tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে হুতিরা

ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে হুতিরা

কয়েক দিনের টানা সংঘর্ষের পর ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা। কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় শহর আল-মাখা বা মোখার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর গোষ্ঠীটির এই অগ্রযাত্রা আরও জোরালো হয়েছে। এর ফলে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে বাণিজ্যিক নৌযান চলাচলের ওপর হুতিদের নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়তে পারে।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ভোরে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের বাহিনীর বিরুদ্ধে দ্রুত অগ্রসর হয়ে উপকূলের সর্বশেষ কয়েকটি শহর দখল করে নেয় হুতিরা। পরে তারা লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযুক্তকারী কৌশলগত বাব আল-মান্দেব প্রণালির কয়েকটি দ্বীপেও অবস্থান নেয়।

সরকারি সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের এই অগ্রযাত্রার ফলে বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আল-জাজিরার সাংবাদিক মাহা আলি ইয়েমেনের তাইজ শহর থেকে জানান, বৃহস্পতিবার ভোরে হুতি যোদ্ধারা উপকূলীয় শহর আল-মাখায় পৌঁছান। শহরটি মোখা নামেও পরিচিত। পরে তারা উপকূলের কাছাকাছি কয়েকটি দ্বীপের দিকে অগ্রসর হয়ে সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা চালায়।

শুক্রবার ইয়েমেন সরকারের কয়েকটি সূত্র রয়টার্সকে জানায়, হুতি যোদ্ধারা বাব আল-মান্দেব উপকূলের ধুবাব শহরেও পৌঁছেছেন। সরকারি বাহিনী সরে যাওয়ার পর যোদ্ধাবাহী কয়েকটি নৌকা বাব আল-মান্দেব প্রণালির মাঝখানে অবস্থিত মায়ুন দ্বীপে পৌঁছেছে বলে সরকারি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন। দ্বীপটি পেরিম নামেও পরিচিত।

একটি সূত্র এএফপিকে জানিয়েছে, ‘বাব আল-মান্দেব এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কাজ হুতিরা সম্পন্ন করেছে।’

এদিকে সানাভিত্তিক ইয়েমেন প্রেস এজেন্সি মাঠপর্যায়ের সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, হুতি বাহিনী প্রণালিটির ওপর নজরদারির জন্য গুরুত্বপূর্ণ আল-ওমারি সামরিক ক্যাম্পও দখল করেছে।

তবে বাব আল-মান্দেবের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়ে হুতি কর্তৃপক্ষ এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়নি বলে জানিয়েছেন সানা থেকে আল-জাজিরার সাংবাদিক নাবিল আল-ইউসুফি।

কেন গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব

বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশদ্বার। এটি এডেন উপসাগর ও লোহিত সাগরকে যুক্ত করেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়।

হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ইউরোপের বাজারে পাঠানোর ক্ষেত্রেও বাব আল-মান্দেব গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে এই প্রণালির ওপর কোনো পক্ষের নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী হলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

এর আগে বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে হুতিদের ধারাবাহিক হামলার কারণে লোহিত সাগরে নৌযান চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। অনেক জাহাজকে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হয়েছে।

সানা থেকে আল-জাজিরার সাংবাদিক ইউসুফ মাওরি বলেন, ‘এখন হুতিদের হাতই শক্তিশালী। তাদের হাতে চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে। তারা বাব আল-মান্দেব এবং লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী নৌযান নিয়ন্ত্রণ করছে।’

হুতিদের পেছনে ঠেলে দিতে ইয়েমেন সরকারের বাহিনী পাল্টা অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন লক্ষণও এখন পর্যন্ত খুব একটা দেখা যাচ্ছে না বলে জানান তিনি।

বাড়ছে তেলের দাম

হুতিদের অগ্রযাত্রার খবরের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় দাম গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার ছাড়িয়েছে। শুক্রবার বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে থেকে লেনদেন শেষ করার পথে ছিল। মে মাসের মাঝামাঝির পর এটাই তেলের সর্বোচ্চ দাম হতে যাচ্ছে।

এর আগে চলতি বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট জ্বালানি পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যেত। যুদ্ধের পর ওই নৌপথে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বিকল্প হিসেবে বাব আল-মান্দেব ও লোহিত সাগরের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

শুক্রবার আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) পূর্বাভাস দিয়েছে, চলতি বছর বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ ও চাহিদা আগের ধারণার চেয়েও বেশি কমতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের স্বাভাবিক তেল সরবরাহব্যবস্থা ২০২৭ সাল পর্যন্ত ব্যাহত হতে পারে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।

ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত করে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ কমার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও বেড়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হুতিদের হাতে বাব আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জাহাজ চলাচল ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

সূত্র: আল-জাজিরা