মাত্র সাড়ে আট ঘণ্টার টানা ভারী বৃষ্টিতে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে ময়মনসিংহ নগরীর জনজীবন। রাত সাড়ে ১২টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত ১৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, যা চলতি বছরে জেলার সর্বোচ্চ। অতিবৃষ্টিতে নগরীর প্রধান সড়ক, অলিগলি, হাসপাতাল এলাকা, বাজার ও আবাসিক পাড়া-মহল্লা পানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রোগী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ পথচারীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর একই চিত্রের পুনরাবৃত্তি হলেও জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়ে গেছে।
সানকিপাড়া, আকুয়া, গোলকিবাড়ী, বলাশপুর, চরপাড়া, খাগডহর, গাঙ্গিনারপাড়, বাঁশবাড়ি কলোনি, নতুন বাজার, জেলা স্কুল মোড় ও কেওয়াটখালীসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে। অনেক বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় বাসিন্দাদের রাতভর পানি সেচে কাটাতে হয়। বিভিন্ন স্থানে ড্রেন উপচে নোংরা পানি সড়কে উঠে আসায় যান চলাচলও ব্যাহত হয়।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ইনচার্জ জানান, রাত সাড়ে ১২টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত ১৭৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, যা চলতি বছরে জেলার সর্বোচ্চ। অতিবৃষ্টির কারণে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে স্বাভাবিক জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
সানকিপাড়া রেলক্রসিং এলাকার ব্যবসায়ী আবু সাঈদ বলেন, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল দখল, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার না করা এবং চলমান উন্নয়নকাজের কারণে পানি দ্রুত নামতে পারছে না। ফলে সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে চলে যাচ্ছে।
হেলথ অফিসারের গলির বাসিন্দা হামিদা আক্তার বলেন, ড্রেন পরিষ্কার না থাকায় বৃষ্টির পানি ঘরে ঢুকে আসবাবপত্র নষ্ট হচ্ছে। প্রতিবছর একই দুর্ভোগ হলেও স্থায়ী সমাধান মিলছে না।
জলাবদ্ধতার কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন রোগী ও তাদের স্বজনরা। চরপাড়া মোড়ে হাসপাতালে রোগী নিয়ে আসা জামালপুরের আবুল বাশার বলেন, হাঁটুপানির কারণে কয়েকশ মিটার পথ পাড়ি দিতে অ্যাম্বুলেন্সের এক ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছে। হাসপাতাল চত্বরে পানি জমে থাকায় রোগী নিয়ে চলাচল আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
বাঁশবাড়ি কলোনির ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী রিফাত আহমেদ বলেন, পরীক্ষার দিন ঘরে পানি ঢুকে যাওয়ায় তিনি অংশ নিতে পারেননি। রাত থেকেই পরিবারের সবাই মিলে ঘরের পানি সেচে ফেললেও সকাল পর্যন্ত ঘরের ভেতরে হাঁটুপানি ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দা সুরাইয়া বেগম বলেন, টানা বৃষ্টিতে বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে পড়েছে। কোথাও কোথাও কোমরসমান পানি জমে রয়েছে। ছোট সন্তানদের নিয়ে রাতভর নির্ঘুম কাটাতে হয়েছে। রান্নাসহ দৈনন্দিন কাজও ব্যাহত হয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মহানগর সম্পাদক আলী ইউসুফ বলেন, পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল ও নালা পুনঃখনন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণেই সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই নগরবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। তিনি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানান।
তবে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনুজ্জামান সরকার বলেন, টানা ভারী বৃষ্টির কারণে সাময়িক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলেও অধিকাংশ এলাকা থেকে পানি দ্রুত নেমে যাচ্ছে। সকাল থেকেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করছেন এবং যেখানে পানি জমে আছে, তা দ্রুত অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, প্রধান সড়কের তুলনায় অলিগলি ও আবাসিক এলাকায় পানি জমে থাকার প্রবণতা বেশি। বহুতল ভবনের কিছু মালিক ও বাসিন্দা ড্রেনে ময়লা-আবর্জনা, নির্মাণসামগ্রী ও বর্জ্য ফেলায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে। সিটি করপোরেশন নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার ও পানি অপসারণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। যেসব এলাকায় সমস্যা বেশি, সেখানে অতিরিক্ত জনবল ও সরঞ্জাম মোতায়েন করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি নগরবাসীকে ড্রেন ও নালায় বর্জ্য না ফেলার আহ্বান জানান।



