিকিৎসার ঘটনাপ্রবাহের সামঞ্জস্য পাওয়া যাচ্ছে না। তবে বাড়ি থেকে শিশুটির চলে যাওয়ার কারণ, তার ঢাকায় পৌঁছানোর পথ, দুর্ঘটনার আগে ও পরে তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা এবং দীর্ঘ সময় ধরে ভিক্ষাবৃত্তির সঙ্গে তার যুক্ত থাকার বিষয়গুলো এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিযোগের পাশাপাশি রায়হানের পারিবারিক পরিস্থিতি ও ঢাকায় অবস্থানকালীন ঘটনাগুলোও নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।



