আগস্টে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিকল্পনা থাকলেও তা পিছিয়ে গেছে। সবকিছু ঠিকঠাক এগোলে আগামী সেপ্টেম্বরেই ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে। এ লক্ষ্যে কেন্দ্রটিতে এখন শেষ ধাপের বিভিন্ন পরীক্ষা ও যাচাই কার্যক্রম চলছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের আশা, প্রথম ইউনিটের পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হলে দেশের চলমান বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে গ্যাস সরবরাহ সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যে চাপ তৈরি হয়েছে, সেই পরিস্থিতিতে রূপপুরকে সম্ভাবনাময় বিকল্প উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শেষ পর্যায়ের পরীক্ষায় রূপপুর
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রথম ইউনিটের চুল্লিতে ইতোমধ্যে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোড করা হয়েছে। এ পর্যন্ত দুই ধাপে শতাধিক পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এখন গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল পরীক্ষাগুলো একে একে শেষ করা হচ্ছে।
প্রতিটি পরীক্ষার ফলাফল বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনার পর অনুমোদন দিচ্ছে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা)। নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার বিষয়গুলো নিশ্চিত হওয়ার পরই পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের পরবর্তী ধাপে যাওয়া হবে।
পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে রূপপুর থেকে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ থাকবে। একবার জ্বালানি লোড করার পর একটি ইউনিট প্রায় ১৮ মাস টানা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে। এরপর রিফুয়েলিং ও প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ইউনিটটি সর্বোচ্চ দুই মাস পর্যন্ত বন্ধ রাখার প্রয়োজন হতে পারে।
গ্রিড প্রস্তুত করাও বড় চ্যালেঞ্জ
রূপপুরের উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার ক্ষেত্রে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনই নয়, সঞ্চালন ব্যবস্থার সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন স্থিতিশীল হলেও এটি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য সঞ্চালন অবকাঠামো প্রয়োজন। সামান্য ত্রুটি বা সঞ্চালন বাধার কারণেও যাতে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি না হয়, সে জন্য পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ চলছে।
রূপপুরের বিদ্যুৎ সঞ্চালনের জন্য বাঘাবাড়ীর ২৩০ কেভি, বগুড়ার ৪০০ কেভি এবং গোপালগঞ্জের ৪০০ কেভি সঞ্চালন অবকাঠামোর কমিশনিংয়ের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে গেলে বিদ্যুৎ পরিবহনের জন্য এসব অবকাঠামোকে আরও নিবিড়ভাবে প্রস্তুত করতে হবে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুও জাতীয় গ্রিডের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন। তার মতে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে বর্তমান গ্রিড ব্যবস্থাকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে নিয়মিত আপগ্রেডেশন প্রয়োজন। তা না হলে হঠাৎ করে জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এ কারণে আন্তর্জাতিক পরমাণু বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বিদ্যুতের দাম এখনো চূড়ান্ত নয়
রূপপুরে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটের চূড়ান্ত মূল্য এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হওয়ার পর পিডিবির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) সম্পাদনের কথা রয়েছে।
প্রাথমিক খসড়ায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ৩ থেকে ৪ টাকার মধ্যে রাখার কথা থাকলেও প্রকল্পের সামগ্রিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত দাম কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সব পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই এবং গ্রিড প্রস্তুতির কাজ নির্ধারিতভাবে শেষ হলে সেপ্টেম্বরে রূপপুরের প্রথম ইউনিট থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।



