বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত শব্দগুলোর একটি ‘ডিসেম্বর’। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা বাঙালি কমিউনিটিতেও তৈরি হয়েছে ব্যাপক কৌতূহল—‘ডিসেম্বরে কী ঘটতে যাচ্ছে?’
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার পাশাপাশি বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সরকারবিরোধী আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ডিসেম্বরকে ঘিরে নানা আলোচনা, বিশ্লেষণ ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে নানা ধরনের গুঞ্জন ও জল্পনা। ফলে সময় যত এগোচ্ছে, রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনাও তত বাড়ছে।
শেখ হাসিনার ‘দেশে ফেরা’ নিয়ে আলোচনা যেমন তুঙ্গে, তেমনি গুরুত্ব পাচ্ছে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের ঘোষণা। একদিকে শেখ হাসিনা বলছেন, তিনি ডিসেম্বরেই দেশে ফিরবেন। অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির কেউ কেউ সরকারকে ডিসেম্বরের মধ্যে নানা দাবির বিষয়ে সময়সীমা দিচ্ছেন এবং কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিচ্ছেন।
এই দুই ঘটনাকে নিছক কাকতালীয় হিসেবে দেখছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে। তাদের ধারণা, এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ বা পারস্পরিক যোগসূত্র থাকতে পারে। একই সঙ্গে কিছু রাজনৈতিক শক্তি ডিসেম্বরের মধ্যে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও বিভিন্ন বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
এ নিয়ে অতীতের রাজনৈতিক সমীকরণের উদাহরণও টানা হচ্ছে। বিশেষ করে ১৯৮৬ ও ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান সময়ের তুলনা করছেন কেউ কেউ। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্ভাব্য জোটের প্রসঙ্গ তুলে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ও সরকারের একাধিক মন্ত্রী জামায়াতে ইসলামীর প্রতি প্রশ্ন তুলছেন। তবে জামায়াতসহ সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলো আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো ধরনের আঁতাতের সম্ভাবনা নাকচ করে আসছে। তাদের বক্তব্য, অতীতে যে রাজনৈতিক সমঝোতা বা জোট হয়েছে, তা ছিল সে সময়ের বাস্তবতার ভিত্তিতে। একইভাবে বিএনপির সঙ্গেও অতীতে জামায়াতের রাজনৈতিক জোট ছিল।
এ ধরনের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে ডিসেম্বরকে ঘিরে উত্তেজনা আরও বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নানা গুজব ও অনুমান, যা রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
এদিকে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হচ্ছে, আন্দোলনের নামে কেউ অরাজকতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত শনিবার এক অনুষ্ঠানে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, কেউ অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাইলে তা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে দেশের আইনে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার হিসেবে প্রত্যেকের নিজ নিজ সীমার মধ্যে থাকা উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা হারিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ভারত অবস্থান করছেন। তার অনুপস্থিতিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। আইন অনুযায়ী আপিলের সময়সীমাও শেষ হয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। একই সময়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ডিসেম্বর মাসে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। তার এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা।
অন্যদিকে আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার আপিলের সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। মঙ্গলবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, শেখ হাসিনার এখন আর আপিল করার সুযোগ নেই। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।
সব মিলিয়ে ডিসেম্বরকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও অনিশ্চয়তা। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, বিরোধী দলের আন্দোলনের হুঁশিয়ারি এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমীকরণ—সব মিলিয়ে সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা নিয়েই এখন রাজনৈতিক মহলে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। ডিসেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ শেষ পর্যন্ত দেশের রাজনীতিতে কতটা পরিবর্তন আনে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।



