প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) চূড়ান্ত করার অগ্রগতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও জাপানি বিনিয়োগ বাড়াতে সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ চান দেশের ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা। তাঁদের মতে, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর জাপানের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সক্ষমতা ধরে রাখা এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে এ সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আগামী ২৬ অক্টোবর জাপান সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মালয়েশিয়া ও চীন সফরের পর এটি হবে তাঁর তৃতীয় বিদেশ সফর। এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদার করতে সফরটিকে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) কার্যকর হলে রপ্তানি বৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণের পর জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে এ চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের সাত হাজারের বেশি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। এতে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি অন্যান্য সম্ভাবনাময় পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে চুক্তির শর্ত, শুল্কসুবিধার পরিধি এবং এলডিসি উত্তরণের পর বিদ্যমান বাণিজ্যিক সুবিধার ধারাবাহিকতা কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা স্পষ্ট করা জরুরি।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রত্যাশার জায়গা থেকে প্রথমেই অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) গুরুত্ব পাওয়া উচিত। এ চুক্তি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার পর কী অগ্রগতি হয়েছে, কোন কোন বিষয়ে কাজ বাকি রয়েছে এবং কোথায় বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আটকে আছে, সেগুলো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।’
তিনি বলেন, চুক্তিটি দ্রুত কার্যকর করতে বিদ্যমান জটিলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজন হলে দুই দেশের সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া উচিত।
জাহিদ হোসেনের মতে, জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার, শুল্কসুবিধা এবং রপ্তানির সম্ভাব্য বাধাগুলো নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণের পর কোন পণ্যে কী ধরনের শুল্ক প্রযোজ্য হবে এবং কী কী বাণিজ্যসুবিধা পাওয়া যাবে, তা আগেই স্পষ্ট করা দরকার। এতে ব্যবসায়ীরা নিজেদের প্রস্তুতি নিতে পারবেন এবং কোন খাতে রপ্তানি বাড়ানোর সম্ভাবনা বেশি, সে বিষয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
তাঁর মতে, ইপিএ কেবল বাণিজ্য চুক্তি নয়; এটি দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি বিনিময় ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে।
বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নের তাগিদ
বাংলাদেশে জাপানসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দীর্ঘ অনুমোদনপ্রক্রিয়া, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং সরবরাহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হন। বিনিয়োগ আকর্ষণে ওয়ান স্টপ সার্ভিস ও অন্যান্য উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সেক্রেটারি জেনারেল ও এমকেকে লজিস্টিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রবিউল আলম বলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করা, বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায়, শুধু চুক্তি স্বাক্ষর করে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
তিনি আরও বলেন, ইপিএর সম্ভাব্য সুবিধা কাজে লাগাতে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্রাণিসম্পদভিত্তিক পণ্য এবং ওষুধশিল্পের মতো সম্ভাবনাময় খাতেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে পণ্যের গুণগত মান, খাদ্যনিরাপত্তা, মান নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োজনীয় সনদের শর্ত পূরণে সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
জাপানি বিনিয়োগে নতুন গতি আনার প্রত্যাশা
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে জাপানি প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) ২০২১ সালে ছিল ৭৮ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন ডলার। ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৩৮ দশমিক ৫১ মিলিয়ন ডলারে। পরবর্তী দুই বছরে কিছুটা পুনরুদ্ধার দেখা গেলেও ২০২৫ সালে বিনিয়োগের পরিমাণ ঋণাত্মক ৩ দশমিক ৩২ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। এ পরিস্থিতি জাপানি বিনিয়োগের গতি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ জাগো নিউজকে বলেন, ‘টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, অধিক বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও জাপানের সঙ্গে জোরদার অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিত করা প্রয়োজন। জাপান বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় রপ্তানি বাজার।’
তিনি বলেন, তৈরি পোশাকের বাইরে উচ্চ সম্ভাবনাময় ও মূল্য সংযোজিত পণ্যের রপ্তানিতে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি ইপিএ বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা গেলে বাংলাদেশ চুক্তির সুযোগ-সুবিধা আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারবে।
বাংলাদেশি থিঙ্কট্যাংক নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্টের সভাপতি খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা এবং উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অধিক প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ জরুরি। এ জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে—এমন খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ-জাপান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের চিত্র
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ভারসাম্য জাপানের অনুকূলে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৪২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ সময়ে জাপান থেকে বাংলাদেশের আমদানি ছিল ২ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলার। বিপরীতে জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি হয়েছে ১ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭০০ মিলিয়ন ডলারে।
জাপান থেকে বাংলাদেশ মূলত যন্ত্রপাতি, শিল্প সরঞ্জাম ও যানবাহনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্য আমদানি করে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ জাপানে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, চামড়াজাত পণ্য এবং অন্যান্য উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করে।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘আমরা জাপানের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আরও বাড়াতে চাই। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন জাপান সফর নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ সৃষ্টি ও দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশা করছি।’
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে জ্বালানি ও লজিস্টিকস খাতে বিনিয়োগ বাড়লে তৈরি পোশাকশিল্প উপকৃত হবে। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, উন্নত পরিবহনব্যবস্থা ও দক্ষ লজিস্টিকস সেবা উৎপাদন ব্যয় কমানো, সময়মতো পণ্য সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করবে।
তৈরি পোশাকের বাইরে রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ
জাপানে বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো প্রধানত তৈরি পোশাকনির্ভর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটিতে বাংলাদেশের মোট ১ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানির মধ্যে ১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার এসেছে পোশাক খাত থেকে।
এ অবস্থায় রপ্তানি বহুমুখীকরণে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্রাণিসম্পদভিত্তিক পণ্য, ওষুধশিল্প এবং অন্যান্য মূল্য সংযোজিত পণ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, এসব খাতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মান ও সনদসংক্রান্ত শর্ত পূরণ করা গেলে জাপানের বাজারে নতুন রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন জাপান সফরে ইপিএ চূড়ান্ত করার অগ্রগতি, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং জ্বালানি ও লজিস্টিকস অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর অগ্রগতি অর্জন করা গেলে এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।



