হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া, দীর্ঘদিন ক্লান্তি, অতিরিক্ত চুল পড়া, মাসিকের অনিয়ম কিংবা হৃদস্পন্দনে পরিবর্তন—এ ধরনের কিছু লক্ষণ দেখা দিলে থাইরয়েডের কার্যকারিতা নিয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
গলার সামনের অংশে থাকা প্রজাপতির মতো আকৃতির গ্রন্থি হলো থাইরয়েড। শরীরের বিপাকক্রিয়া, শক্তি ব্যবহারের ধরন, শরীরের তাপমাত্রা ও হৃদস্পন্দনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় থাইরয়েড হরমোনের ভূমিকা রয়েছে। থাইরয়েড কম সক্রিয় হলে তাকে হাইপোথাইরয়েডিজম এবং অতিরিক্ত সক্রিয় হলে হাইপারথাইরয়েডিজম বলা হয়।
তবে শুধু ঘরে বসে থাইরয়েডের সমস্যা নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা সম্ভব নয়। আয়নার সামনে ঘাড় পর্যবেক্ষণ করে কোনো ফোলা বা অস্বাভাবিক পরিবর্তন আছে কি না, সে বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যেতে পারে। রোগ নিশ্চিত করতে সাধারণত চিকিৎসকের পরামর্শ ও রক্ত পরীক্ষা প্রয়োজন।
আয়নার সামনে কীভাবে ঘাড় পরীক্ষা করবেন?
ভালো আলোযুক্ত জায়গায় আয়নার সামনে দাঁড়ান। গলার নিচের অংশ স্পষ্টভাবে দেখা যায় এমন অবস্থান নিন।
এরপর মাথা সামান্য পেছনের দিকে হেলিয়ে এক চুমুক পানি পান করুন। পানি গেলার সময় গলার সামনের অংশে কোনো অস্বাভাবিক ফোলা, পিণ্ড বা উঁচু অংশ দেখা যাচ্ছে কি না, তা লক্ষ্য করুন।
কোনো অস্বাভাবিকতা চোখে পড়লে নিজে থেকে রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
থাইরয়েড কম সক্রিয় হলে
হাইপোথাইরয়েডিজমে শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রম ধীর হয়ে যেতে পারে। সম্ভাব্য লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- দীর্ঘসময় ক্লান্ত বা দুর্বল লাগা
- ওজন বেড়ে যাওয়া
- ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া
- চুল পাতলা হওয়া বা চুল পড়া
- কোষ্ঠকাঠিন্য
- মন খারাপ বা বিষণ্নতা
- স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ঠান্ডা অনুভূত হওয়া
- মাসিকের পরিবর্তন বা অনিয়ম
তবে এসব লক্ষণ অন্য অনেক শারীরিক সমস্যার কারণেও হতে পারে। তাই শুধু উপসর্গ দেখে হাইপোথাইরয়েডিজম নিশ্চিত করা যায় না।
থাইরয়েড অতিরিক্ত সক্রিয় হলে
হাইপারথাইরয়েডিজমে শরীরের বিভিন্ন কার্যক্রম দ্রুতগতির হয়ে যেতে পারে। তখন দেখা দিতে পারে—
- কারণ ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া
- দ্রুত বা অনিয়মিত হৃদস্পন্দন
- অতিরিক্ত ঘাম
- হাত কাঁপা
- অস্থিরতা বা উদ্বেগ
- ঘুমের সমস্যা
- গরম সহ্য করতে না পারা
- চুল পাতলা হওয়া বা চুল পড়া
এ ধরনের লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে থাইরয়েডের কার্যকারিতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
কোন লক্ষণগুলো অবহেলা করা ঠিক নয়?
গলার সামনের অংশে নতুন কোনো ফোলা বা পিণ্ড দেখা গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। বিশেষ করে পিণ্ড বড় হতে থাকলে, খাবার বা পানি গিলতে সমস্যা হলে, গলায় চাপ অনুভূত হলে, কণ্ঠস্বর পরিবর্তন হলে বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
তবে গলায় পিণ্ড দেখা গেলেই সেটি ক্যানসার—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বেশিরভাগ থাইরয়েড নডিউল ক্যানসার নয়। পিণ্ডের প্রকৃতি বোঝার জন্য চিকিৎসক প্রয়োজনে আল্ট্রাসনোগ্রাম বা সূচের মাধ্যমে কোষের নমুনা পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।
কোন পরীক্ষায় থাইরয়েডের সমস্যা ধরা পড়ে?
থাইরয়েডের কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য সাধারণত রক্ত পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো TSH পরীক্ষা। প্রয়োজন অনুযায়ী Free T4 এবং কিছু ক্ষেত্রে T3 পরীক্ষাও করা হতে পারে।
এ ছাড়া থাইরয়েডের সমস্যার কারণ নির্ণয়ে চিকিৎসক থাইরয়েড অ্যান্টিবডি পরীক্ষা দিতে পারেন। বিশেষ পরিস্থিতিতে আল্ট্রাসনোগ্রাম বা অন্যান্য পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। কোন পরীক্ষা প্রয়োজন, তা রোগীর উপসর্গ ও শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে।
ঘরে বসে পরীক্ষা করাই কেন যথেষ্ট নয়?
থাইরয়েডে দৃশ্যমান কোনো ফোলা বা পিণ্ড না থাকলেও এর কার্যকারিতায় সমস্যা থাকতে পারে। আবার ঘাড়ে সামান্য পরিবর্তন দেখা গেলেই সেটি থাইরয়েডের রোগ—এমনটাও নয়।
তাই ঘরে বসে ঘাড় পর্যবেক্ষণ করা মূলত সচেতন হওয়ার একটি উপায়, রোগ নির্ণয়ের পদ্ধতি নয়। দীর্ঘদিন ক্লান্তি, অস্বাভাবিক ওজনের পরিবর্তন, মাসিকের অনিয়ম, অতিরিক্ত চুল পড়া, হৃদস্পন্দনের পরিবর্তন কিংবা অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সঠিক সময়ে পরীক্ষা ও রোগ নির্ণয় করা গেলে থাইরয়েডের সমস্যার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব।



