চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিএনপি কর্মী আহাদ আলী ওরফে গোলকাজুল কাজলকে অপহরণ, হত্যা ও লাশ গুমের মামলার চার্জশিট নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মামলার এজাহারভুক্ত পাঁচ আওয়ামী লীগ নেতাকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হলেও তাদের ঘনিষ্ঠ স্বজনদের কয়েকজনকে সাক্ষী করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন নিহতের স্ত্রী ও মামলার বাদী লিমা বেগম।
চার্জশিট প্রত্যাখ্যান করে আদালতে নারাজি আবেদন করেছেন তিনি। আগামী ধার্য তারিখে এ বিষয়ে শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।
কাজল সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের চাকপাড়া গ্রামের আলতাফ হোসেন ফিরোজের ছেলে। তিনি গরুর ব্যবসার পাশাপাশি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
যেভাবে নিখোঁজ হন কাজল
মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় চরবাগডাঙ্গা বাজারে আলমগীর আলমের সঙ্গে কাজলের কথা কাটাকাটি হয়। পরদিন রাত সোয়া ৯টার দিকে হাসেম আলী তাকে ফোন করে জানান, আলমের সঙ্গে বিরোধ মীমাংসার জন্য কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা আলমের বাড়িতে অবস্থান করছেন। তাদের সঙ্গে দেখা করতে কাজলকে যেতে বলা হয়।
প্রথমে যেতে রাজি না হলেও পরে হাসেমের মোটরসাইকেলে করে বাড়ি থেকে বের হন কাজল। যাওয়ার কিছুক্ষণ পর তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। একইভাবে হাসেম ও আলমগীরের ফোনেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
পরদিন স্বজনদের নিয়ে আলমের বাড়িতে গিয়ে কাজলের স্ত্রী তার সন্ধান চান। তখন তাকে জানানো হয়, রাতে বিরোধ মিটমাট হওয়ার পর সবাই চলে গেছেন এবং কাজলও সেখান থেকে বেরিয়ে গেছেন।
এরপর কয়েক দিন ধরে খোঁজ করেও স্বামীর সন্ধান না পেয়ে লিমা থানায় অভিযোগ করতে যান। তার দাবি, তখন পুলিশ তার অভিযোগ গ্রহণ করেনি। পরে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হলে ৮ জানুয়ারি ১৬ জনের বিরুদ্ধে অপহরণ ও গুমের মামলা করা হয়।
পদ্মায় মিলল মরদেহ
নিখোঁজ হওয়ার ১৯ দিন পর, ২০ জানুয়ারি আলাতুলির মধ্যচরে পদ্মা নদী থেকে কাজলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে তার মুখের দুই পাটি দাঁত ভাঙা, শরীরের নিচের অংশে একাধিক ক্ষত এবং মুখ ও মাথায় আঘাতের চিহ্নের কথা উল্লেখ করা হয়। ময়নাতদন্তেও শক্ত কোনো বস্তু দিয়ে আঘাত ও শ্বাসরোধের মাধ্যমে হত্যার আলামত পাওয়া যায় বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে। পরে অপহরণ ও গুমের মামলাটি হত্যা মামলায় রূপ নেয়।
চার্জশিটে বাদ পড়লেন পাঁচ নেতা
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আব্দুর রাজ্জাক গত ২৫ জুলাই চার্জশিট দাখিল করেন। এতে এজাহারভুক্ত আওয়ামী লীগ নেতা ওমর আলী, নুরুল মেম্বার, নাজমুল হক গুদা, নেজাম উদ্দিন ও আতাবুর রহমান সেন্টুকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।
অন্যদিকে আলমগীর আলম, হাসেম আলী, জোহাক আলী, ফরিদ উদ্দিন ও কামরুল বাচ্চুকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তারা সবাই বর্তমানে পলাতক বলে জানা গেছে।
স্বজনদের সাক্ষী করায় প্রশ্ন
চার্জশিটে মোট ১৮ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। বাদীর অভিযোগ, তাদের মধ্যে অব্যাহতি পাওয়া কয়েকজন আসামির ভাই, ভাতিজা ও চাচাতো ভাই রয়েছেন।
নুরুল মেম্বারের ভাই আমিনুল, চাচা বাবলু ও চাচাতো ভাই কামালকে সাক্ষী করা হয়েছে বলে জানা গেছে। একইভাবে ওমর আলীর চাচাতো ভাই মফিজুল ও ব্যক্তিগত সহযোগী শরিফুল, নাজমুল গুদার ভাই বাবলু ও ভাতিজা আমিনুল-কামাল এবং নেজাম উদ্দিনের ভাই বাবলু, ভাতিজা কামাল ও চাচাতো ভাইয়ের ছেলে আমিনুলকেও সাক্ষী করা হয়েছে বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া চার্জশিটে থাকা আসামি আলমগীরের চাচাতো ভাই কামরুজ্জামান টুটুল ও সিরাজকেও সাক্ষী করা হয়েছে।
জবানবন্দিতে স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগ
লিমা বেগমের আরও অভিযোগ, তদন্ত কর্মকর্তা তার ১৬১ ধারার একটি জবানবন্দি রেকর্ড করেছেন বলে চার্জশিটে দেখানো হলেও তিনি দাবি করছেন, পুলিশের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো কথাই বলা হয়নি। এমনকি ওই জবানবন্দিতে থাকা তার স্বাক্ষরও জাল করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তার স্বামী জাহাঙ্গীরের স্বাক্ষরও জাল করা হয়েছে দাবি করে লিমা বলেন, ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে বিষয়টি যাচাই করা সম্ভব।
নারাজি দিয়ে অধিকতর তদন্ত দাবি
বাদীপক্ষের আইনজীবী এমদাদুল হক লুটুর দাবি, কাজলকে পরিকল্পিতভাবে বাড়ি থেকে ডেকে নেওয়ার পর হত্যা করে মরদেহ গুম করা হয়েছে। কিন্তু তদন্তে এজাহারভুক্ত কোনো আসামিকে গ্রেফতার করা হয়নি এবং চার্জশিটেও হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনার বিষয়টি যথাযথভাবে উঠে আসেনি।
তিনি বলেন, তদন্তে গাফিলতি ও অসঙ্গতির অভিযোগে তারা আদালতে নারাজি দিয়েছেন এবং মামলাটির অধিকতর তদন্ত চেয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আব্দুর রাজ্জাক বলেন, তদন্তে যেসব তথ্য পাওয়া গেছে, তার ভিত্তিতেই চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। তবে অব্যাহতি পাওয়া আসামিদের স্বজনদের সাক্ষী করার বিষয়ে তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ওয়াসিম ফিরোজ বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা আইন অনুযায়ী স্বাধীনভাবে তদন্ত করেন। তবে এই মামলার তদন্তে কোনো ধরনের অসঙ্গতি হয়ে থাকলে তা খতিয়ে দেখা হবে।



