একসময় ঢাকাই চলচ্চিত্রে নায়ক–খলনায়কের রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের অন্যতম পরিচিত মুখ ছিলেন ইলিয়াস কোবরা। মার্শাল আর্টনির্ভর অ্যাকশন সিনেমায় তাঁর উপস্থিতি মানেই ছিল দর্শকদের বাড়তি উত্তেজনা। তবে রুপালি পর্দার সেই ব্যস্ত জীবন পেছনে ফেলে এখন তিনি কাটাচ্ছেন একেবারেই ভিন্ন এক জীবন।
বর্তমানে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালীয়াপাড়ায় নিজ গ্রামেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন তিনি। সময় কাটে কৃষিকাজ, গরু-ছাগলের খামার দেখাশোনা, মসজিদে ইবাদত এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে। গ্রামের মানুষের ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে প্রায় এক যুগ আগে স্থানীয় একটি বাজারের নাম রাখা হয়েছে ‘ইলিয়াস কোবরা বাজার’।
নিজের নামে গড়ে উঠেছে বাজার
বাহারছড়ার পাকা সড়কের পাশে গড়ে ওঠা ‘ইলিয়াস কোবরা বাজার’ এখন স্থানীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বর্তমানে সেখানে রয়েছে প্রায় ৪৫টি দোকান। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি স্থানীয় মাছ, শাকসবজি, পান-সুপারি, নারকেল ও মৌসুমি ফল বিক্রি হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আগে কেনাকাটা বা কৃষিপণ্য বিক্রির জন্য প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের টেকনাফ সদরে যেতে হতো। বাজারটি প্রতিষ্ঠার পর সেই ভোগান্তি অনেকটাই কমেছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে অপহরণ ও মানব পাচারের ঘটনায় ব্যবসায় কিছুটা প্রভাব পড়েছে।
বাজারটির নামকরণের স্মৃতিচারণ করে ইলিয়াস কোবরা বলেন, গ্রামের নাম নিয়ে অনেকের বিভ্রান্তি থাকায় ২০১৫ সালে স্থানীয়রা তাঁর অনুমতি নিয়ে বাজারটির নাম ‘ইলিয়াস কোবরা বাজার’ রাখেন। প্রথমে একটি ছোট দোকান দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও এখন এটি বড় বাজারে পরিণত হয়েছে। পর্যটকরাও আশপাশের পাহাড়-ঝরনা ও শতবর্ষী গর্জনবন দেখতে এসে বাজারে থেমে স্থানীয় ফলমূল ও পণ্য কেনেন।
সিনেমা নয়, এখন গ্রামের মানুষের পাশে
সম্প্রতি বাজারের একটি দোকানে বসে নিজের বর্তমান জীবন নিয়ে কথা বলেন ইলিয়াস কোবরা। তিনি জানান, প্রায় চার দশকের অভিনয়জীবনে পাঁচ শতাধিক চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। তবে এখন আর চলচ্চিত্রে ফেরার কোনো ইচ্ছা নেই।
তাঁর ভাষায়, ‘৪০ বছর সিনেমা করেছি। এখন বাকি জীবনটা গ্রামেই কাটাতে চাই। কৃষিকাজ, ইবাদত আর মানুষের জন্য কিছু করতে পারলেই শান্তি পাই।’
অপহরণ ও মানব পাচার ঠেকাতে সক্রিয়
গ্রামে ফিরে নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন এই অভিনেতা। বাহারছড়ার পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও মানব পাচারের ঘটনা বেড়েছে।
ইলিয়াস কোবরা জানান, এসব অপরাধ মোকাবিলায় গ্রামের মানুষকে চারটি দলে ভাগ করে প্রায় ১০০ জন স্বেচ্ছাসেবকের মাধ্যমে পালাক্রমে পাহারার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে অপহরণের ঘটনা কিছুটা কমেছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতাও পাওয়া যাচ্ছে।
চার দশকের চলচ্চিত্রজীবন
১৯৬১ সালের ২০ জানুয়ারি টেকনাফের নোয়াখালীয়াপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন মোহাম্মদ ইলিয়াস, যিনি চলচ্চিত্রে ইলিয়াস কোবরা নামে পরিচিত। অভিনয়ে আসার আগে তিনি ছিলেন একজন মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষক এবং টেকনাফ, কক্সবাজার ও ঢাকায় প্রশিক্ষণকেন্দ্র পরিচালনা করতেন।
১৯৮৭ সালে সোহেল রানা পরিচালিত ‘মারুফ শাহ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে তাঁর। এরপর প্রায় ৫০০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকে রুবেল, রতন তালুকদারসহ জনপ্রিয় নায়কদের বিপরীতে তাঁর খলচরিত্র ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি ‘ভাইয়া নাম্বার ওয়ান’ চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ শিল্পী সমিতির নির্বাচনে সহসভাপতি পদেও নির্বাচিত হয়েছেন।
গ্রামেই কাটাতে চান জীবনের বাকি সময়
বর্তমানে মা, স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে গ্রামের বাড়িতেই থাকেন ইলিয়াস কোবরা। যদিও পরিবারের সদস্যরা প্রয়োজন অনুযায়ী ঢাকা ও টেকনাফে যাতায়াত করেন।
তিনি স্থানীয় সাগরপাড় জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর উদ্যোগে মসজিদ পুনর্নির্মাণ, কবরস্থান সম্প্রসারণ এবং একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য জমিও কেনা হয়েছে।
ইলিয়াস কোবরা বলেন, ‘গ্রামের প্রতি টান সব সময়ই ছিল। এখন মানুষের কথা শুনি, তাদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করি। আমার কারণে যদি কারও উপকার হয়, সেটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’
রুপালি পর্দার ভয়ংকর খলনায়ক হিসেবে পরিচিত সেই মানুষটি আজ নিজ গ্রামে একজন সমাজসেবী, ধর্মচর্চায় নিবেদিত ব্যক্তি এবং সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক হিসেবে নতুন পরিচয়ে জীবন কাটাচ্ছেন।



