১১ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগের অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার ব্যাংক হিসাব এবং দেশে-বিদেশে তাঁর আর্থিক লেনদেনের তথ্য চেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে প্রয়োজনীয় নথিপত্র চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে সংস্থাটি।
দুদকের প্রধান কার্যালয়ের উপপরিচালক ও অনুসন্ধান কর্মকর্তা মো. জাহেদ কালামের সই করা চিঠি থেকে এ তথ্য জানা গেছে। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
দুদক সূত্র জানায়, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডে সম্পদ অর্জন, জমি কেনা এবং অর্থপাচারের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য বিএফআইইউর কাছে তাঁর ব্যাংক হিসাবসহ দেশ-বিদেশের আর্থিক লেনদেনের তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র চাওয়া হয়েছে।
এর আগে গত মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান সাংবাদিকদের বলেন, অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কমিশন পরবর্তী ধাপে এগিয়েছে। তিনি বলেন, অনুসন্ধান ও তদন্ত চলমান রয়েছে এবং এতে যে তথ্য পাওয়া যাবে, তার ভিত্তিতেই পরবর্তী কার্যক্রম নেওয়া হবে। আইন ও প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই বলেও জানান তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে নানা আলোচনা ও সমালোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে দুদক সচিব বলেন, কমিশনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করলেই এ বিষয়ে ধারণা পাওয়া যাবে। অনুসন্ধান ও তদন্ত শেষে প্রতিবেদন পাওয়ার পর কমিশন পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।
বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে তথ্য চাওয়া হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে সাইদুর রহমান খান বলেন, প্রয়োজন হলে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলআর) পাঠানো হবে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে সারবত্তা পাওয়া গেলে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মন্ত্রণালয়ের নথিও সংগ্রহ করেছে দুদক
আসিফ মাহমুদ যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় সম্পন্ন হওয়া নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি-সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথি ইতোমধ্যে সংগ্রহ করেছে দুদক। গত ৩ সেপ্টেম্বর এসব নথি চেয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। পরে মন্ত্রণালয় থেকে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র দুদকে পাঠানো হয়েছে।
এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি, কেনাকাটাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। অনুসন্ধানের জন্য উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়।
পরদিন অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে চার ধরনের নথি চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায় দুদক।
গত ১৩ সেপ্টেম্বর আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ, বিভিন্ন জেলায় জেলা প্রশাসক পদায়ন, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং বিদেশে অর্থপাচারসহ আরও কয়েকটি অভিযোগ পৃথকভাবে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। সংস্থাটি জানিয়েছে, নতুন অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই শেষে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে সমন্বয় করে বিষয়গুলো দেখা হবে।
পাঁচ দেশে অর্থপাচারের অভিযোগ
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে পাঁচ দেশে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের কথা বলা হয়েছে। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, আসিফ মাহমুদ তাঁর দুই বোনজামাই ও ভাগনিকে অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তবে এসব অভিযোগ এখনো অনুসন্ধানাধীন; অভিযোগগুলোর সত্যতা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাঠিয়ে ভিলা কেনা, বিভিন্ন ব্যবসায় বিনিয়োগ এবং ‘গ্রিন গ্রুপে’ অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে। সিঙ্গাপুরে প্রায় ৩ হাজার কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে প্রায় দেড় হাজার টাকা পাচারের অভিযোগও করা হয়েছে। পাশাপাশি পর্তুগালে জমি কেনার অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগে প্রায় ৬০ কোটি টাকা এবং দেশের ৩৬ জেলায় জেলা প্রশাসক পদায়নে জনপ্রতি ২ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যয় বাড়ানো, ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের চেষ্টার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে কোটি কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে বর্তমানে অনুসন্ধান চালাচ্ছে দুদক।



