রবিউল আউয়াল মাস এলেই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম, তাঁর প্রতি ভালোবাসা এবং ঈদে মিলাদুন্নবী পালন নিয়ে মুসলিম সমাজে নানা আলোচনা দেখা যায়। এ সময় একটি প্রশ্নও প্রায়ই সামনে আসে—মিলাদুন্নবীকে বিদআত মনে করলে কি কেউ কাফের হয়ে যায়? এমনকি এতে কি তার বৈবাহিক সম্পর্কও বাতিল হয়ে যায়?
সম্প্রতি একটি ইসলামি প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠানে এমনই একটি বিষয়ে শায়খ আহমাদুল্লাহর কাছে জানতে চাওয়া হয়। একই সঙ্গে রবিউল আউয়াল মাসে মুসলমানদের কী ধরনের আমল করা উচিত, সেটিও জানতে চান একজন প্রশ্নকারী।
জবাবে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, হিজরি সনের তৃতীয় মাস হলো রবিউল আউয়াল। ঐতিহাসিকভাবে এ মাসের সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাত—দুই ঘটনাই সম্পৃক্ত বলে বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়। তবে তাঁর জন্মের নির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
জন্মতারিখ নিয়ে কেন মতভেদ
শায়খ আহমাদুল্লাহ ব্যাখ্যা করেন, আগের যুগে মানুষের জন্মতারিখ বর্তমান সময়ের মতো নিয়মিতভাবে লিখে সংরক্ষণ করা হতো না। ফলে বহু শতাব্দী আগের ব্যক্তিদের জন্মের সুনির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে মতভেদ থাকা অস্বাভাবিক নয়।
তাঁর মতে, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন জন্মগ্রহণ করেন, তখন মক্কার মানুষ তাঁর নবুয়তের বিষয়টি জানত না। কিন্তু তাঁর ইন্তেকালের সময় তিনি যে আল্লাহর সর্বশেষ রাসুল, তা সারা বিশ্বে সুপরিচিত হয়ে গিয়েছিল। এ কারণে তাঁর ওফাতের তারিখ তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভুলভাবে সংরক্ষিত হলেও জন্মতারিখ নিয়ে একই মাত্রার নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না।
রবিউল আউয়ালের জন্য কি বিশেষ আমল রয়েছে?
শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, রবিউল আউয়াল মাসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে স্মরণ করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এ মাসের জন্য আলাদাভাবে নির্দিষ্ট কোনো ইবাদত নির্ধারিত নেই।
তাঁর মতে, একজন মুসলমানের দায়িত্ব শুধু রবিউল আউয়ালে নয়, বরং সারা জীবন নবীজির (সা.) সুন্নাহ অনুসরণ করা, তাঁকে ভালোবাসা এবং তাঁর আদর্শ নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা।
শুধু একটি নির্দিষ্ট সময়ে কিছু আয়োজন করে দায়িত্ব শেষ হয়েছে মনে করা সঠিক নয়। বরং নামাজ, চরিত্র, পরিবার, ব্যবসা-বাণিজ্য, মানুষের সঙ্গে আচরণসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করাই তাঁর প্রতি ভালোবাসার প্রকৃত প্রকাশ বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সোমবারের রোজার কথা
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্ম সোমবার হয়েছিল বলে হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। তিনি সোমবার নফল রোজা রাখতেন এবং এ দিনের সঙ্গে তাঁর জন্মের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন।
এ কারণে নবীজির জন্মকে স্মরণ করে আমল করতে চাইলে নিয়মিত সোমবার নফল রোজা রাখাকে সুন্নাহসম্মত আমল হিসেবে অনুসরণ করা যেতে পারে বলে মত দেন শায়খ আহমাদুল্লাহ।
তিনি আরও বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.), সাহাবায়ে কেরাম ও খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে প্রতিবছর নির্দিষ্টভাবে জন্মবার্ষিকী উদযাপনের প্রচলন ছিল না। তাই ভালোবাসার প্রকাশও ইসলামের স্বীকৃত পদ্ধতি ও সুন্নাহর আলোকে হওয়া উচিত।
মিলাদুন্নবী পালন না করলে কি কাফের বা তালাক?
মিলাদুন্নবীকে বিদআত মনে করলে কেউ কাফের হয়ে যাবে কিংবা তার স্ত্রী স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাক হয়ে যাবে—এ ধরনের বক্তব্যকে ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক বলে উল্লেখ করেন শায়খ আহমাদুল্লাহ।
তিনি বলেন, কেউ যদি নবীজির অবমাননা বা তাঁর প্রতি শত্রুতা করে, সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট আমলকে বিদআত মনে করে তা থেকে বিরত থাকা নিজেই নবীজির অবমাননা হিসেবে গণ্য হতে পারে না।
তাঁর মতে, সাহাবিদের যুগে প্রচলিত না থাকা কোনো রীতি অনুসরণ না করার কারণে কাউকে ‘নবীর দুশমন’ আখ্যা দেওয়া ঠিক নয়। এ ধরনের বিষয়ে মুসলমানদের পারস্পরিক বিদ্বেষ তৈরি না করে জ্ঞান, শালীনতা ও সহনশীলতার সঙ্গে মতপার্থক্য মোকাবিলা করা উচিত।
ভালোবাসার প্রমাণ কী?
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার কথা উল্লেখ করে শায়খ আহমাদুল্লাহ কোরআনের সুরা আলে ইমরানের ৩১ নম্বর আয়াতের অর্থ তুলে ধরেন। সেখানে আল্লাহর ভালোবাসা লাভের জন্য রাসুলের অনুসরণের কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ শুধু মুখে ভালোবাসার দাবি নয়, বরং তাঁর সুন্নাহ ও আদর্শ অনুসরণ করাই সেই ভালোবাসার বাস্তব প্রমাণ।
তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে মুসলমানদের মধ্যে অহংকার, বিরোধ বা পরস্পরের প্রতি শত্রুতা তৈরি হওয়া উচিত নয়। বরং কেউ ভিন্নমত পোষণ করলে তার সঙ্গে বিনয় ও সহানুভূতির আচরণ করা প্রয়োজন।
রবিউল আউয়ালে করণীয় কী?
শায়খ আহমাদুল্লাহর বক্তব্য অনুযায়ী, রবিউল আউয়ালকে শুধু উৎসব বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ও শিক্ষা নতুন করে জানার সুযোগ হিসেবে নেওয়া যেতে পারে।
তাঁর আদর্শ অনুসরণের মধ্যে নামাজ আদায়, উত্তম চরিত্র গঠন, পরিবার ও প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো আচরণ, ন্যায়বিচার, মানুষের অধিকার রক্ষা এবং আল্লাহর আনুগত্যের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত।
তিনি মনে করিয়ে দেন, মহানবী (সা.) মানবজাতির জন্য হিদায়াতের পথ দেখিয়েছেন। তাই তাঁর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা শুধু একটি দিন বা একটি মাসে সীমাবদ্ধ না রেখে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর শিক্ষা বাস্তবায়নের মধ্যেই প্রকাশ করা উচিত।
রবিউল আউয়াল তাই মুসলমানদের জন্য নিজেদের জীবন পর্যালোচনা করারও একটি উপলক্ষ হতে পারে—নবীজির প্রতি ভালোবাসার দাবি আমরা কতটা তাঁর আদর্শ ও সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করছি, সেটিই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা।



